উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে ঋণের বোঝা ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ করে সুদ ও আসল পরিশোধে সরকারের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য বিনিয়োগের সুযোগ কমে আসছে। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও উৎপাদনশীল খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অর্থ ব্যয় করতে পারছে না অনেক দেশ। এ পরিস্থিতিতে নতুন করে ঋণ বা আন্তর্জাতিক সহায়তা পেলেও তার বড় অংশ চলে যাচ্ছে পুরনো ঋণ পরিশোধে। এতে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির পথ কঠিন হয়ে উঠছে। খবর নিক্কেই এশিয়া।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক দাতব্য সংস্থা রকফেলার ফাউন্ডেশনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ক্রিস্টিনা সিগাল-নোলস এ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঋণদাতা ও আন্তর্জাতিক অর্থ সহায়তা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো জরুরি। তা না হলে নতুন অর্থায়ন অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজে লাগার পরিবর্তে ঋণ পরিশোধেই ব্যয় হয়ে যাবে।
রকফেলার ফাউন্ডেশনের আন্তর্জাতিক নীতিবিষয়ক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টিনা নিক্কেইকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে সম্প্রতি এসব কথা বলেন।
রকফেলার ফাউন্ডেশন গত অক্টোবরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানায়, বিশ্বের প্রায় ৪০টি নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ ঋণ পরিশোধের চাপে রয়েছে। এর মধ্যে আছে এশিয়ার কয়েকটি দেশও। ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধে বিপুল অর্থ ব্যয় করায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক বিনিয়োগের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ থাকছে না বেশির ভাগ দেশের কাছে।
ক্রিস্টিনা সেগাল-নোলস বলেন, ‘এসব দেশকে ঋণের বিপরীতে অনেক বেশি সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে। আবার সময়ের সঙ্গে সুদের হারও বাড়ছে। এতে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে। ফলে অর্থনীতিকে প্রবৃদ্ধিতে ফেরানোর জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ হয়ে পড়ছে।’
উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঋণ পরিস্থিতি আরো অবনতি হওয়ার আশঙ্কা করছে রকফেলার ফাউন্ডেশন। সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়, কভিড-১৯ মহামারীর সময় অনেক দেশ কম সুদে বিদেশী ঋণ নিয়েছিল। এখন সেসব দেনা পরিশোধের সময় ঘনিয়ে আসছে। কিন্তু এরই মধ্যে বিশ্ববাজারে ঋণের সুদহারও অনেক বেড়েছে। ফলে আগের তুলনায় ঋণ পরিশোধ বাবদ খরচও এখন অনেক বেশি।
রকফেলার ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অনেক দেশের সামনে কঠিন দুটি পথ খোলা রয়েছে। প্রথমত, সরকারি ব্যয় আরো কমিয়ে আনা। কিন্তু এতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি মানুষের জীবনযাত্রার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
দ্বিতীয়ত, বাজেট ঘাটতি ও পুরনো ঋণের কিস্তি পরিশোধে বেসরকারি উৎস থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নেয়া। তবে এ ধরনের ঋণ দীর্ঘমেয়াদে দেশগুলোকে ঋণখেলাপির ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
ক্রিস্টিনা সেগাল-নোলসের মতে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে পারলে অনেক দেশই ঋণের পরিমাণ একটি টেকসই পর্যায়ে ফিরিয়ে আনতে পারবে। তবে সেজন্য কম সুদের ঋণসহ সাশ্রয়ী অর্থায়ন ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো উন্নয়নশীল দেশগুলোকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে পারছে না। শুধু চলমান সংকট সামাল দেয়ার মতো অর্থায়ন নয়, দেশগুলোর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও ভবিষ্যতের সংকট মোকাবেলার সক্ষমতা তৈরির জন্যও সহায়তা প্রয়োজন।’
উন্নয়নশীল দেশগুলোকে নতুন ঋণ ও আর্থিক সহায়তা দেয়ার ক্ষেত্রে ঋণদাতাদের সঙ্গে সমন্বয় করা জরুরি। এতে প্রাপ্ত নতুন অর্থ দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও নতুন বিনিয়োগে কাজে লাগানো যাবে। এছাড়া আন্তর্জাতিক সহায়তার অর্থ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর বিনিয়োগ ও অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা অনুযায়ী ব্যবহার করা প্রয়োজন।