৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক ঋণ নিয়ে সতর্ক করল তিন আন্তর্জাতিক সংস্থা

আইআইএফের বুধবার প্রকাশিত ত্রৈমাসিক ঋণ পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্ব অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে আরো ঋণনির্ভর হয়ে উঠতে পারে।

বিশ্বের বড় অর্থনীতির দেশগুলোয় ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে সুদ পরিশোধের খরচ। এতে সরকার, ব্যবসা ও পরিবারের ওপর আর্থিক চাপ আরো তীব্র হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক ঋণ ও ঋণের খরচ নিয়ে সতর্ক করেছে তিনটি প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক সংস্থা। এগুলো হলো অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (ওইসিডি), আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বৈশ্বিক ব্যাংকি খাতের প্রতিনিধিত্বকারী ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ফাইন্যান্স (আইআইএফ)। খবর দ্য গার্ডিয়ান।

আইআইএফের বুধবার প্রকাশিত ত্রৈমাসিক ঋণ পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্ব অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে আরো ঋণনির্ভর হয়ে উঠতে পারে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে মোট ঋণের পরিমাণ প্রায় ৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলার। নতুন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াতে ও প্রবীণ জনগোষ্ঠীর ব্যয় সামলাতে সরকার ও কোম্পানিগুলো বেশি করে ঋণ নেয়ার দিকে ঝুঁকছে।

আইআইএফ বলছে, বিশ্বজুড়ে কাঠামোগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাওয়া অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি বাড়ানো ও নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে সরকার ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিযোগিতা করছে। ফলে বৈশ্বিক দেনা বৃদ্ধির গতি আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সংস্থাটি বিশ্বের শীর্ষ কয়েকটি অর্থনীতির পরিস্থিতির সঙ্গে ঋণসংকটে থাকা উদীয়মান দেশগুলোর তুলনা করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও জাপানের মতো বড় অর্থনীতির দেশে দীর্ঘদিন ধরে বড় বাজেট ঘাটতি রয়েছে। একই সঙ্গে বাড়ছে সুদ পরিশোধের ব্যয়। আইআইএফের মতে, এসব সমস্যা অতীতে ঋণসংকটে থাকা উদীয়মান দেশের ক্ষেত্রে দেখা গেছে।

এর সঙ্গে রাজনৈতিক চাপও যুক্ত হয়েছে। আগামী কয়েক মাসে বিভিন্ন দেশে নির্বাচন রয়েছে। এমন সময় সরকারি ব্যয় কমানো বা ঋণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া ভোটারদের কাছে জনপ্রিয় নাও হতে পারে।

এদিকে বৈশ্বিক অর্থনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধের বাড়তি খরচের কথা বলছে ওইসিডি। সংস্থাটির অন্তর্বর্তী অর্থনৈতিক পূর্বাভাসে বলা হয়, সাম্প্রতিক বিভিন্ন চাপের মধ্যেও চলতি বছর এখন পর্যন্ত বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশার তুলনায় স্থিতিশীল রয়েছে। তবে সরকারি ঋণের খরচ ও উচ্চ সুদহার নিয়ে ঝুঁকি বাড়ছে।

ওইসিডির মহাসচিব ম্যাথিয়াস করম্যান বলেন, ‘আর্থিক ও রাজস্বসংক্রান্ত ঝুঁকি বেড়েছে। জি৭-ভুক্ত ছয়টি দেশে ৩০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদহার অন্তত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। ফলে আগে থেকেই চাপের মধ্যে থাকা সরকারি বাজেটে ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় বাড়ছে। একই সঙ্গে ব্যবসা ও পরিবারের জন্যও লোন নেয়ার খরচ বাড়ছে।’

অর্থাৎ সরকারকে আগের তুলনায় ঋণের পেছনে অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে বেশি। এতে অন্যান্য খাতে খরচের সুযোগ কমতে পারে। একই সময় উচ্চ সুদের কারণে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবারগুলো নতুন ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে বাড়তি খরচের মুখে পড়তে পারে।

আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভাও উন্নত অর্থনীতিগুলোকে ঋণ কমানোর উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানান। বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘ধারাবাহিক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কা ঋণের মাত্রা ধাপে ধাপে বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু অনেক সরকার সুদ পরিশোধের খরচ নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট পদক্ষেপ নেয়নি। পরিস্থিতি সামাল দিতে এখন পদক্ষেপ নেয়ার সময় এসেছে।’

এদিকে ওইসিডি ত্রৈমাসিক অর্থনৈতিক পূর্বাভাসও প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি বলেছে, চলতি বছর বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি আগের ধারণার চেয়ে কিছুটা ইতিবাচক হতে পারে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও এর প্রভাবে জ্বালানি তেল এবং গ্যাসের দাম ফের বাড়ায় আগামী মাসগুলোয় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

ওইসিডির পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ৯ শতাংশ হারে বাড়তে পারে। এর আগে জুনে সংস্থাটি ২ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেয়। অর্থাৎ পূর্বাভাস দশমিক ১ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়ানো হয়েছে। তবে আগামী বছরের পূর্বাভাস কিছুটা কমিয়েছে সংস্থাটি। জুনে ৩ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেয়া হলেও এখন তা ৩ শতাংশ করা হয়েছে।

সংস্থাটি বলছে, বিশ্ব অর্থনীতির সম্ভাবনা এখনো মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের টেকসই সমাধানের ওপর অনেকাংশে নির্ভর করছে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি সরবরাহ ও দামের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। এর প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশ্ব অর্থনীতির জন্য আরেকটি বড় ঝুঁকি হিসেবে এল নিনোর কথাও উল্লেখ করেছে ওইসিডি। সংস্থাটির মতে, রেকর্ড ভাঙা এল নিনো আবহাওয়া পরিস্থিতি আগামী সময়ে বড় ধরনের নেতিবাচক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এটি কৃষি উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে খাদ্যপণ্যের দামও বাড়তে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, এল নিনো একটি প্রাকৃতিক আবহাওয়াগত ঘটনা। এর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার স্বাভাবিক ধরন বদলে যেতে পারে। কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হলে খাদ্য সরবরাহ কমে দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। ফলে মূল্যস্ফীতির ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।

যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি নিয়েও পূর্বাভাস দিয়েছে ওইসিডি। দেশটির মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস চলতি বছরের জন্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে সংস্থাটি। জুনে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস দেয়া হয়েছিল। এখন তা কমিয়ে ৩ দশমিক ১ শতাংশ করা হয়েছে। পূর্বাভাসের তুলনায় দেশটিতে পণ্যের দাম ধীরগতিতে বাড়ছে।

আইআইএফ, ওইসিডি ও আইএমএফের সতর্কবার্তার মূল বিষয় হলো বিশ্ব অর্থনীতিতে ঋণের পরিমাণ শুধু বাড়ছেই না, সে ঋণ পরিচালনার খরচও বাড়ছে। দুই প্রবণতা একসঙ্গে চলতে থাকলে বড় অর্থনীতির দেশগুলোয় সরকারি বাজেট, ব্যবসায়িক বিনিয়োগ ও পরিবারের ঋণ নেয়ার সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।

আরও