দেশের গ্রস ফিক্সড ক্যাপিটাল ফরমেশন বা মোট স্থায়ী মূলধনের সঙ্গে তুলনা করলে এর পরিমাণ দাঁড়ায় মাত্র ৬ শতাংশে।
দেশের পুঁজিবাজারের যাত্রা সাত দশক আগে, ১৯৫৬ সালে। স্বাধীনতার পর ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে আনুষ্ঠানিক লেনদেন চালু হয়। সেই হিসেবেও পুঁজিবাজারের যাত্রা পাঁচ দশকের। অথচ পুঁজির জোগানের দিক থেকে এখনো তলানিতে রয়ে গেছে পুঁজিবাজার। অর্থনীতির আকার বিবেচনায় নিলে দেখা যায় যে বিশ্বের আর কোথাও পুঁজিবাজার থেকে এত কম অর্থায়ন হয়নি। তার ওপর গত দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে নতুন কোনো কোম্পানি পুঁজিবাজারে আসছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে দেশের পুঁজিবাজারে ইস্যুকৃত মোট মূলধনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩ হাজার ২৫৮ কোটি টাকা। গতকালের দর অনুযায়ী প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা হিসাবে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৮৪১ কোটি বা ৮ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলার। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর বাংলাদেশের গ্রস ফিক্সড ক্যাপিটাল ফরমেশনের (জিএফসিএফ) আকার ছিল ১৩৮ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার। সে হিসাবে গত পাঁচ দশকে পুঁজিবাজার থেকে অর্থায়নের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে মোট স্থায়ী মূলধনের ৬ শতাংশে।
জিএফসিএফ বা মোট স্থায়ী মূলধন গঠন হলো জাতীয় পরিসরে নিট বিনিয়োগের ধারণা, যা সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতে অ-আর্থিক সম্পদে ব্যয় পরিমাপ করে। মোটা দাগে কোনো দেশে উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানোর জন্য যেসব সম্পদ (অবকাঠামো, ভবন ও যন্ত্রপাতি) নতুন করে তৈরি বা কেনা হয়, তার মোট মূল্যই হলো গ্রস ফিক্সড ক্যাপিটাল ফরমেশন। এর হিসাবায়নের ক্ষেত্রে সরকারি বিনিয়োগের (অবকাঠামো, মেগা প্রকল্প) পাশাপাশি বেসরকারি খাত ও বিদেশী বিনিয়োগকেও (এফডিআই) আমলে নেয়া হয়।
সারা বিশ্বে শিল্পায়নে মূলধনের জোগান আসে পুঁজিবাজার থেকে। যদিও বাংলাদেশে এ মূলধনের প্রধান উৎস ব্যাংক খাত। এক্ষেত্রে পুঁজিবাজারের অবদান যৎসামান্য। গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে মোট ব্যাংক ঋণের ৪৩ শতাংশ বা ৭ লাখ ৬৫ হাজার ১১৭ কোটি টাকা অর্থায়ন করা হয়েছে শিল্প খাতে। এর মধ্যে ৪ লাখ ২৩ হাজার ৫৮৭ কোটি টাকা মেয়াদি ঋণ এবং ৩ লাখ ৪১ হাজার ৫৩১ কোটি টাকা চলতি মূলধন। দেখা যাচ্ছে শিল্প খাতে পুঁজিবাজারের তুলনায় ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থায়ন করা হয়েছে সাত গুণেরও বেশি অর্থ। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩১ কোটি টাকা, যার প্রায় ৩১ শতাংশই শিল্প খাতে। স্বল্পমেয়াদি আমানতের অর্থ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে শিল্প খাতে ঋণ বিতরণ করার কারণে ব্যাংকগুলোকেও সমস্যায় পড়তে হয়েছে। এক্ষেত্রে পুঁজিবাজার থেকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন করা হলে সেটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি কোম্পানিগুলোর তহবিল সংগ্রহ ব্যয়কেও অনেকাংশে কমিয়ে দিত বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজার ইকুইটি বা কোম্পানিনির্ভর হলেও বৈশ্বিক চিত্র এর বিপরীত। বিশ্বের উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর পুঁজিবাজার বেশ বৈচিত্র্যময়। সেখানে কোম্পানির পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের বন্ড, ডেরিভেটিভস, কমোডিটি ও অবকাঠামো প্রকল্পের অর্থায়নও পুঁজিবাজারের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়। বাংলাদেশে সিকিউরিটাইজেশনের মাধ্যমে অবকাঠামো প্রকল্পের অর্থায়ন পুঁজিবাজারের মাধ্যমে সংগ্রহ করার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হলেও সেটি কখনো আলোর মুখ দেখেনি। তবে সম্প্রতি গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে বাজেট আলোচনায় অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সিকিউরিটাইজেশনের মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থায়নের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে বিষয়টি নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্যানুসারে, আইপিওর মাধ্যমে সর্বশেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে নয়টি কোম্পানি পুঁজিবাজার থেকে ৮৪১ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছিল। এ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিক থেকে এখন পর্যন্ত আইপিওর মাধ্যমে নতুন কোনো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়নি। দেশের পুঁজিবাজারে এত দীর্ঘ সময় ধরে আইপিও না আসার নজির আর কখনো দেখা যায়নি বলে জানিয়েছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, ২০২২ সালের শুরুতেই দেশের পুঁজিবাজারে মন্দা ভাব দেখা যায়, যা বর্তমানেও অব্যাহত রয়েছে। পুঁজিবাজারের এ নিম্নমুখিতার কারণে উদ্যোক্তারা কোম্পানিকে আইপিওতে আনতে আগ্রহ দেখান না। নিম্নমুখী বাজারে শেয়ারের প্রত্যাশিত দাম পাওয়া নিয়ে তাদের সংশয় থাকে। তাছাড়া বিগত সময়ে দেশের পুঁজিবাজারে যেভাবে অনিয়ম ও কারসাজির ঘটনা ঘটেছে তাতে অনেক ভালো কোম্পানি আগ্রহ হারিয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার (সাবেক) ক্ষমতা নিলে অনেকে প্রত্যাশা করেছিলেন যে পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াবে। যদিও সে প্রত্যাশার বাস্তবায়ন হয়নি। তার ওপর সে সময়ের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন করে কোনো বিনিয়োগে যাননি উদ্যোক্তারা। তবে এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর পুঁজিবাজারের পরিস্থিতি পরিবর্তন হওয়ার নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। সূচক ও লেনদেনে কিছুদিন এর প্রতিফলনও দেখা গেছে। অবশ্য এর কয়েকদিন পরই মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধের প্রভাবে ছন্দপতন ঘটে পুঁজিবাজারে। এ অবস্থায় নতুন করে ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য আইপিওতে আসার আগ্রহ দেখাচ্ছেন না উদ্যোক্তারা।
তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজের (বিএপিএলসি) প্রেসিডেন্ট এবং ন্যাশনাল পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজ পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিয়াদ মাহমুদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের পুঁজিবাজার অনেক পিছিয়ে আছে, সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না। তার ওপর আস্থার সংকটের বিষয়টি তো রয়েছেই। যদি গুটি কয়েক কোম্পানিও পুঁজিবাজার থেকে সংগৃহীত অর্থের অপব্যবহার করে তাহলে