চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের আওতায় বন্ধ ঘোষণা করে। এতে প্রায় ২৫ হাজার স্থায়ী শ্রমিকের চাকরি অবসায়ন হয়। সেপ্টেম্বরের মধ্যে শ্রমিকদের সব পাওনা পরিশোধের ঘোষণাও দেয়া হয়। তবে পাওনা পরিশোধের আগেই ৩১ আগস্টের মধ্যে মিল এলাকায় বসবাস করা শ্রমিকদের নামে বরাদ্দ দেয়া জমি-বাসস্থান ছেড়ে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। মিলগুলোর এই ঘোষণায় শ্রম আইন লঙ্ঘিত হয়েছে বলে দাবি তুলেছেন শ্রমিকরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি মাসের বিভিন্ন সময়ে দেশের ২৫টি সরকারি পাটকলের মধ্যে যেসব পাটকলে আবাসিক হিসেবে শ্রমিকরা অবস্থান করেন এবং যেসব মিলের অভ্যন্তরে লিজ আকারে শ্রমিকদের নামে জমি বরাদ্দ দেয়া রয়েছে, সেসব মিলের শ্রমিকদের বাসস্থান ও বরাদ্দ দেয়া জমি ছাড়ার নোটিস দেয়া হয়। কিন্তু সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী স্থায়ী শ্রমিকরা সম্পূর্ণ পাওনা বুঝে না পাওয়ার আগেই মিল এলাকা থেকে বাসস্থান ছেড়ে দেয়ার নির্দেশে পাটকলগুলোর অভ্যন্তরে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন পাটকলের অভ্যন্তরে শ্রমিকরা জমি বরাদ্দ নিয়ে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও স্থাপন করেছেন। কিন্তু পাওনা পরিশোধের আগে এসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও ছেড়ে দিতে রাজি হচ্ছেন না শ্রমিকরা। অন্যদিকে বরাদ্দ দেয়া জমি বা বাসা ছেড়ে না দিলে সরকার ঘোষিত পাওনা পরিশোধ স্থগিত করারও হুমকি দেয়া হয়েছে।
১৯ আগস্ট চট্টগ্রামের হাফিজ জুট মিল কর্তৃপক্ষ একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। মিলটির প্রকল্প প্রধান স্বাক্ষরিত ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, শ্রম আইনের ৩২ ধারার উপধারা (১) অনুযায়ী চাকরি থেকে অবসায়নের ৬০ দিনের মধ্যে শ্রমিকদের বাসাবাড়ি ছেড়ে দেয়ার নিয়ম রয়েছে। তাই আগামী ৩১ আগস্টের মধ্যে মিল এলাকায় আবাসিক থাকা বাসিন্দারা বাসস্থান/সিট ছেড়ে দেবেন। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর থেকেই চট্টগ্রাম ও খুলনা অঞ্চলের বিভিন্ন মিলের শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে শ্রমিক ও শ্রমিক নেতারা আলাদা আলাদাভাবে মিল প্রধানের কাছে পাওনা পরিশোধের আগে বরাদ্দ দেয়া বাসস্থান ছাড়বেন না বলে ঘোষণা দিয়েছেন।
অন্যদিকে ৬ আগস্ট আমিন জুট মিলের জমি বরাদ্দ পাওয়া শ্রমিকদের ৩১ আগস্টের মধ্যে বরাদ্দ দেয়া জমিতে গড়ে তোলা স্থাপনা ছেড়ে দিতে নোটিস দেয়া হয়। এর মধ্যে আমিন জুট মিলের সাবেক শ্রমিক (তাঁতি) মিজানুর শেখকে দেয়া নোটিসে দেখা যায়, ২০১৭ সালের ১ মে জুট মিলের অভ্যন্তরের ৪১ নং দোকান/ঘরের খালি জমি বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু চলতি বছরের ১ জুলাই মিল বন্ধ হওয়ায় বরাদ্দ দেয়া জমিতে তৈরি স্থাপনা ৩১ আগস্টের মধ্যে