তবে বৈশ্বিক ফ্যাশনপ্রবণতার তুলনায় বাংলাদেশে ফ্যাশন হাউজের শুরুটা অনেক পরে। নব্বইয়ের দশকে ‘মেনস ওয়্যার’ নিয়ে ব্র্যান্ড আকারে বাজারে আত্মপ্রকাশ করে ‘ক্যাটস আই’। এর বাইরে তখন তেমন কোনো ব্র্যান্ড না থাকলেও ধীরে ধীরে বাংলাদেশে ফ্যাশন ব্র্যান্ডের উত্থান ঘটে; যা বর্তমানে অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছে। দেশে এ খাতের উত্থান, বর্তমান অবস্থা এবং সম্ভাবনা নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন ইনফিনিটি, লুবনান ও রিচম্যানের ভাইস চেয়ারম্যান নাইমুল হক খান
বাংলাদেশে ফ্যাশন ব্র্যান্ডের উত্থান কীভাবে হলো?
২০০২ সালে আমি ও আমার সঙ্গে আরো দুজন; একজন ইনফিনিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং আরেকজন চেয়ারম্যান—আমরা তিনজন ইমপোর্ট ব্যবসা শুরু করেছিলাম। তবে সেটা মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক হওয়ায় খুব একটা আগ্রহ পাচ্ছিলাম না, তাই বন্ধ করে দেই। এরপর ২০০৩ সালে একরকম ঝুঁকি নিয়েই নিজস্ব একটা ব্র্যান্ড তৈরি করলাম; নাম দিলাম ‘লুবনান’। ধানমন্ডি ৩২-এ মেট্রো শপিং মলে একটা শোরুম নিয়েছিলাম। ‘লুবনান’ আসলে একটা আরবি নাম। মধ্যপ্রাচ্যে এ নামে আরো অনেক ব্র্যান্ড আছে। আমরা যেহেতু ব্র্যান্ডের মূল প্রডাক্ট রেখেছিলাম ভালো মানের পাঞ্জাবি, তাই ‘লুবনান’ নামটাই সে সময় ভালো লেগেছিল। তখন দেশে ভারতীয় পাঞ্জাবির ব্যাপক চাহিদা ছিল। আমরা চিন্তা করলাম, এ ধরনের পাঞ্জাবি কেন দেশেই তৈরি করি না। শুরুতেই উৎপাদনের দিকে মনোযোগ দেই। পাঞ্জাবির পাশাপাশি মেয়েদের পোশাকও ছিল। ধীরে ধীরে রাইফেলস স্কয়ারে দ্বিতীয় আর তৃতীয়টা নিলাম ধানমন্ডির রাপা প্লাজায়। এরকম পাঁচটা শোরুমের অভিজ্ঞতা থেকে দেখলাম, শুধু পাঞ্জাবি ও মেয়েদের পোশাক যথেষ্ট নয়। যেহেতু আমাদের তিনজনেরই পরিকল্পনাটা বিশাল ছিল, তাই ব্র্যান্ডকে আরো বৃহৎ পরিসরে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে কাজ শুরু করি। তখন চিন্তা করলাম ‘আড়ং’-এর মতো কিছু করা যায় কিনা। তারা যেহেতু শুধু ট্র্যাডিশনাল ওয়্যার নিয়ে কাজ করছিল; আমরা ভাবলাম ওয়েস্টার্ন ফিউশনের একটা চাহিদা আছে, সেটা নিয়েই কাজ করা যায়। পৃথিবীর বড় বড় ব্র্যান্ড যেমন ‘জারা’ বা ‘এইচঅ্যান্ডএম’—এগুলোকে আমরা নজরে রেখেছিলাম। সেখান থেকেই চিন্তা করলাম শুধু পুরুষদের জন্য ম্যান’স ওয়্যারের একটা ব্র্যান্ড করি। তখন বাজারে ‘ক্যাটস আই’ ছাড়া তেমন কোনো ব্র্যান্ড ছিল না। এর আগে কিন্তু মানুষ দর্জির কাছেই কাপড় বানাত। এলিফ্যান্ট রোডে তখন অনেক টেইলার্স ছিল। সে সময় রেডিমেড ওয়্যারের জায়গাটা খালি থাকায় আমরা ‘রিচম্যান’ নামে পুরুষদের পোশাকের ব্র্যান্ড তৈরি করলাম। তখন বসুন্ধরা শপিং মল মাত্র চালু হয়েছে, সেখানে আমাদের প্রথম ব্র্যান্ড ‘লুবনানের’ শোরুম নেয়াই ছিল। তাই এখানেই ‘রিচম্যান’ শুরু করলাম। ধীরে ধীরে আউটলেট বাড়তে থাকল। ‘রিচম্যানের’ শোরুম পাঁচটি পাশাপাশি লুবনানের শোরুম ১০-১২টি হওয়ার পর দেখলাম বসুন্ধরা শপিং মলের বিশাল বিশাল ফ্লোর ফাঁকা পড়ে আছে। তাই ঝুঁকি নিয়ে সাততলায় একটা বড় আউটলেট করার প্রস্তাব দিলাম বসুন্ধরা গ্রুপকে, এতে তারা বেশ খুশিই হলো। গ্রুপটি বলল, জায়গা তো অনেকটা খালি আছে, আপনারা একা না করে আমরা আরো কয়েকজনকে প্রস্তাব করতে পারি। তারপর সেখানে বাটা, এসটিসি, এপেক্স, দেশী দশের মতো ব্র্যান্ডগুলো কমবেশি সাড়া দিল। এক্ষেত্রে বসুন্ধরা গ্রুপের কথা বলতেই হয়, তারা অনেক বড় একটা অবদান রেখেছে ব্র্যান্ডগুলোকে স্ট্যাবলিশ হতে। তারা আমাদের প্রস্তাব দিল ছয় মাস কোনো ভাড়া দিতে হবে না, শুধু সার্ভিস চার্জটা লাগবে। এটা আমাদের খুবই সহযোগিতা করেছে। আমরা সেখানে ১৩ হাজার স্কয়ারফিট নিয়ে নিলাম এবং প্রতিষ্ঠা করলাম ‘ইনফিনিটি’। প্রচার-প্রচারণার শুরুতেই ব্যাপক সাড়া মিলল। এভাবেই আসলে ধীরে ধীরে পরবর্তী সময়ে অনেক ব্র্যান্ড এল। এখন তো দেশীয় ব্র্যান্ডের আলাদা একটা অর্থনৈতিক বাজারই তৈরি হয়েছে।
একসময় মানুষ যেকোনো পণ্যের মতো পোশাকও বিদেশী খুঁজত। তারপর একসময় তরুণ থেকে প্রবীণ—সবাই দেশীয় ব্র্যান্ডগুলোর দিকে ঝুঁকে পড়ল—এটা কীভাবে সম্ভব হলো?
দেশের পোশাক খাত ও রিটেইল মার্কেটটা একটা সময় সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর ছিল। বাচ্চাদের পোশাক বলতেই থাইল্যান্ডের পণ্য বুঝতাম। ভালো মানের পলো শার্ট, টি-শার্ট, প্যান্টের জন্য পলওয়েল মার্কেটকেন্দ্রিক কেনাকাটা করতাম। একটা পর্যায়ে আমরা যখন দেশীয় ব্র্যান্ড শুরু করলাম; পরবর্তী সময়ে আরো কিছু ব্র্যান্ড এল। তখন ভোক্তারা দেখল মানের দিক থেকে দেশেরটা অনেক বিদেশী পণ্যের চেয়ে ভালো। বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলো বর্তমানে হুগো, বস বা আরমানির মতো বড় বড় ব্র্যান্ডের পোশাক তৈরি করে। পাশাপাশি বিশ্বে তৈরি পোশাক উৎপাদনে চীনের পরপরই আমাদের অবস্থান। এসব অভিজ্ঞতাকেই আমরা কাজে লাগিয়েছি। কাঁচামাল থেকে উৎপাদন—সবই আমাদের জানা। ফলে ভোক্তারা পণ্যের মান যেমন ভালো পেয়েছে, তার সঙ্গে মূল্যটাও কম পেয়েছে। একসময় যেমন ভারতীয় শাড়ি ছাড়া মানুষ কিছু চিন্তাই করত না, কিন্তু এখন দেশী শাড়ির চাহিদা অনেক বেশি। ইনফিনিটিতেও আমরা শুরুতে ভারতীয় শাড়ি রাখতাম, এখন দেশীটাই রাখি। ডিজাইনের দিক থেকেও আমরা আন্তর্জাতিক মানটাকে ধরে রাখার চেষ্টা করেছি। সব মিলিয়ে ধীরে ধীরে ভোক্তারা দেশী পণ্যের দিকে ঝুঁকে পড়েছে।
বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এক ধরনের সংকট চলছে, এর মধ্যে দেশের ফ্যাশন শিল্পের অবস্থান কেমন?