সেটির বহুগুণ নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাছাড়া পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তিকে উৎসাহিত করতে সেভাবে কোনো প্রণোদনা নেই। দেশের অর্থনীতির যে অবস্থা তাতে ব্যাংক খাত থেকে হুট করে অর্থায়ন করার মতো অবস্থা নেই এবং সেটি করা সঠিক হবে না। ফলে অর্থায়নের জন্য আমাদের পুঁজিবাজারে আসতেই হবে। এটি ছাড়া অর্থনীতিতে যে সংকট চলছে সেটি কাটিয়ে ওঠার অন্য কোনো উপায় নেই। এক্ষেত্রে সরকার কী ধরনের নীতি গ্রহণ করে আমরা সেটি দেখার অপেক্ষায় আছি।’
আইপিও তহবিল থেকে কোম্পানিগুলোর ব্যাংক ঋণ পুনর্গঠনের সুযোগ দেয়ার দাবি জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘বর্তমানে আইপিওর মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থের সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যাংক ঋণ পরিশোধের সুযোগ রয়েছে। এটিকে বাড়িয়ে ৯০ শতাংশ করা হলে সমস্যা কোথায়? আমরা এরই মধ্যে বিএসইসির কাছে এ সীমা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছি। উচ্চ সুদে নেয়া ঋণ পরিশোধে যদি আইপিওর অর্থ কাজে লাগানো যায়, তাহলে সেটি কোম্পানির ব্যয়ের বোঝা কমাতে সহায়ক হবে এবং এতে কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতাও বাড়বে।’
পুঁজিবাজারে আইপিওর মাধ্যমে কোম্পানির তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে অতীতে যেসব অনিয়ম হয়েছে সে কারণে আইপিও প্রক্রিয়াটি বিতর্কিত হয়ে পড়েছে। গত দেড় দশকে ১৪৯টি কোম্পানি আইপিওর মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে ১১ হাজার কোটি টাকার বেশি মূলধন সংগ্রহ করেছে, যার অধিকাংশই এসেছে খায়রুল কমিশনের মেয়াদে। এর মধ্যে অনেক কোম্পানি এখন আর্থিকভাবে দুর্বল ও ভঙ্গুর। উৎপাদন বন্ধ রয়েছে বেশকিছু কোম্পানির। আইপিওর অর্থ ভিন্ন খাতে ব্যয়ের ঘটনাও দেখা গেছে। এছাড়া কৃত্রিমভাবে কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়ানোর মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন অনেক উদ্যোক্তা। আইপিওর আগে প্লেসমেন্ট প্রক্রিয়ায়ও বড় অংকের অর্থ হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের টাকা ছাড়াই উপহার হিসেবে প্লেসমেন্ট শেয়ার দেয়া হয়েছে। এসব শেয়ার কোম্পানির তালিকাভুক্তির পর তারা বাড়তি দামে বিক্রি করেছেন। সব মিলিয়ে অতীতে পুরো আইপিও প্রক্রিয়াকে ঘিরে অনিয়ম ও কারসাজির বড় ধরনের একটি চক্র গড়ে উঠেছিল দেশের পুঁজিবাজারে।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ব্যাংক ঋণের সহজলভ্যতার কারণে পুঁজিবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহে কোম্পানিগুলোর আগ্রহে ঘাটতি রয়ে গেছে। তাছাড়া বিগত সময়ে তালিকাভুক্ত অনেক কোম্পানি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আইপিও তহবিলের অর্থ ব্যয় করতে পারেনি। ফলে এসব কোম্পানি প্রকৃতই ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য আইপিওতে এসেছে কিনা সে প্রশ্ন থেকেই যায়। ২০২৪ সালে দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে আইন ও বিধিবিধান পরিপালনে কঠোরতার বিষয়টি হয়তো কোম্পানি ও ইস্যু ব্যবস্থাপকদের নিরুৎসাহিত করে থাকতে পারে। কমিশন সম্প্রতি আইপিও বিধিমালায় পরিবর্তন এনেছে, শেয়ারের মূল্য নির্ধারণের বিষয়টি আগের চেয়ে আকর্ষণীয় করা হয়েছে। আশা করছি সামনের দিনে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ উত্তোলনে কোম্পানিগুলো আইপিওর জন্য আবেদন করবে।’