নিজ খরচে সরিয়ে নিয়ে খালি জমি মিল কর্তৃপক্ষের গঠিত কমিটিকে বুঝিয়ে দিতে নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হয়েছে। অন্যথায় মিলের জায়গা অবৈধভাবে দখলে রাখার দায়ে পাওনাদি পরিশোধ স্থগিতসহ তার বিরুদ্ধে আইনানুগ কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে কর্তৃপক্ষ বাধ্য হবে বলে জানানো হয়। এছাড়া আমিন জুট মিলের জমি বরাদ্দ পাওয়া ১৭৯ জন শ্রমিককে এ নোটিস দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি মিলটির অভ্যন্তরে বাসা নিয়ে থাকা শ্রমিকদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মিল এলাকা ছেড়ে যেতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
২০০৬ সালের শ্রম আইনের ৩২ ধারার উপধারা (১) অনুযায়ী বন্ধ হওয়া ২৫টি মিল কর্তৃপক্ষ মিল অভ্যন্তরের আবাসিক শ্রমিকদের ৩১ আগস্টের মধ্যে বরাদ্দকৃত স্থান ছেড়ে দেয়ার নোটিস দেয়। এ আইনে বলা হয়েছে, ‘কোনো শ্রমিক চাকরি অবসায়ন হলে অবসায়নের ৬০ দিনের মধ্যে মালিক কর্তৃক বরাদ্দকৃত বাসস্থান ছেড়ে দিতে হবে।’
তবে ৩২ ধারার উপধারা (২)-এ বলা হয়েছে, ‘উক্ত সময়ের মধ্যে বাসস্থান ছেড়ে না দিলে মালিক শ্রম আদালতে তার (শ্রমিকের) বিরুদ্ধে অভিযোগ পেশ করতে পারবেন। তবে শর্ত থাকে যে শ্রমিকের সকল পাওনা পরিশোধ না করিয়া কোনো শ্রমিককে বাসস্থান হইতে উচ্ছেদ করা যাবে না।’
মূলত ২০০৬ সালের শ্রম আইনের ৩২ ধারার উপধারা (২)-এর আলোকে মিল কর্তৃপক্ষের দেয়া বাসস্থান ছাড়া অবৈধ বলে অভিযোগ তুলেছেন শ্রমিকরা। এরই মধ্যে পাওনা পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত মিল এলাকায় আবাসিক থাকা শ্রমিকরা তাদের নামে বরাদ্দ দেয়া বাসস্থান ছাড়বেন না। এরই মধ্যে বিভিন্ন মিল কর্তৃপক্ষকে শ্রমিক ইউনিয়ন থেকে পাল্টা চিঠিও দেয়ার প্রস্তুতি নিয়েছেন শ্রমিক নেতারা।
ভুক্তভোগী শ্রমিক ও শ্রমিক নেতাদের দাবি, সরকার সেপ্টেম্বরের মধ্যে পাওনা পরিশোধের ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো শ্রমিক গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের পাওনা পাননি। পাওনা বুঝে না পেলে কোনো শ্রমিকই মিল এলাকার বাসস্থান ছেড়ে যাবেন না। মিল কর্তৃপক্ষ শ্রম আইন লঙ্ঘন করে শ্রমিকদের মিল থেকে উচ্ছেদের চেষ্টা করছে বলেও দাবি করেন তারা।
জানতে চাইলে হাফিজ জুট মিলের প্রকল্প প্রধান মো. জসিম উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, আমি দায়িত্ব গ্রহণ করেছি সম্প্রতি। সরকার শ্রমিকের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পাওনা পরিশোধে বদ্ধপরিকর। শ্রমিকের কল্যাণে যা যা সুযোগ-সুবিধা দেয়া প্রয়োজন, তা বাস্তবায়ন করছে বিজেএমসি। তবে পাওনা পরিশোধের আগে শ্রমিকের বাসস্থান থেকে উচ্ছেদের বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
