হরমুজ প্রণালি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে বাড়ছে অনিশ্চয়তা। এ পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস উত্তোলনকারী দেশগুলো হরমুজ এড়িয়ে বিকল্প পথে জ্বালানি রফতানির চেষ্টা করছে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) এরই মধ্যে বিকল্প পাইপলাইন সম্প্রসারণ করেছে। তবে তুলনামূলক বেশি সংকটে পড়েছে ইরাক, কুয়েত ও কাতার। কারণ এসব দেশের জ্বালানি রফতানির বড় অংশই হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। খবর নিক্কেই এশিয়া।
এমন পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে বিকল্প অবকাঠামো নির্মাণ ও সম্প্রসারণে সহযোগিতার প্রস্তুতি নিচ্ছে জাপান। দেশটি অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের ৯০ শতাংশের বেশি মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে। ফলে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে রফতানির বিকল্প পথ তৈরি করা জাপানের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
তাছাড়া বিশ্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও এক-পঞ্চমাংশ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবাহিত হয় গুরুত্বপূর্ণ এ আন্তর্জাতিক নৌপথ দিয়ে। কিন্তু চলতি বছরের প্রথম দিকে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সামরিক ঝুঁকিতে প্রণালিটি কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। ফলে এশিয়া ও ইউরোপের জ্বালানিনির্ভর দেশগুলোয় তৈরি হয়েছে তীব্র উদ্বেগ।
বিকল্প রফতানি পথ তৈরিতে এগিয়ে এসেছে ইরাকও। গত জুলাইয়ে ইরাকের মধ্যাঞ্চল থেকে সিরিয়ার বানিয়াস বন্দর পর্যন্ত একটি পুরনো পাইপলাইন সংস্কারের পরিকল্পনা জানায় যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন তেল কোম্পানি শেভরন এ বিষয়ে সম্ভাব্যতা যাচাই করছে। পঞ্চাশের দশকে নির্মিত পাইপলাইনটি রাজনৈতিক বৈরিতা, ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধ ও পরবর্তী সময়ে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের কারণে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়াকে সন্ত্রাসী রাষ্ট্রের তালিকা থেকে বাদ দেয়ায় প্রকল্পটি নতুন গতি পেয়েছে। পাশাপাশি তুরস্কের জেহান ও জর্ডানের আকাবা বন্দর দিয়ে তেল রফতানির পথও বিবেচনা করছে ইরাক। দেশটি প্রতিদিন ৪০ লাখ ব্যারেলের বেশি অপরিশোধিত জ্বালানি তেল উত্তোলন করে।
অন্যদিকে বিকল্প কোনো পাইপলাইন না থাকায় সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতে রয়েছে কুয়েত। দেশটির তেলমন্ত্রী তারেক সুলাইমান আল-রুমি বলেছেন, প্রণালিটি বন্ধ থাকায় কুয়েতের তেল রফতানি শূন্যের কোঠায় নেমেছে। সংকট মোকাবেলায় সৌদি আরব ও ইউএইর পাইপলাইন নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছেন তারা।
কাতার আরো বড় সংকটে পড়েছে। কারণ দেশটির প্রধান রফতানি পণ্য এলএনজি, যার পুরোটাই পরিবাহিত হয় হরমুজ দিয়ে। ফলে অচলাবস্থা দীর্ঘ হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার গ্রাহকদের সরবরাহের প্রতিশ্রুতি পূরণে কাতারএনার্জি যুক্তরাষ্ট্র থেকে চড়া দামে এলএনজি কিনতে বাধ্য হয়েছে।
ইরাক, কুয়েত ও কাতার মিলে প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল হরমুজ দিয়ে রফতানি করে। এটি এ জলপথ দিয়ে যাওয়া মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। তাই সংকট যত দীর্ঘ হবে, বিশ্ব অর্থনীতিতে এর প্রভাবও তত বাড়বে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, বিকল্প পাইপলাইন তৈরি করলেও ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হবে না। এপ্রিলে ইরানের ড্রোন হামলায় সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ফুজাইরাহ বন্দরও অতীতে হামলার শিকার হয়েছে। তার পরও বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বিকল্প পথ তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।