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করার মতো ভালো শেয়ারের ঘাটতি রয়েছে। প্রধান পুঁজিবাজার ডিএসইতে বর্তমানে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজের সংখ্যা ৬৪৫টি। এর মধ্যে কোম্পানির সংখ্যা মাত্র ৩৬০টি। এছাড়া ২২৫টি ট্রেজারি বন্ড, ১৬টি করপোরেট বন্ড, আটটি ডিবেঞ্চার, ৩৬টি মিউচুয়াল ফান্ড এক্সচেঞ্জটিতে তালিকাভুক্ত রয়েছে। তালিকাভুক্ত ৩৬০টি কোম্পানির মধ্যে ৩২টির উৎপাদন বর্তমানে বন্ধ। ৩৮টি কোম্পানির ব্যবসায়িক ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে রয়েছে বলে নিরীক্ষকের মতামতে উঠে এসেছে। এর বাইরে আরো অনেক কোম্পানি ব্যবসায়িকভাবে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। তাছাড়া উৎপাদন বন্ধ ও অস্তিত্ব সংকটে থাকা কোম্পানিগুলোর শেয়ারদর অস্বাভাবিক হারে বাড়ার প্রবণতাও বিদ্যমান। এ অবস্থায় দেশী ও বিদেশী বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে আস্থা পাচ্ছেন না। আর পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ কম থাকলে উদ্যোক্তারাও শেয়ারে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার শঙ্কায় পুঁজিবাজারবিমুখ হয়ে পড়েন।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশে যত সহজে ব্যাংক ঋণ পাওয়া যায় সেটি বিশ্বের আর কোথাও নেই। এর দুর্ভাগ্যজনক ফলাফল হচ্ছে অনেকগুলো ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বর্তমানে অস্তিত্ব সংকটে। একই সময়ে যদি পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করা যেত তাহলে এ দুরবস্থা হতো না। পুঁজিবাজারকে অগ্রাধিকার দেয়ার বিষয়টি শুধু কথায় নয় কাজেও দেখাতে হবে। অর্থাৎ পুঁজিবাজার থেকে পুঁজি উত্তোলন করতে হবে। কেউ যদি কোনো নতুন ব্যবসায়িক প্রকল্প বা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেন তাহলে সেখানে অর্থ সংগ্রহের ক্ষেত্রে ব্যাংক ও পুঁজিবাজারের মধ্যে একটি যৌক্তিক অনুপাত থাকতে হবে। উদাহরণস্বরূপ মোট অর্থায়নের ৬০ শতাংশ ব্যাংক এবং ৪০ শতাংশ পুঁজিবাজার থেকে নেয়া যেতে পারে। তারল্য সংকটের কারণে বর্তমানে ব্যাংকের পক্ষে উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। এ অবস্থায় বড় কোনো প্রকল্প কিংবা বিনিয়োগের জন্য পুঁজিবাজারে আসতেই হবে। তাই পুঁজিবাজার থেকে অর্থায়নের বিষয়টি বাধ্যতামূলক করতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এর বিকল্প নেই।’
কোনো দেশের পুঁজিবাজার কতটা পরিণত ও সবল সেটি পরিমাপের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হচ্ছে বিদেশী বিনিয়োগ। যদিও গত এক যুগে দেশের পুঁজিবাজারে বিদেশীদের নিট পোর্টফোলিও বিনিয়োগের পরিমাণ ক্রমেই কমেছে। এর মধ্যে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি ৬ হাজার ৭৯০ কোটি টাকার নিট পোর্টফোলিও বিনিয়োগ এসেছিল। এরপরের দুই অর্থবছরে নিট বিদেশী পোর্টফোলিও বিনিয়োগ কমলেও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তা কিছুটা বেড়েছিল। তবে এর পর থেকেই পুঁজিবাজারে পোর্টফোলিও বিনিয়োগ ধারাবাহিকভাবে নিম্নমুখী। ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে তা ঋণাত্মক ধারায় চলে গেছে। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নিট বিদেশী পোর্টফোলিও বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ১ হাজার ৬৮০ কোটি টাকায়। আর চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়েও বিদেশীদের নিট পোর্টফোলিও বিনিয়োগ ঋণাত্মক ৮ কোটি ২০ লাখ ডলার।