জানা যায়, বাংলাদেশ জুট মিল করপোরেশন (বিজেএমসি) পরিচালনাধীন ২৫টি পাটকলের মধ্যে ১১টিতে শ্রমিকরা মিল অভ্যন্তরে থাকেন। স্থায়ী শ্রমিকের পাশাপাশি স্থায়ী শ্রমিকের নামে বরাদ্দকৃত জমিতে কাঁচা/সেমি পাকা ঘর নির্মাণের মাধ্যমে অস্থায়ী ও বদলি শ্রমিকরা পরিবার নিয়ে বসবাস করেন। বরাদ্দকৃত এসব জমিতে বাজার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও গড়ে উঠেছে। এসব বাণিজ্যিক স্থাপনার বিপরীতে মাসিক ভিত্তিতে ভাড়া (প্রতি বর্গফুট হিসাবে), বৈদ্যুতিক
বিলসহ বিভিন্ন খাতে অর্থ শ্রমিকের সাপ্তাহিক মজুরি থেকে কেটে নেয় মিলগুলো। সরকার পাটকল বন্ধ ঘোষণার পর এরই মধ্যে অনেক শ্রমিক গ্রামের বাড়ি কিংবা অন্যত্র বাসা স্থানান্তর করেছেন। তবে স্থায়ী শ্রমিক যাদের অন্য কোনো উপায় নেই, তারাই এখন পর্যন্ত মিল এলাকার বাসাবাড়িতে অবস্থান করছেন। পাওনা পরিশোধের আগেই বাসস্থান ছাড়ার নোটিসে মিলগুলোয় নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে বলে স্বীকার করেছেন চট্টগ্রামের পাটকলগুলোর একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চট্টগ্রামের বিজেএমসির এক কর্মকর্তা শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধের আগে বাসস্থান ছাড়ার নির্দেশনায় শ্রম আইন লঙ্ঘিত হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, চাকরি থেকে অবসায়নের ৬০ দিনের মধ্যে শ্রম আইনে শ্রমিকদের বাসস্থান ছাড়ার নির্দেশনা আছে। তবে পাওনা পরিশোধের আগে বাসস্থান ছাড়তে বলা শ্রম আইনের লঙ্ঘন। এক্ষেত্রে শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধের আগে শ্রম ও কল্যাণ কর্মকর্তার কাছ থেকে ক্লিয়ারেন্স বা অনাপত্তিপত্র গ্রহণ করতে হয়। ফলে যেসব শ্রমিকের নামে বাসা, জমি বরাদ্দ রয়েছে, তাদের অনাপত্তিপত্র সংগ্রহের জন্যই বরাদ্দকৃত স্থাপনা ছেড়ে দেয়া প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। মন্ত্রণালয় চাইলে শ্রম আইন লঙ্ঘন না করে বিশেষ নির্দেশনায় শ্রমিকদের জন্য ছাড় দিতে পারত বলে মনে করেন তিনি।
জানা গেছে, বিজেএমসির ২৫টি মিলের মধ্যে শ্রমিক নিয়োজিত রয়েছে ২১ মিলের নামে। এসব মিলের মোট শ্রমিক সংখ্যা ২৪ হাজার ৫৯৭ (একজন মামলাধীন)। এর মধ্যে ঢাকা অঞ্চলের ছয়টি পাটকলের মোট শ্রমিক সংখ্যা ৯ হাজার ৪৫০, চট্টগ্রাম অঞ্চলের আটটি পাটকলের শ্রমিক সংখ্যা ৪ হাজার ৮১৫ এবং খুলনা অঞ্চলের সাতটি পাটকলের মোট শ্রমিক সংখ্যা ১০ হাজার ৩৩২।
শ্রমিকদের অন্যায্যভাবে বাসস্থান থেকে সরে যাওয়ার নির্দেশনার বিষয়ে আমিন জুট মিলের সিবিএ সাধারণ সম্পাদক মো. মোস্তফা বণিক বার্তাকে বলেন, শ্রমিকরা পাটকল বন্ধের সরকারি সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছেন। কিন্তু পাওনা পরিশোধের আগে শ্রমিকদের বাসাবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করার ঘোষণা মেনে নেয়া হবে না। শ্রমিকরা নিজ উদ্যোগে মিল কর্তৃপক্ষকে বাসা ছাড়তে অপারগতা জানিয়ে পাল্টা চিঠি দিচ্ছেন। দাবি মানা না হলে শ্রমিক নেতারা আন্দোলনের কর্মসূচি দেবেন।