‘ট্রেড উইথ টিসিবি’ শীর্ষক আয়োজন

রমজানে দেশজুড়ে দৈনিক ৫২০ ট্রাকে ভর্তুকিমূল্যে পণ্য বিক্রির ঘোষণা টিসিবির

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, আগামী রমজানে দেশজুড়ে দৈনিক ৫২০টি ট্রাকের মাধ্যমে ভর্তুকিমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি করা হবে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন রাষ্ট্রায়ত্ত বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সমন্বয়ে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য হ্রাস, সরাসরি ব্যাংক এপিআই লেনদেন এবং স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়নের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনায় শৃঙ্খলা ও বিপুল ব্যয় সাশ্রয় নিশ্চিত করেছে। গতকাল ঢাকার আর্মি গলফ ক্লাবের গলফ গার্ডেনে আয়োজিত ‘ট্রেড উইথ টিসিবি’ শীর্ষক এক বিশেষ অনুষ্ঠানে এসব তথ্য জানানো হয়। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) জ্যেষ্ঠ গবেষক ড. বদরুন নেসা আহমেদ। অনুষ্ঠানটির মিডিয়া পার্টনার ছিল বণিক বার্তা।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, আগামী রমজানে দেশজুড়ে দৈনিক ৫২০টি ট্রাকের মাধ্যমে ভর্তুকিমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি করা হবে। এর মাধ্যমে দেশের প্রায় ৪০ লাখ সুবিধাবঞ্চিত পরিবার উপকৃত হবে। এ কর্মসূচির আওতায় দেশের ৫৫টি জেলায় প্রতিদিন পাঁচটি করে ট্রাক (মোট ২৭৫টি), ১০ সিটি করপোরেশনে ১৫টি করে ট্রাক (মোট ১৫০টি), ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ৬৫টি এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে ৩০টি ট্রাক পণ্য বিক্রিতে নিয়োজিত থাকবে। প্রতিটি ট্রাক প্রতিদিন ৪০০ জন ক্রেতার কাছে পণ্য বিক্রি করবে। ২০ দিনের এ বিশেষ কার্যক্রমে প্রতিটি পরিবার এক কেজি চিনি, দুই কেজি মসুর ডাল, এক কেজি ছোলা, দুই লিটার সয়াবিন তেল এবং আধা কেজি খেজুর সাশ্রয়ী মূল্যে কিনতে পারবে। এতে পাঁচটি পণ্য মিলিয়ে মোট ২৬ হাজার টন খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হবে।

টিসিবির সেবায় স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ বিষয়ে প্রবন্ধে জানানো হয়, দেশব্যাপী স্বল্প আয়ের এক কোটি পরিবারের কাছে প্রতি মাসে ভর্তুকিমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে টিসিবি। এ লক্ষ্যে দেশজুড়ে ৭৯ লাখ ৯০ হাজার প্রকৃত সুবিধাভোগীকে ডিজিটাল ডেটাবেজে যাচাই করে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং প্রায় ৭৩ লাখ ৭ হাজার স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড সক্রিয় করা হয়েছে। ডিজিটাল যাচাইকরণ (ই-কেওয়াইসি ও জাতীয় পরিচয়পত্র মেলানো) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রায় ৫৯ লাখ ভুয়া ও অযোগ্য আবেদন বাতিল করা হয়েছে। এর ফলে সরকারি পণ্যের অপচয় ও কালোবাজারি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়েছে।

সংস্থাটির ডিজিটাল সেবা আরো উন্নত হয়েছে জানিয়ে অনুষ্ঠানে আরো বলা হয়, ই-জিপি ও ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া সহজীকরণের আওতায় দরপত্র ও সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় শতভাগ ই-জিপি নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রকাশ্যে দরপত্র উন্মুক্তকরণ এবং ডিজিটাল পদ্ধতিতে জামানত ও বিল দ্রুত পরিশোধের মাধ্যমে সরবরাহকারীদের জন্য ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া অত্যন্ত স্বচ্ছ ও সহজ করা হয়েছে।

টিসিবির চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ ফয়সল আজাদ বলেন, খাদ্যনিরাপত্তা, দারিদ্র্য বিমোচন এবং মূল্যের ভারসাম্য রক্ষায় টিসিবি পদ্ধতিগতভাবে সারা দেশে তার পরিধি বিস্তার করেছে। আমরা লজিস্টিকস নেটওয়ার্ক আধুনিকায়ন করেছি। গুদামজাত অবকাঠামো বৃদ্ধি এবং সরবরাহশৃঙ্খলকে আরো গতিশীল করতে উন্নত ডিজিটাল ব্যবস্থা সমন্বয় করছি। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় অংশীদারের সঙ্গে সুদৃঢ় সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে বাজারের ধারাবাহিকতা নিশ্চিতে কাজ করছি আমরা, যা সমৃদ্ধ ও ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

তিনি বলেন, ‘প্রতি মাসে কোটি কোটি আর্থসামাজিকভাবে অসচ্ছল পরিবার সরকারি সুবিধায় ভর্তুকিমূল্যে এসব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পাওয়ার জন্য টিসিবির ওপর নির্ভর করে। রংপুরের রিকশাচালক, গাজীপুরের পোশাক শ্রমিক কিংবা বরিশালের কোনো সংগ্রামশীল বিধবা নারীর জন্য এ সহায়তাই একটি পুষ্টিকর খাবার এবং চরম অভাবের মধ্যকার মূল পার্থক্য গড়ে দেয়। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি টিসিবি একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে, যা দেশজুড়ে মানুষের জীবিকা নির্বাহেও ভূমিকা রাখে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে টিসিবি থেকে মানুষ যে খাদ্যপণ্য সংগ্রহ করেছে, তার মূল্য ছিল প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে আনুমানিক আড়াই হাজার কোটি টাকা প্রাতিষ্ঠানিক ভর্তুকি দেয়া হয়েছে। দেশের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে চলতি অর্থবছরে পণ্য ক্রয়ের বাজেট বাড়িয়ে প্রায় সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। আমূল কাঠামোগত সংস্কার এবং পরিচালনগত দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এমন একটি উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যার লক্ষ্য আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে সরকারি ভর্তুকির ওপর টিসিবির নির্ভরতা পুরোপুরি দূর করা। একই সঙ্গে পরিবর্তনশীল পারিবারিক চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পণ্যের তালিকাও সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। তেল, মসুর ডাল, চিনি, চা ও খেজুরের পাশাপাশি টিসিবি খোলাবাজারে বিক্রির (ওএমএস) মাধ্যমে সাবান, ডিটারজেন্ট, চা, আটা, মসলা ও লবণসহ প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী যুক্ত করছে।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. খালেদ হোসেন মাহবুব এমপি ও বাণিজ্য সচিব মো. আতাউর রহমান খান। অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য দেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ, চীন-বাংলা ফ্রেন্ডশিপ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ড. ভুঁইয়া মুহাম্মদ হোসেন, অস্ট্রেলিয়ার এমসিজি ইন্টারন্যাশনাল (প্রা.) লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক মার্ক শেন ম্যাকগোল্ড্রিক, স্কয়ার টয়লেট্রিজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মালিক মোহাম্মদ সাঈদ এবং টিকে গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের গ্রুপ ডিরেক্টর মোহাম্মদ মোস্তফা হায়দার।

আরও