পুঁজিবাজারে নতুন কোম্পানির তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে মার্চেন্ট ব্যাংক। তালিকাভুক্তির জন্য কোম্পানির আবেদন প্রক্রিয়ার আইনি বিধিবিধান পরিপালন নিশ্চিত করার মূল দায়িত্ব মার্চেন্ট ব্যাংকের। পুঁজিবাজার থেকে অর্থায়নে কোম্পানিগুলোর অনীহা ও দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে আইপিও খরার বিষয়ে বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) প্রেসিডেন্ট ইফতেখার আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থা ব্যাংকনির্ভর হওয়ার কারণে কোনো কোম্পানির তহবিলের প্রয়োজন হলে সবার আগে ব্যাংকের কাছেই যাচ্ছে। আইপিও প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে দেখা যায় যে সময়মতো অর্থ পাওয়া যায় না। ২০১৫ সালের আগ পর্যন্ত বিধিবিধানের ক্ষেত্রে কিছুটা নমনীয়তা ছিল। কিন্তু এর পর থেকেই আইপিওর এক-তৃতীয়াংশ অর্থ ঋণ পরিশোধে ব্যয় করাসহ করপোরেট গভর্ন্যান্স কোডের মতো বিষয়গুলো চালু হয়। এতে অনেক কোম্পানি আইপিওতে আসতে নিরুৎসাহিত হয়েছে।’
বাংলাদেশের ব্যবসায়িক কাঠামো এখনো পরিবারকেন্দ্রিক হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, ‘এ কারণেও কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করার মানসিকতা অনেক উদ্যোক্তার মধ্যে গড়ে ওঠেনি। একটি কোম্পানি তালিকাভুক্ত হলে সুশাসন নিশ্চিত করাসহ বিভিন্ন ধরনের বিধিবিধান পরিপালন করতে গিয়ে যে ব্যয় হয় তার চেয়ে পুঁজিবাজারের বাইরে থাকলে বেশি সুবিধা পাওয়া যায়। এটিও পুঁজিবাজারে না আসার অন্যতম কারণ। ২০২৪ সালের আগস্টে দেশের রাষ্ট্রক্ষমতার পালাবদলের পর রাজনৈতিক অস্থিরতা ছিল। তার ওপর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, বন্যা এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সবকিছু মিলিয়ে আইপিওতে আসার মতো পরিস্থিতি ছিল না। তাছাড়া সেই সময় আইপিওর বিধিমালা পরিবর্তন করার বিষয়েও উদ্যোগ নেয়া হয়। এসব কারণে গত দুই বছরে আইপিও খরা তৈরি হয়েছে। বিএসইসির প্রণয়ন করা নতুন বিধিমালায় ভ্যালুয়েশনের পদ্ধতি পরিবর্তন করায় কোম্পানিগুলো আগের চেয়ে শেয়ারের ভালো দাম পাবে। আমরা চেষ্টা করছি কোম্পানিগুলোকে উদ্বুদ্ধ করার। বিএসইসির পক্ষ থেকেও যেসব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে সেগুলো দূর করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আশা করছি সামনে বেশকিছু নতুন আইপিও পুঁজিবাজারে আসবে।’
বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক পর্যায়ে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার বেশ তলানিতে। বর্তমানে বাংলাদেশের জিডিপির তুলনায় বাজার মূলধন মাত্র ৬ দশমিক ২২ শতাংশ। এমনকি অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে থাকা শ্রীলংকা ও পাকিস্তানেও জিডিপির তুলনায় বাজার মূলধনের পরিমাণ বাংলাদেশের চেয়ে বেশি। এর মধ্যে শ্রীলংকায় তা ২৬ দশমিক ৩৯ এবং পাকিস্তানে ১৬ দশমিক ৫০ শতাংশ। এশিয়ার অন্যান্য দেশ যেমন ভারত, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও মালয়েশিয়ার জিডিপির তুলনায় বাজার মূলধনের পরিমাণ বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি।