সাসটেইনেবিলিটি সামিটে বিএসইসি চেয়ারম্যান

বন্ডের তহবিল ব্যয় ও ইস্যু প্রক্রিয়ার সময় কমানো হচ্ছে

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেছেন, দেশে কার্যকর বন্ড বাজার গড়ে না ওঠার পেছনে অন্যতম কারণ হলো ব্যাংক ঋণের তুলনায় বন্ড ছাড়ার দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া ও অতিরিক্ত খরচ।

ব্যাংক থেকে যেখানে তিন মাসে ঋণ পাওয়া যায়, সেখানে বন্ডের মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহ করতে এক বছর লেগে যাচ্ছে এবং এর খরচও বেশি। বিএসইসি এ জায়গায় কাজ করছে। আমরা বন্ড অনুমোদনের সময় ও প্রক্রিয়াগত খরচ কমিয়ে আনার জন্য কাজ করছি। এতে উদ্যোক্তারা ব্যাংক ঋণের চেয়ে বন্ডের দিকে বেশি আকৃষ্ট হবেন।

গতকাল রাজধানীর একটি পাঁচ তারকা হোটেলে ‘সাসটেইনেবিলিটি সামিট-২০২৬’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ ব্র্যান্ড ফোরাম ও সাসটেইনেবল ব্র্যান্ড ইনিশিয়েটিভের আয়োজনে এবং বাংলাদেশ ইনোভেশন কনক্লেভের উদ্যোগে আয়োজিত এ সামিটে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়িক প্রতিনিধি, নীতিনির্ধারক, শিল্প বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ ও সামাজিক উদ্যোক্তারা অংশ নেন।

অনুষ্ঠানে বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, ‘টেকসই অর্থায়নের মূল ভিত্তি হলো ইএসজি (পরিবেশ, সমাজ ও সুশাসন)। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের দেশে পরিবেশের বিষয়টি এখনো উপেক্ষিত। নগর থেকে গ্রাম, সব জায়গাতেই প্লাস্টিক ও নদী দূষণ আমাদের চারপাশকে ঘিরে ফেলেছে। দ্বিতীয়ত, আমরা সামাজিক অঙ্গন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে শুধু অংশীজনদের কথা বলি। কিন্তু দেশে সত্যিকারার্থে ভালো পরিবেশ ও সমাজ গঠন করতে হলে অত্যন্ত কঠোর ও শক্তিশালী আইনের প্রয়োজন। তা না হলে এখানে পরিবেশগত ও সামাজিক সচেতনতা তৈরি করার আর কোনো উপায় নেই। এরপর আসে সুশাসনের বিষয়। আমরা প্রায়ই করপোরেট সুশাসন নিয়ে কথা বলি। যেসব প্রতিষ্ঠান সঠিক করপোরেট সুশাসন চর্চা করে, তারাই দিন শেষে সফল হয়। তবে বাস্তবতা হলো আমাদের দেশে করপোরেট সুশাসন কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। অনেক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীন পরিচালক পর্ষদের আলোচনায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছেন না। তাদের পেশাগত দক্ষতা ও সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ব্যাপক প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।’

দেশে কার্যকর বন্ড বাজার গড়ে না তুলে সরাসরি ‘সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স’ বা টেকসই অর্থায়নে যাওয়া সম্ভব নয় বলে মনে করেন মাসুদ খান। তিনি বলেন, ‘দেশের পুঁজিবাজারে পরিবেশবান্ধব ও সামাজিক বন্ডের মতো আধুনিক ধারণা বাস্তবায়নের আগে সাধারণ বন্ডের একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করা জরুরি। বিএসইসি করপোরেট সুশাসনের নিয়মাবলিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা করছে। তবে বাজার প্রস্তুত না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে ধীর নীতি অবলম্বন করতে হচ্ছে।’

বিশ্বব্যাপী গ্রিন বন্ড, সোশ্যাল বন্ড, ব্লু বন্ড ও অরেঞ্জ বন্ডের মতো টেকসই ঋণপত্রের জয়জয়কার থাকলেও দেশের বাজারে এর ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, ‘আমাদের ইকুইটি বাজার এখনো সাধারণ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ওপর নির্ভরশীল, যারা বাজার বিশ্লেষণ না করে কেবল অন্যের কথায় প্ররোচিত হয়ে বিনিয়োগ করেন। অন্যদিকে, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) মূল বোর্ডে সরকারি সিকিউরিটিজ ছাড়া অন্য কোনো বন্ডের কার্যকর লেনদেন নেই বললেই চলে।’

তিনি আরো বলেন, ‘দিন শেষে আমাদের সাধারণ বন্ডের একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করতেই হবে। দায়িত্ব নেয়ার পর আমরা সে চেষ্টাই করে যাচ্ছি।’

অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্র্যান্ড ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশ যখন ২০৩০ সালের এসডিজি লক্ষ্যমাত্রার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এবং স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন দায়িত্বশীল ব্যবসার কোনো বিকল্প নয়—এটাই আমাদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার ভিত্তি। এখনই সময় দায়বদ্ধতা থেকে কার্যকর প্রভাবে এবং কমপ্লায়েন্স থেকে দায়িত্বশীল আচরণে উত্তরণের।’

দিনব্যাপী এ সামিটে তিনটি করে কি-নোট ও ইনসাইট সেশন, দুটি করে প্যানেল আলোচনা ও কেস স্টাডি এবং একটি করে এক্সপার্ট ডিপ ডাইভ পলিসি ডায়ালগ অনুষ্ঠিত হয়। কি-নোটগুলো উপস্থাপন করেন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফিলিপ কটলার ও কানাডার রিসইন্ট সাসটেইনেবিলিটি ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট ড. খালিদ হাসান ও হিন্দুস্তান ইউনিলিভার ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ড. শ্রামন ঝা। ইনসাইট সেশনগুলোয় কথা বলেন পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের অধ্যাপক ড. মেলিতা মেহজাবীন ও এডুকেশন ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ক্লাইমেট অ্যাকশনের ইউনেস্কো চেয়ার অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নুরুন্নবী।

অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ পিএলসির সিইও মোহাম্মদ ইকবাল চৌধুরী, এসএমসি এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সায়েফ নাসির, গ্রামীণফোন লিমিটেডের সিইও ইয়াসির আজমান, এসিআই লজিস্টিকস লিমিটেডের (স্বপ্ন) এমডি সাব্বির হাসান নাসির ও বিজিএমইএ ভাইস প্রেসিডেন্ট ভিদিয়া অমৃত খান বক্তব্য রাখেন।

আরও