ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে অনুমোদন

স্পট মার্কেট থেকে রেকর্ড দামে এলএনজি কিনছে সরকার

দেশে জরুরি গ্যাসের চাহিদা পূরণে উচ্চ মূল্যে এলএনজি কিনতে হচ্ছে সরকারকে।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরুর আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম ছিল ১১-১২ ডলার। যুদ্ধের প্রভাবে তা বেড়ে বর্তমানে ২৫-২৭ ডলার দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থায় দেশে জরুরি গ্যাসের চাহিদা পূরণে উচ্চ মূল্যে এলএনজি কিনতে হচ্ছে সরকারকে। সর্বশেষ গতকাল অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে দরপত্র ও সরাসরি ক্রয় প্রক্রিয়ায় আরো ছয় কার্গো এলএনজি কেনার অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে সিঙ্গাপুরের ভিটাল এশিয়ার কাছ থেকে প্রতি এমএমবিটিইউ ২৯ দশমিক ৭৯৫ ডলার দরে এক কার্গো কেনা হবে, এটি এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ দর।

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ থেকে অক্টোবরে সরবরাহের জন্য আন্তর্জাতিক কোটেশন প্রক্রিয়ায় পাঁচ কার্গো এলএনজি কেনার প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়। এর মধ্যে দুই কার্গো আমদানির অনুমোদন দেয়া হয়েছে। যুক্তরাজ্যের টোটালএনার্জিস গ্যাস অ্যান্ড পাওয়ার লিমিটেডের কাছ থেকে প্রতি এমএমবিটিইউ ২৮ দশমিক ৯৫ ডলার দরে এক কার্গো এবং ভিটাল এশিয়া পিটিই লিমিটেডের কাছ থেকে ২৯ দশমিক ৭৯৫ ডলার দরে এক কার্গো কেনা হবে।

বাংলাদেশে আমদানি করা একেকটি এলএনজি কার্গোতে সাধারণত ৩৩ লাখ ৬০ হাজার এমএমবিটিইউ গ্যাস থাকে। সে হিসাবে ভিটাল এশিয়ার কাছ থেকে কেনা কার্গোটির দাম পড়ছে ১ হাজার ২৩৩ কোটি টাকা। প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ২০ পয়সা হিসাবে এ ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ডারাব ইনকরপোরেশনের কাছ থেকে সরাসরি ক্রয় প্রক্রিয়ায় দুই কার্গো এলএনজি কেনার অনুমোদন দিয়েছে কমিটি। প্রতি এমএমবিটিইউর দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১৭ ডলার। একই প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের মাইন্ড মিঙ্গল এলএলসির কাছ থেকে আরো দুই কার্গো কেনার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। এক্ষেত্রে দর ধরা হয়েছে ১৯ ডলার।

পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানান, টোটালএনার্জিস ও ভিটাল এশিয়ার কাছ থেকে স্পট মার্কেটের মাধ্যমে এলএনজি কেনায় দাম বেশি পড়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান দুটির কাছ থেকে সরাসরি ক্রয় প্রক্রিয়ায় জ্বালানি কেনা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠান দুটি বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহের ক্ষেত্রে নতুন এবং যথাসম্ভব কম দামে জ্বালানি সরবরাহ করতে চায়।

এর আগে ৯ সেপ্টেম্বর ক্রয় কমিটির বৈঠকে সরাসরি ক্রয় প্রক্রিয়ায় টোটালএনার্জিসের কাছ থেকে ১৮ কার্গো এলএনজি কেনার সিদ্ধান্ত হয়। চলতি বছরের অক্টোবর থেকে আগামী বছরের জুন পর্যন্ত প্রতি মাসে দুটি করে এসব কার্গো কেনা হবে। জেকেএম (জাপান-কোরিয়া মার্কেট) দরের সঙ্গে ৬ সেন্ট যোগ করে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে।

পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশে ১১৫টি এলএনজি কার্গো আমদানির কথা রয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে প্রতিবন্ধকতার কারণে কাতার থেকে আমদানি কমে যাওয়ায় স্পট মার্কেট থেকে কার্গো এনে চাহিদা পূরণ করা হচ্ছে। বিদ্যমান বাজারদর অব্যাহত থাকলে শুধু এলএনজি আমদানিতেই ব্যয় হতে পারে ৯০ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে এলএনজি খাতে ভর্তুকি রাখা হয়েছে সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা। অথচ অর্থবছরের প্রথম দেড় মাসেই পেট্রোবাংলা ভর্তুকি নিয়েছে সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা। এর আগে ২০২৫-২৬ অর্থবছর ১১৩টি এলএনজি কার্গো আমদানিতে ব্যয় হয় ৫৯ হাজার ৭১৩ কোটি টাকা। এর সঙ্গে ভর্তুকি লেগেছে আরো ১২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।

উল্লেখ্য, দেশে প্রতিদিন গড়ে গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। দুটি এলএনজি টার্মিনাল ও স্থানীয় উৎপাদন দিয়ে গড়ে ২৬০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ দেয়া যায়। গতকাল স্থানীয় গ্যাস ও এলএনজি মিলিয়ে সরবরাহ করা হয়েছে প্রায় ২৩৩ কোটি ঘনফুট। গ্যাস সংকটে বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। শিল্প-কারখানায় কম চাপের কারণে উৎপাদন সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদনেও সংকট তৈরি হয়েছে। আবাসিক পর্যায়েও গ্যাসের সংকট চরম আকার ধারণ করেছে।

আরও