পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে শামা ওবায়েদ

সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী

ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিট স্থাপন ও প্রযুক্তি হাব গড়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা

সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগকে বাংলাদেশকে প্রযুক্তি হাবে রূপান্তরের বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ হিসেবে দেখছেন শামা ওবায়েদ।

যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালিতে অবস্থিত অ্যাপল, গুগল, এনভিডিয়া, মেটা, সিসকো ও প্লাগ অ্যান্ড প্লেসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে। বিশেষত সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই), ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিট স্থাপন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সেমিকন্ডাক্টর ও প্রযুক্তি উন্নয়নে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করার সম্ভাবনা নিয়ে এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।

রাজধানীর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গতকাল সিলিকন ভ্যালি সফর নিয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য জানান। দুইদিনের সফরে ১৫টির বেশি বৈঠক হয়েছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আলোচনায় সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগের পাশাপাশি বাংলাদেশে ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিট কীভাবে স্থাপন করা যায়, সেটিও গুরুত্ব পেয়েছে।’

সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগকে বাংলাদেশকে প্রযুক্তি হাবে রূপান্তরের বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ হিসেবে দেখছেন শামা ওবায়েদ। তিনি বলেন, ‘ইন্টেলের সঙ্গে আমাদের আইসিটি মন্ত্রণালয় যোগাযোগ করছে।’ প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণের পাশাপাশি এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ধারাবাহিক যোগাযোগ তৈরিও সফরের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য ছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।

বিনিয়োগের পাশাপাশি বাংলাদেশের তরুণদের দক্ষতা ও মেধাকে কাজে লাগিয়ে দেশে প্রযুক্তি তৈরির সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে। এ প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের তরুণ সমাজের মেধা কাজে লাগিয়ে প্রযুক্তি উন্নয়নে প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারে তা নিয়ে কথা হয়েছে।’

সিলিকন ভ্যালির প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বৈঠককে প্রযুক্তিভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলার উদ্যোগের অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। এ প্রসঙ্গে অ্যাপলের উৎপাদন সক্ষমতার উদাহরণ তুলে ধরে শামা ওবায়েদ বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানটির প্রযুক্তিপণ্যের বড় অংশ চীনে ম্যানুফ্যাকচারিং হয়। বাংলাদেশের জনশক্তি, সক্ষমতা ও জায়গা রয়েছে। ফলে এ ধরনের ম্যানুফ্যাকচারিং হাব বাংলাদেশেও গড়ে উঠতে পারে। এর সঙ্গে দেশে একটি আইটি হাই-টেক পার্ক তৈরির সম্ভাবনাও রয়েছে।’

বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে কাজ করতে গুগল আগ্রহী বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী। এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে এরই মধ্যে একটি সহযোগিতার কাজ চলছে। এনভিডিয়াও বাংলাদেশের সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে কাজ করার কথা জানিয়েছে।

বৈঠকগুলোয় এআই, সেমিকন্ডাক্টর ও অন্যান্য প্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশের সক্ষমতা তৈরির বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। এআইকে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতা ও সংস্কৃতির সঙ্গে কীভাবে যুক্ত করা যায়, সাইবার স্পেসে দক্ষতা কীভাবে বাড়ানো যায় এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে কী ধরনের উদ্যোগ প্রয়োজন—এসব বিষয়ও আলোচনায় উঠে এসেছে।

মেটার সঙ্গে নিউইয়র্ক ও বে এরিয়ায় বাংলাদেশের বৈঠক হয়েছে জানিয়ে শামা ওবায়েদ বলেন, ‘বিভিন্ন খাতে মেটা বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। প্রতিষ্ঠানটিকে এখানে অফিস খোলার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে।’ দেশে বিপুলসংখ্যক ফেসবুক ব্যবহারকারী থাকায় স্থানীয় অফিস থাকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি। প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন সমস্যা মোকাবেলায় মেটার স্থানীয় অফিস থাকলে প্রতিষ্ঠানটিকে আরো জবাবদিহির আওতায় আনা সম্ভব হবে।’

সফরে সিলিকন ভ্যালির বিভিন্ন প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গেও বৈঠক হয়েছে। তারা বাংলাদেশে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন এবং দেশের অর্থনীতি ও সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা করছেন বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।

সফরের একটি অংশে সিলিকন ভ্যালিতে কর্মরত বাংলাদেশীদের সঙ্গেও মতবিনিময় হয়েছে। বড় বড় প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানে উচ্চ পর্যায়ে কর্মরত এসব বাংলাদেশী সরকারের উদ্যোগে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশকে প্রযুক্তিগতভাবে এগিয়ে নিতে তারা বিভিন্নভাবে সহযোগিতা ও বিনিয়োগে আগ্রহী বলেও জানান শামা ওবায়েদ।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘সফরটি মাত্র শেষ হয়েছে। এখন এসব বৈঠকের ফলোআপের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। যোগাযোগ আরো বাড়ানো এবং ধারাবাহিকভাবে কাজ করা গেলে এ থেকে ভালো ফল আসবে বলে আশা করছি।’ আগামী কয়েক মাসের মধ্যে বৈঠকগুলোর ফলাফল দেখা যাবে বলেও জানান তিনি।

শামা ওবায়েদ আরো বলেন, ‘সফরে অংশ নেয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে উচ্চ পর্যায়ে বিস্তারিত যোগাযোগের বিষয়টি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের কোনো সরকার এর আগে এ পর্যায়ে গিয়ে এত বিস্তারিতভাবে প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ ও আলোচনা করেনি বলেও বৈঠকে অংশ নেয়া পক্ষগুলো মন্তব্য করেছে।’

প্রতিমন্ত্রীর মতে, প্রযুক্তি, এআই ও সেমিকন্ডাক্টরভিত্তিক অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এ সফর নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এসব সম্ভাবনাকে বাস্তব বিনিয়োগ, প্রযুক্তি সহযোগিতা ও কার্যকর অংশীদারত্বে রূপ দিতে পরবর্তী সময়ে নিয়মিত যোগাযোগ ও ফলোআপের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

আরও