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে যে অস্থিরতা চলছে, তা এখন পর্যন্ত ফ্যাশন শিল্পে খুব একটা প্রভাব ফেলেনি। কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে শিগগিরই বড় সংকট তৈরি হবে। এরই মধ্যে জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়েছে। অনেক কারখানাই প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ পাচ্ছে না। গত এক মাস ধরে আমাদের কারখানাগুলো, বিশেষ করে গাজীপুরের দিকে যেগুলো, সেখানে বিদ্যুতের ব্যাপক সমস্যা দেখা দিয়েছে। তবে ভবিষ্যতে সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে পোশাক খাতে। বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে অনেক দেশেই ফ্লাইট বন্ধ হয়ে আছে। ফলে বায়ারদের আসা-যাওয়া কমে যাচ্ছে, বিক্রিও কমে যাবে। আমাদের সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র, সেখানেও চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে ও অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। একই কারণে ইউরোপের বাজারেও দ্রব্যমূল্য বেড়ে গেছে। এ অস্থিরতা আরো দীর্ঘায়িত হলে নিশ্চিত আমাদের এখানেও তার প্রভাব পড়বে।
২০০৩ সাল থেকে এখন পর্যন্ত মার্কেটিং ও ব্র্যান্ডিংয়ের ক্ষেত্রে অনেক বড় পরিবর্তনের সাক্ষী হয়েছেন। অ্যানালগ থেকে ডিজিটাল যুগের এ পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের কীভাবে মানিয়ে নিয়েছেন?
ব্র্যান্ডিংয়ের কথা বলতে গেলে তখনকার সময় আমরা যেভাবে প্রচারণা চালাতাম, এখনকার জেনারেশন শুনলে হাসবে। লুবনানের বিশাল পোস্টার করেছিলাম, যেখানে লিখেছিলাম—‘ঈদের সেরা পাঞ্জাবি লুবনান’। মডেল হিসেবে ছিলেন চিত্রনায়ক বুলবুল আহমেদ। পরের বছর জিসান কিংশুক মডেল হয়েছিল। এরপর ট্রাকে কিংবা ঘোড়ার গাড়িতে করে ব্র্যান্ডিং করতাম। আর তখন সবচেয়ে বড় মিডিয়া ছিল পত্রিকা ও টেলিভিশন। তবে টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন খুব ব্যয়বহুল ছিল। এখন তো প্রচুর প্লাটফর্ম তৈরি হয়েছে, ব্র্যান্ডিংয়ের জায়গাটাও অনেক বড় হয়েছে। ফলে এখন আরো সহজেই নিজের ব্র্যান্ডকে সবার কাছে পরিচিত করে তোলা যায়। স্মার্টফোনের বদৌলতে আমি আমার ব্র্যান্ডকে দিনে ১০ বার আপনার সামনে নিয়ে আসতে পারব। কিন্তু তখন সেই সুযোগ ছিল না। বর্তমানে অনলাইন শপিংয়ের বিশাল একটা জগৎ তৈরি হয়েছে। মানুষ এত যানজট ঠেলে আর শপিং মলে যেতে চায় না, ঘরে বসেই পণ্য অর্ডার করে। যদিও আমাদের দেশের অনলাইন মার্কেটিংয়ের জায়গাটা এখনো অনেক সীমিত, তারপরও সব মিলিয়ে ডিজিটালাইজেশনের কারণে নিজের ব্র্যান্ডকে নিয়ে কাজ করার অনেক সুযোগ তৈরি হয়েছে।
যেসব উদ্যোক্তা নিজস্ব ব্র্যান্ড তৈরির চিন্তা করছেন, তাদের উদ্দেশে আপনার পরামর্শ কী?
