এতে পশ্চিমা বিশ্বের প্রায় ৬ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের শিল্প উৎপাদন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে সতর্কবার্তা দিয়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ)। সংস্থাটির মতে, এ ধরনের নিয়ন্ত্রণ কার্যকর হলে গাড়ি, উচ্চপ্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি খাতের বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। খবর রয়টার্স।
সম্প্রতি প্রকাশিত গ্লোবাল ক্রিটিক্যাল মিনারেলস আউটলুক প্রতিবেদনে আইইএ জানায়, বিরল খনিজের বৈশ্বিক সরবরাহ এখনো কয়েকটি দেশের ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল। এর মধ্যে চীনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। ফলে রফতানি নিয়ন্ত্রণ কঠোর হলে বিশ্বের বিভিন্ন শিল্পে কাঁচামালের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
বিরল খনিজ এমন ১৭ ধরনের ধাতুর একটি গ্রুপ, যেগুলো অল্প পরিমাণে ব্যবহার হলেও আধুনিক শিল্পে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গাড়ি, উড়োজাহাজ, স্মার্টফোন, বিভিন্ন ইলেকট্রনিক যন্ত্র, নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি ও সামরিক সরঞ্জাম তৈরিতে এসব ধাতু ব্যবহার করা হয়।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিরল খনিজ উত্তোলনকারী চীন। দেশটি গত বছরের অক্টোবরে আরো কয়েক ধরনের গুরুত্বপূর্ণ খনিজকে রফতানি নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনে। একই সঙ্গে নতুন লাইসেন্সিং ব্যবস্থা চালু করে। পরে এক বছরের জন্য সে নিয়ন্ত্রণ কার্যকর করার সময় পিছিয়ে দেয়া হয়।
আইইএর হিসাব অনুযায়ী, নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি কার্যকর হলে চীনের বাইরে গাড়ি, উচ্চপ্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি খাতের প্রায় ৬ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের উৎপাদন সরবরাহ বিঘ্নের ঝুঁকিতে পড়বে। এর অর্থ প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সময়মতো না পেলে উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে, ব্যয় বাড়তে পারে এবং অনেক শিল্পে পণ্যের সরবরাহ কমে যেতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এ পরিস্থিতির সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক প্রভাব পড়বে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে। সম্ভাব্য মোট ক্ষতির প্রায় অর্ধেকই দুই অঞ্চলের শিল্প খাতকে বহন করতে হতে পারে। কারণ উন্নত প্রযুক্তি ও শিল্প উৎপাদনের জন্য দেশ দুটি এখনো চীনের সরবরাহের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল।
আইইএর নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরোল বলেন, ‘সর্বশেষ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তুলনামূলকভাবে অল্প পরিমাণ গুরুত্বপূর্ণ খনিজের ওপর বিপুল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নির্ভর করছে। কিন্তু এসব খনিজের সরবরাহ ব্যবস্থা কয়েকটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ফলে সরবরাহ শৃঙ্খল সহজেই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।’
শুধু বিরল খনিজ নয়, গ্রাফাইট নিয়েও সতর্ক করেছে আইইএ। বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির (ইভি) ব্যাটারি তৈরির অন্যতম প্রধান কাঁচামাল গ্রাফাইটের রফতানিতেও নিয়ন্ত্রণ আরোপের পরিকল্পনা করেছিল চীন। সেটিও পরে স্থগিত করা হয়। তবে ভবিষ্যতে নিয়ন্ত্রণ কার্যকর হলে চীনের বাইরে আরো প্রায় ৩০ হাজার কোটি ডলারের উৎপাদন ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
বর্তমানে বিশ্বে প্রক্রিয়াজাত গ্রাফাইট উৎপাদনের ৯০ শতাংশের বেশি চীনের দখলে। ফলে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি শিল্পেও দেশটির অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী। এ নির্ভরতা কমানো সহজ হবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপসহ পশ্চিমা দেশগুলো বিকল্প গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও মালয়েশিয়ায় নতুন বিরল খনিজ পরিশোধন প্রকল্প চালু হওয়ায় বৈশ্বিক বাজারে চীনের হিস্যা কিছুটা কমেছে। ২০২৩ সালে যেখানে এ বাজারে চীনের হিস্যা ছিল ৯০ শতাংশ, গত বছর তা কমে ৮৫ শতাংশে নেমে আসে। পরিকল্পনাধীন প্রকল্পগুলো সময়মতো বাস্তবায়ন হলে ২০৩৫ সালের মধ্যে এটি আরো কমে ৭০ শতাংশে নামতে পারে বলে আইইএর পূর্বাভাস।
সংস্থাটি বলছে, বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সময় লাগবে। ততদিন পর্যন্ত বিরল খনিজ ও গ্রাফাইটের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের ক্ষেত্রে চীনের ওপর বিশ্বের নির্ভরতা বহাল থাকবে। ফলে রফতানি নীতিতে যেকোনো পরিবর্তন বৈশ্বিক শিল্প ও প্রযুক্তি খাতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।