আজ থেকে ফ্লোর প্রাইসমুক্ত হচ্ছে পুঁজিবাজার

তিন বছরেরও বেশি সময় পর আজ থেকে বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ইমপোর্ট কোম্পানি লিমিটেড (বেক্সিমকো) ও ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির শেয়ারদরের ওপর আরোপিত ফ্লোর প্রাইস (শেয়ারদর কমার সর্বনিম্ন সীমা) প্রত্যাহার করা হচ্ছে।

এর মাধ্যমে ফ্লোর প্রাইস থেকে পুরোপুরি মুক্ত হচ্ছে পুঁজিবাজার। গতকাল নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান স্বাক্ষরিত এক আদেশে এ দুই কোম্পানির ওপর থেকে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে।

বিএসইসির আদেশ অনুসারে, বেক্সিমকো লিমিটেড ও ইসলামী ব্যাংকের ওপর ফ্লোর প্রাইস আরোপ-সংক্রান্ত ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট জারি করা কমিশনের আদেশটি প্রত্যাহার করা হয়েছে। ফ্লোর প্রাইস উঠিয়ে নেয়ার পর এক্ষেত্রে ২০২১ সালের ১৭ জুন কমিশনের জারি করা আদেশ অনুসারে সার্কিট ব্রেকার প্রযোজ্য হবে বলে জানিয়েছে বিএসইসি।

২০২১ সালের ১৭ জুন বিএসইসির জারি করা সার্কিট ব্রেকার-সংক্রান্ত আদেশ অনুসারে, শেয়ারদরের ঊর্ধ্বসীমা সর্বোচ্চ ১০ থেকে সর্বনিম্ন ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত ওঠানামা করতে পারবে। এর মধ্যে শেয়ারদর ২০০ টাকা পর্যন্ত ১০ শতাংশ হারে সার্কিট ব্রেকার প্রযোজ্য হবে। শেয়ারদর ২০০ টাকার ওপর হলে এবং ৫০০ টাকা পর্যন্ত ৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ সার্কিট ব্রেকার থাকবে। ৫০০ টাকার বেশি এবং ১ হাজার টাকা পর্যন্ত শেয়ারদর থাকলে সেক্ষেত্রে সার্কিট ব্রেকার হবে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। শেয়ারদর ১ হাজার টাকার বেশি এবং ২ হাজার টাকা পর্যন্ত ৬ দশমিক ২৫ শতাংশ হারে সার্কিট ব্রেকার আরোপ করা হবে। শেয়ারদর ২ হাজার টাকার ওপর থাকলে এবং ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত সার্কিট ব্রেকার হবে ৫ শতাংশ। আর শেয়ারদর ৫ হাজার টাকার বেশি হলে ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ হারে সার্কিট ব্রেকার আরোপ করা হবে। পাশাপাশি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত নতুন সিকিউরিটিজের ক্ষেত্রেও স্ল্যাবভিত্তিক এ সার্কিট ব্রেকার প্রযোজ্য হবে।

পুঁজিবাজারে স্বাভাবিক লেনদেনের গতি ফিরিয়ে আনতে সম্প্রতি বিএসইসির কাছে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছিল ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ)। কমিশনের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে সংগঠনটি জানায়, ফ্লোর প্রাইস আরোপের ফলে তালিকাভুক্ত কোম্পানি বেক্সিমকো লিমিটেড দীর্ঘ সময় ধরে কার্যত লেনদেনবিহীন অবস্থায় রয়েছে। একইভাবে গত ৩ মে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিসহ ফ্লোর প্রাইস বলবৎ থাকা শেয়ারগুলোতে বিক্রেতাদের জন্য স্বাভাবিক লেনদেন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ফ্লোর প্রাইসজনিত দীর্ঘমেয়াদি লেনদেন সীমাবদ্ধতা মার্জিন ঋণ গ্রহণকারী বিনিয়োগকারীদের জন্য নেতিবাচক ইকুইটির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে, যা বাজারের সামগ্রিক স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগজনক। বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে মাসুদ খান দায়িত্ব গ্রহণের পর সংবাদ সম্মেলনে জানান, দেশের পুঁজিবাজারে কখনো ফ্লোর প্রাইস আরোপ করা হবে না। এর কয়েকদিন পর কমিশন গতকাল ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারে আদেশ জারি করেছে।

প্রসঙ্গত, দেশের পুঁজিবাজারে ফ্লোর প্রাইস যুগের শুরু হয় ২০২০ সালের মার্চে। কভিড সংক্রমণের প্রভাবে পুঁজিবাজারে দরপতন তীব্র হয়ে উঠলে তা ঠেকাতে সে বছরের ১৯ মার্চ ফ্লোর প্রাইস আরোপ করে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এক বছরেরও বেশি সময় পর ২০২১ সালের ১৭ জুন ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার করা হয়। তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে দেশের অর্থনীতিতে অস্থিরতা শুরু হলে ২০২২ সালের ২৮ জুলাই দ্বিতীয় দফায় ফ্লোর প্রাইস আরোপ করে বিএসইসি। এর পাঁচ মাসের মাথায় ২০২২ সালের ডিসেম্বরে ১৬৯টি কোম্পানির ক্ষেত্রে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার করা হয়। যদিও এ কোম্পানিগুলোর শেয়ারদর কমতে শুরু করলে দুই মাস পরই ২০২৩ সালের ১ মার্চ আবারো ফ্লোর প্রাইস আরোপ করা হয়, যা ২০২৪ সালের ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত বহাল ছিল। সেদিন ৩৫টি কোম্পানির ওপর বহাল রেখে বাকি সব কোম্পানির ওপর থেকে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছিল। পরে ২০২৪ সালের ২২ জানুয়ারি ২৩টির ওপর থেকে প্রত্যাহার করে ১২টি কোম্পানির ওপর ফ্লোর প্রাইস বহাল রাখা হয়। একই বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি আরো ছয় কোম্পানির ওপর থেকে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সর্বশেষ অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৪ সালের আগস্টে বিএসইসির ৯১৬তম কমিশন সভায় চার কোম্পানির ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তখন থেকে শুধু ইসলামী ব্যাংক ও বেক্সিমকো লিমিটেডের ওপর ফ্লোর প্রাইস বহাল ছিল।

আরও