মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে সম্ভাব্য জ্বালানি তেল সংকটের আশঙ্কায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু দেশ নতুন পদক্ষেপ নিচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে নাগরিকদের ওয়ার্ক ফ্রম হোমের বা বাড়ি থেকে কাজের পাশাপাশি চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালু এবং জ্বালানি তেলের ওপর ভর্তুকি বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি। খবর এফটি।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ৭০ কোটিরও বেশি মানুষের বসবাস। অঞ্চলটি জ্বালানি তেল ও গ্যাসের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট কার্যালয় গতকাল জানিয়েছে, জ্বালানি সাশ্রয়ের অংশ হিসেবে কর্মকর্তাদের ‘শুধু অপরিহার্য কাজ ছাড়া সরকারি সফর সীমিত রাখতে হবে’। এর আগে অনেক সরকারি দপ্তরে চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালুর নির্দেশ দেয়া হয়েছিল।
থাইল্যান্ড সরকার অধিকাংশ সরকারি সংস্থার কর্মীদের বাড়ি থেকে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছে। ভিয়েতনামে কোম্পানিগুলোকে রিমোট ওয়ার্কিং উৎসাহিত করতে বলা হয়েছে এবং সাধারণ মানুষকে কারপুলিং বা সাইকেল ব্যবহারে অগ্রাধিকার দিতে আহ্বান জানিয়েছে। অন্যদিকে ইন্দোনেশিয়া জ্বালানি তেলের ভর্তুকিতে ব্যয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
এমন সময় জ্বালানি তেল ও গ্যাসের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে, যখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি বড় অর্থনীতি ধীরগতির প্রবৃদ্ধি দেখছে। ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা শুরুর পর জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে বাড়তে গত সোমবার প্রতি ব্যারেল প্রায় ১১৯ ডলারে পৌঁছায়, পরে তা কমে প্রায় ৯০ ডলারে নেমে আসে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দীর্ঘ সময় ধরে জ্বালানি তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকলে জ্বালানি ভর্তুকি দেয়া সরকারের বাজেট ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। পাশাপাশি এটি মূল্যস্ফীতির চাপও বাড়াবে। ফলে প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সহায়ক সুদহার কমানোর ধারা থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো বিরত থাকতে পারে।
বার্কলেস ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের অর্থনীতিবিদ ব্রায়ান ট্যান বলেন, ‘অর্থনীতির সব খাত যদি ভালো করত, তাহলে নীতিনির্ধারকরা বেশি স্বস্তিতে থাকতেন। কিন্তু এখন প্রবৃদ্ধি সমানভাবে হচ্ছে না। এতে অনেক দেশের আর্থিক ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ছে।’
ট্যান বলেন, এ অঞ্চলের প্রবৃদ্ধি মূলত কিছু নির্দিষ্ট খাত। যেমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ডাটা সেন্টার। তবে এসব খাত পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি করছে না বা মজুরি বাড়াতে পারছে না।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, গত বছর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৫ শতাংশ এবং চলতি বছর তা ৪ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে আসতে পারে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনীতি ইন্দোনেশিয়া। প্রাথমিক পণ্য রফতানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, মধ্যবিত্ত শ্রেণির সংকোচন এবং ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে চাপে ফেলছে। দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি থাইল্যান্ড উচ্চ পারিবারিক ঋণ, বয়স্ক জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং পর্যটন খাতের দুর্বলতায় ভুগছে।
জ্বালানি তেলের ভর্তুকি দেয়া দেশ ইন্দোনেশিয়াকে বিশ্লেষকরা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন। কারণ প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোর ব্যয়বহুল সামাজিক কল্যাণনীতি। ২০২৪ সালের অক্টোবরে ক্ষমতায় আসার পর তিনি আর্থিক শৃঙ্খলার চেয়ে অর্থনৈতিক সম্প্রসারণকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন এবং ভোগব্যয় বাড়াতে কল্যাণমূলক কর্মসূচির ওপর নির্ভর করছেন।
গত বছর জাকার্তার বাজেট ঘাটতি দাঁড়ায় জিডিপির ২ দশমিক ৯ শতাংশ, যা সরকারের নির্ধারিত ৩ শতাংশ সীমার কাছাকাছি। বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও যদি বর্তমান হারে ভর্তুকি বজায় রাখা হয়, তাহলে এই সীমা অতিক্রম করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর আগেই প্রাবোও সরকারের বাজেটে ধরা হয়েছিল, চলতি বছর জ্বালানি তেলের গড় দাম হবে প্রতি ব্যারেল ৭০ ডলার। সেই হিসেবে জ্বালানি ভর্তুকি হিসেবে বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ২১০ ট্রিলিয়ন রুপিয়াহ বা প্রায় ১২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার।
ওসিবিসি ব্যাংকের আসিয়ান অঞ্চলের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ লাভানিয়া ভেঙ্কটেশ্বরন বলেন, ‘তাদের কোথাও না কোথাও সমন্বয় করতেই হবে। হয় ব্যয় আরো কমাতে হবে, না হয় জ্বালানি তেলের খুচরা দাম বাড়াতে হবে।’
পড়শি মালয়েশিয়াও জ্বালানি তেলের ভর্তুকি দেয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেও যদি তা ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে না দেয়া হয়, তাহলে দেশটির আর্থিক ভারসাম্যে ধাক্কা লাগতে পারে। তবে কুয়ালালামপুর আপাতত ভর্তুকি বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
তবে অঞ্চলের অধিকাংশ দেশের জন্য তাৎক্ষণিক উদ্বেগ হলো জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করা। বেশিরভাগ দেশই পেট্রলিয়াম পণ্যের আমদানির জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল। শুধু মালয়েশিয়া ও ব্রুনাই নিট জ্বালানি তেল ও গ্যাস রফতানিকারক।
ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডের মতো বড় অর্থনীতিগুলো নিজস্ব জ্বালানি তেল ও গ্যাস উত্তোলন করলেও তা তাদের চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়। ইন্দোনেশিয়া জানিয়েছে, তাদের অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির এক-চতুর্থাংশ আসে হরমুজ প্রণালী হয়ে, যেখানে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর জাহাজ চলাচল প্রায় থেমে গেছে। থাইল্যান্ড জ্বালানি তেল ও এলএনজি আমদানির অর্ধেকই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আনে।
ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের কিছু এলাকায় এরই মধ্যে আতঙ্কে অতিরিক্ত জ্বালানি কেনা শুরু হয়েছে। অঞ্চলজুড়ে জ্বালানি মজুদের পরিমাণও ভিন্ন ভিন্ন: থাইল্যান্ডের কাছে প্রায় ৯৫ দিনের মজুদ আছে, আর সবচেয়ে জনবহুল দেশ ইন্দোনেশিয়ার কাছে আছে মাত্র ২৫ দিনের মজুদ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং জ্বালানি ব্যবহার কমানোর পদক্ষেপ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ধীর করতে পারে। তবে মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদহার কমাতে দ্বিধায় পড়তে পারে।
ভেঙ্কটেশ্বরন বলেন, ‘কিছু কেন্দ্রীয় ব্যাংককে হয়তো বছরের শেষ নাগাদ সুদহার বাড়াতেও বাধ্য হতে পারে।’ তবে তিনি যোগ করেন, ১৯৯৭ সালের এশীয় আর্থিক সংকটের সময়ের তুলনায় এ অঞ্চলের অর্থনীতিগুলো এখন অনেক বেশি স্থিতিশীল।