আইডিআরএ পরিদর্শন শেষে অর্থমন্ত্রী

বীমা দাবি পরিশোধে ব্যর্থ হলে সম্পদ বিক্রি করে হলেও গ্রাহকের টাকা ফেরত দেয়া হবে

বীমা খাতে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।

দেশে বীমা দাবি নিষ্পত্তির হার ক্রমেই নিম্নমুখী হচ্ছে। ২০২৫ সাল শেষে বীমা খাতে অনিষ্পন্ন দাবির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭ হাজার ৯১২ কোটি টাকায়। এর মধ্যে জীবন বীমা খাতে ৪ হাজার ৪০৩ কোটি ও সাধারণ বীমা খাতে ৩ হাজার ৫০৯ কোটি টাকার দাবি অনিষ্পন্ন ছিল। এমন পরিস্থিতিতে বীমা খাতের বর্তমান অবস্থা সুখকর নয় বলে মন্তব্য করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, ‘ব্যাংক খাতের মতো বীমা খাতেও অনিয়ম ও লুটপাট হয়েছে। গ্রাহকদের বৈধ দাবি পরিশোধে কোম্পানিগুলোকে সময় বেঁধে দেয়া হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি পরিশোধে ব্যর্থ হলে প্রয়োজনে কোম্পানির সম্পদ বিক্রি করে হলেও গ্রাহকের পাওনা পরিশোধ করা হবে।’

গতকাল রাজধানীর মতিঝিলে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) কার্যালয় পরিদর্শন ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন অর্থমন্ত্রী। এ সময় আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে সচিব নাজমা মোবারেক ও আইডিআরএর চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন উপস্থিত ছিলেন।

বীমা খাতে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘বীমা কোম্পানিগুলোকে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকির আওতায় আনা হবে। সব কোম্পানিকে অটোমেশনের আওতায় আসতে হবে এবং সব ধরনের লেনদেন অনলাইনে করতে হবে।’

বীমা খাতকে অনিয়ন্ত্রিত অবস্থায় যেতে না দেয়ার বিষয়ে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথাও জানান তিনি। নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা না মানলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বীমা কোম্পানিগুলোর আর্থিক সক্ষমতা, সুশাসন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে হবে। প্রয়োজনে আইন ও বিধিবিধানেও পরিবর্তন আনা হবে। পাশাপাশি আইডিআরএর জনবল বৃদ্ধি ও দক্ষতা উন্নয়নের উদ্যোগ নেয়া হবে। এসব পরিবর্তন আগামী দিনে সংসদের মাধ্যমে আনা হতে পারে।’

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের বীমা খাতকে বিশ্বমানের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার বড় সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সে সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। সাধারণ মানুষ ভবিষ্যতের নিরাপত্তার জন্য জীবনের কষ্টার্জিত অর্থের একটি অংশ বীমায় বিনিয়োগ করেন। দুর্দিনে সেই অর্থ ফেরত পাওয়ার প্রত্যাশা থাকে তাদের। কিন্তু বীমা কোম্পানিগুলোর একটি বড় অংশ গ্রাহকদের দাবি পরিশোধ করেনি।’

তিনি বলেন, ‘বীমা খাতে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় আইডিআরএর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্বলতা ও আস্থার সংকট দূর করতে কর্তৃপক্ষ সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে এবং তদারকি আরো জোরদার করা হয়েছে।’

আইডিআরএর অনিরীক্ষিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সাল শেষে জীবন বীমা খাতে অনিষ্পন্ন দাবির পরিমাণ ৪ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা। এ সময়ে এ খাতে ৩৩ শতাংশ দাবি অনিষ্পন্ন ছিল। অন্যদিকে সাধারণ বীমা খাতে অনিষ্পন্ন দাবির পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৫০৯ কোটি টাকা। এ খাতে অনিষ্পন্ন দাবির হার ছিল ৭১ শতাংশ। দুই খাত মিলিয়ে ২০২৫ সাল শেষে অনিষ্পন্ন দাবির পরিমাণ দাঁড়ায় ৭ হাজার ৯১২ কোটি টাকায়।

দাবি নিষ্পত্তির এ নিম্নমুখী হার পুরো আর্থিক খাতের জন্যই উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে বীমা খাতের ওপর গ্রাহকদের আস্থার সংকটও দিন দিন ঘনীভূত হচ্ছে। বিশেষ করে সংকটে থাকা কয়েকটি কোম্পানির তারল্য ঘাটতির কারণে বিপুলসংখ্যক গ্রাহকের দাবি বছরের পর বছর বকেয়া থাকছে।

আইডিআরএর অনিরীক্ষিত তথ্য অনুযায়ী, জীবন বীমা খাতে মোট অনিষ্পন্ন পলিসির সংখ্যা ১১ লাখ ৮৫ হাজার ৫১৬। এ খাতে অনিষ্পন্ন দাবির প্রায় ৯০ শতাংশের দায়ভার পাঁচটি সমস্যাগ্রস্ত কোম্পানির। ফলে মুষ্টিমেয় কয়েকটি কোম্পানির দুর্বলতার প্রভাব পুরো জীবন বীমা খাতের ওপর পড়ছে।

জীবন বীমা খাতের গড় দাবি নিষ্পত্তির হার তুলনামূলকভাবে বেশি হলেও কোম্পানিভেদে এক্ষেত্রে বড় পার্থক্য রয়েছে। কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি সময়মতো দাবি পরিশোধ করলেও সংকটে থাকা কোম্পানিগুলোর গ্রাহকদের বড় অংশকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

বাংলাদেশে বর্তমানে নিবন্ধিত বীমা কোম্পানির সংখ্যা ৮২। এর মধ্যে জীবন বীমা কোম্পানি ৩৬টি। তার মধ্যে ৩৫টি বেসরকারি ও একটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জীবন বীমা করপোরেশন। সাধারণ বা নন-লাইফ বীমা কোম্পানি রয়েছে ৪৬টি। এর মধ্যে ৪৫টি বেসরকারি ও একটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সাধারণ বীমা করপোরেশন।

আরও