বোল্টের চেয়েও দ্রুত, তবু মানুষের মতো দৌড়াতে শেখেনি রোবট

শুরুর সংকেত পেয়ে দৌড় শুরু করল মানুষের আদলে তৈরি একটি যন্ত্র। ধাতব পা দুটি ছোট ছোট পদক্ষেপে দ্রুত সামনে এগোতে লাগল। মাত্র ৮ দশমিক ৬৪ সেকেন্ডে পেরিয়ে গেল ১০০ মিটার।

বিশ্বের দ্রুততম মানুষ উসাইন বোল্টের চেয়েও প্রায় ১ সেকেন্ড কম সময়। তবে গন্তব্যে পৌঁছে গতি কমাতে পারল না রোবটটি। সোজা গিয়ে ধাক্কা খেল সামনে রাখা নরম দেয়ালে।

চীনে তৈরি হিউম্যানয়েড রোবট ‘তিয়ানগং আলট্রা’র এ দৌড় প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক মাইলফলক। ২০০৯ সালে বার্লিন বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে ৯ দশমিক ৫৮ সেকেন্ডে ১০০ মিটার দৌড়ে বিশ্ব রেকর্ড গড়েছিলেন জ্যামাইকান কিংবদন্তি বোল্ট। প্রায় ১৭ বছর ধরে কোনো মানুষ সেই রেকর্ডের ধারেকাছেও যেতে পারেননি। অথচ তিয়ানগংয়ের গড় গতি ছিল ঘণ্টায় প্রায় ৪২ কিলোমিটার।

তবে সময়ের হিসাবে বোল্টকে পেছনে ফেললেও রোবটটি মানুষের মতো দৌড়ায়নি। দুই দৌড়বিদের শুরুটাই ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। বার্লিনে স্টার্টিং ব্লক থেকে বেরিয়ে মাত্র দশমিক ১৪৬ সেকেন্ডে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন বোল্ট। ব্লকে পা রেখে প্রবল আনুভূমিক শক্তি তৈরি করে দ্রুত গতি তুলেছিলেন তিনি।

তিয়ানগং দাঁড়িয়েছিল সোজা হয়ে। প্রথম দৌড়ে সংকেত বুঝতে না পারায় চলতে শুরু করতেই প্রায় ১ সেকেন্ড দেরি করেছিল। বিশেষজ্ঞদের হিসাবে, পাঁচ মিটার পর্যন্ত রোবটটির চেয়ে প্রায় দুই সেকেন্ড এগিয়ে থাকতেন বোল্ট। যুক্তরাষ্ট্রের ব্রিগহাম ইয়াং ইউনিভার্সিটির ব্যায়ামবিজ্ঞানের অধ্যাপক ইয়ান হান্টারের ধারণা, স্টার্টিং ব্লক ব্যবহারের সুযোগ পেলে রোবটটি আরো দ্রুত হতে পারে।

দুর্বল শুরু কাটিয়ে ওঠার পরই দেখা যায় তিয়ানগংয়ের আসল শক্তি। বোল্ট ৪১টি দীর্ঘ পদক্ষেপে ১০০ মিটার শেষ করেছিলেন। তিয়ানগংয়ের লেগেছে ৫০টির বেশি ছোট পদক্ষেপ। কিন্তু সেগুলো এত দ্রুত ছিল যে মানুষের দীর্ঘ পদক্ষেপের সুবিধাও শেষ পর্যন্ত টেকেনি। দক্ষিণ কোরিয়ার কাওয়াংউন ইউনিভার্সিটির রোবোটিকস অধ্যাপক পার্ক সুহান বলেন, ‘মানুষের দৌড় অনুকরণ নয়, রোবটটির মোটর যে ধরনের চলনে সবচেয়ে কার্যকর, তার সঙ্গে মিল রেখেই এ দৌড়ের কৌশল তৈরি হয়েছে।’

ছোট ছোট পদক্ষেপের পেছনে ভারসাম্যের হিসাবও রয়েছে। মানুষের মতো বেশি দূরত্বে পা ফেলতে গেলে রোবটটির পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। তাই গতি বাড়ানো হয়েছে পদক্ষেপের দৈর্ঘ্য দিয়ে নয়, সংখ্যা ও ছন্দ দিয়ে।

মানুষ দৌড়ায় পেশি, টেন্ডন ও নমনীয় অস্থিসন্ধির সমন্বয়ে। প্রতিটি পদক্ষেপে গোড়ালি, হাঁটু ও কোমর আঘাতের শক্তি শোষণ করে এবং তার কিছু অংশ ফিরিয়ে দেয়। রোবটের ক্ষেত্রে বৈদ্যুতিক মোটর ও গিয়ারবক্স সরাসরি অস্থিসন্ধিতে ঘূর্ণন তৈরি করে। পেশির মতো সংকোচন ও প্রসারণের প্রয়োজন হয় না। তিয়ানগংয়ের নির্মাতারা ওজন কমাতে এর ধড় ও কোমরের বিভিন্ন অংশ নতুনভাবে তৈরি করেছেন। উন্নত করা হয়েছে মোটর, অঙ্গপ্রত্যঙ্গের চলাচলের পরিসর এবং নিয়ন্ত্রণকারী সফটওয়্যার।

মানুষের আরেকটি সীমাবদ্ধতা ক্লান্তি। বিশ্বমানের দৌড়বিদরাও শেষ ২০ মিটারে স্নায়ু ও পেশির অবসাদে কিছুটা গতি হারান। তিয়ানগংয়ের সেই বিপদ নেই। দৌড়ের শেষ অংশেও রোবটটি সর্বোচ্চ গতি ধরে রেখেছিল।

কিন্তু গতি ধরে রাখা আর কখন থামতে হবে, তা বোঝা এক বিষয় নয়। সামনে দেয়াল দেখে সিদ্ধান্ত নেয়া, গতি কমানো কিংবা দিক পরিবর্তনের সক্ষমতায় রোবট এখনো মানুষের চেয়ে অনেক পিছিয়ে। তাই তিয়ানগংয়ের রেকর্ড শুধু যন্ত্রের অসাধারণ গতির গল্প নয়; এটি মানুষের বুদ্ধি, উপলব্ধি ও তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতার গুরুত্বও মনে করিয়ে দেয়। রয়টার্স

আরও