নতুন উদ্যোক্তাদের বলব, শুধু পোশাকের ব্র্যান্ড নয়, যেকোনো ব্যবসা শুরু করার জন্য আত্মবিশ্বাস থাকতে হবে ভরপুর। অনেক বড় বড় ব্র্যান্ডকেই যদি জিজ্ঞেস করা হয় ব্যবসা কেমন চলছে? প্রায়ই শুনি ভালো চলছে না, আগে ভালো ছিল। এ ধরনের কথা যে ব্র্যান্ড বলেছে, সে সাফল্যের মুখ দেখেনি। সবসময় নিজের ও নিজের ব্র্যান্ডের আত্মবিশ্বাস ধরে রাখতে হবে। নতুনরা যদি মনে করে, ‘ইনফিনিটি’ তো অনেক শোরুম করে ফেলেছে, আমরা এখন প্রতিযোগিতা করে পারব না, তাহলে কখনই সাফল্য আসবে না। ব্র্যান্ড বড় হোক বা ছোট, প্রত্যেকেরই কোনো না কোনো লিকেজ থাকে। সেটাকে খুঁজে বের করে, সেখানটায় কাজ করতে হবে। আরেকটা বিষয় হলো সততা। নিজের ব্যবসায় সব সময় সৎ থাকতে হবে এবং কখনই কোয়ালিটি কম্প্রোমাইজ করা যাবে না।
ভোক্তারা অনেক সময় পোশাক কিনে ঠকে যান, বিশেষ করে অনলাইনে। এক্ষেত্রে আপনার পরামর্শ কী?
এখানেই আসলে ব্র্যান্ডের কথাটা চলে আসে। যেকোনো পরিচিত ব্র্যান্ডই ভোক্তাকে ঠকানোর আগে তার নিজের পরিচিতি নিয়ে চিন্তায় থাকবে। তাই আমি মনে করি, শুধু মূল্যের দিকে লক্ষ্য না করে কোয়ালিটি ও ব্র্যান্ডের দিকেও নজর দেয়া ভোক্তাদের জন্য জরুরি। আরেকটা বিষয় হলো পণ্য কেনার ক্ষেত্রে ‘ফিক্সড প্রাইজ’-এর বিষয়টা কিন্তু ইতিবাচক। মার্কেটে অনেক দোকান আছে একটি পোশাক ৬ থেকে ৭ হাজার বলে, দামাদামি করে ৩-৪ হাজারে দিয়ে দেয়। কিন্তু সবাই তো একরকম দামাদামি করতে পারে না। ফলে ফিক্সড প্রাইজের আউটলেটগুলোতে মূল্যের দিক থেকে প্রতারিত হওয়ার সম্ভাবনা কম। আরেকটা বিষয় হলো কাস্টমার সার্ভিস।
ইনফিনিটির আউটলেট ঢাকার বাইরের শহরগুলোয় কিংবা দেশের বাইরে আন্তর্জাতিকভাবে ছড়িয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে কী কী পরিকল্পনা আছে?
ঢাকার বাইরে প্রায় সব জেলাতেই আমাদের আউটলেট রয়েছে। আগামীতে উপজেলা পর্যায়ে কাজ করার পরিকল্পনা করছি। ঢাকার মতোই জেলা শহরেও ভোক্তাদের ভালো সাড়া পেয়েছি। আর দেশের বাইরে আমাদের এ ব্র্যান্ডকে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা অনেকবার করেছি। সেক্ষেত্রে সরকারের যে নীতি আছে, বিশেষ করে বিদেশে বিনিয়োগের ব্যাপারে অনেক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে যদি এটাকে আরো সহজ করা হয়, তাহলে অবশ্যই দেশীয় ব্র্যান্ডগুলোকে আমরা বিশ্বদরবারে পৌঁছে দিতে পারব। আমাদের যে নতুন সরকার এসেছে, তাদের কাছেও আমরা প্রস্তাব নিয়ে যাব। বিনিয়োগ বোর্ডের সঙ্গে আলাপ করার পরিকল্পনা রয়েছে। দেশের বাইরে থেকে অনেক সাড়া পাই আমরা, অনেকেই সেসব দেশে আউটলেট করার কথা বলেন। আমার মনে হয়, সরকার সহযোগিতা করলে বাংলাদেশের ব্র্যান্ড বিশ্বদরবারে একটি অবস্থান তৈরি করতে পারবে।