বিশ্বজুড়ে ঋণের বোঝা বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয়ও। এতে বিভিন্ন দেশের সরকারের বাজেটের ওপর তৈরি হচ্ছে অতিরিক্ত চাপ। পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পেনশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যয় করার সুযোগ কমে আসছে। ঋণের সুদ মেটাতে সরকারকে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হওয়ায় জনসেবার মান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো দেশকে এ ব্যয় মেটাতে কর বাড়ানো কিংবা সরকারি খরচ কমানোর পথও বেছে নিতে হতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। খবর আল জাজিরা।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইআইএফ) তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুনে বিশ্বে মোট ঋণের পরিমাণ ১০ ট্রিলিয়ন ডলার বেড়ে ৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। এ হিসাবের মধ্যে সরকার, পরিবার ও বিভিন্ন কোম্পানির ঋণ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বিশ্বের মোট জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে এ দেনার পরিমাণ দাঁড়ায় মাথাপিছু প্রায় ৪৪ হাজার ডলার। ঋণ বৃদ্ধির বড় অংশই এসেছে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো থেকে।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এরই মধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠছে ঋণের চাপের প্রভাব। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় ইউরোপের বিভিন্ন দেশে লাখ লাখ মানুষ জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কম মজুরি, বাড়ির উচ্চমূল্য ও শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না থাকার প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছেন। ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালি ও পর্তুগালে এসব বিক্ষোভের কোনো কোনোটি সংঘর্ষ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগে রূপ নিয়েছে। অন্য অনেক বিক্ষোভ অবশ্য শান্তিপূর্ণ ছিল।
এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে সরকারি অর্থ ব্যবস্থার ওপর চাপের বিষয়টি সামনে এসেছে। বছরের পর বছর ঋণ নেয়ার ফলে ইউরোপের অনেক দেশের কাঁধে জমেছে পাহাড় সমান দেনা। এখন সে ঋণের সুদ পরিশোধের খরচও বাড়ছে। সম্প্রতি ফ্রান্সে সরকারি ঋণের সুদহার ২০০২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ফলে ঋণের সুদ মেটাতে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে দেশটির সরকারকে।
সরকার সাধারণত বন্ড বিক্রি করে অর্থ ধার করে। ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এসব বন্ড কিনে সরকারকে ঋণ দেয়। এর বিনিময়ে সরকার নির্দিষ্ট হারে সুদ পরিশোধ করে ও নির্ধারিত মেয়াদ শেষে মূল অর্থ ফেরত দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়।
১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের ক্ষেত্রে সরকার ১০ বছর পর মূল অর্থ ফেরত দেয়। এ বন্ড থেকে বিনিয়োগকারীরা যে মুনাফা বা আয় পান, তাকে বন্ডের ইল্ড বলা হয়। সরকারি ঋণের খরচ ও বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি দেশের ঋণ ব্যবস্থাপনার গ্রহণযোগ্যতা বোঝার গুরুত্বপূর্ণ সূচক এটি।
বন্ডের দাম কমলে সাধারণত এর ইল্ড বেড়ে যায়। তখন নতুন করে ঋণ নিতে সরকারকে বেশি সুদ দিতে হয়। পরিবারের গৃহঋণের সুদ বাড়লে যেমন মাসিক ব্যয় বাড়ে, তেমনি সরকারেরও ঋণের সুদ পরিশোধে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়। ফলে সড়ক, হাসপাতাল, বিদ্যালয় ও অন্যান্য জনসেবায় ব্যয়ের জন্য অর্থ কমে যায়।
ইউরোপের বড় অর্থনীতিগুলোর ১০ বছর মেয়াদি সরকারি ঋণের সুদহার ৫ শতাংশের কাছাকাছি বা তার বেশি পর্যায়ে সর্বশেষ দেখা গিয়েছিল ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে। ইউরোজোনের ঋণ সংকটের সময়, ২০১০-১২ সালের মধ্যে, গ্রিস, ইতালি ও স্পেনের মতো সংকটে থাকা দেশগুলোকে এ ধরনের উচ্চ সুদ দিতে হয়েছিল। আয়ারল্যান্ড ও পর্তুগালের ঋণের সুদহার ৭ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ার পর আর্থিক সহায়তা নিতে বাধ্য হয়েছিল দেশ দুটি।
সরকারি ঋণের মোট পরিমাণের দিক থেকে বিশ্বে শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির সরকারি ঋণ ৪১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপি ১২৭ শতাংশের সমান। বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা ডলারে ঋণ নেয়ার সুবিধা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। ফলে দেশটির সরকারি ঋণের প্রতি আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা থাকে। তবে এ সুবিধা থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ নেয়ার সক্ষমতা সীমাহীন নয়।
সরকারি ঋণের পরিমাণের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চীন। দেশটির ঋণ ২২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ১০৪ শতাংশ। এছাড়া জাপানের সরকারি ঋণ ৮ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার। বড় অর্থনীতিগুলোর মধ্যে জাপানের ঋণ জিডিপি অনুপাত সবচেয়ে বেশি, ১৯৯ শতাংশ। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের সরকারি ঋণ ৪ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার, যা দেশটির জিডিপির ১০২ শতাংশ।
ফ্রান্সের সরকারি ঋণের পরিমাণ বর্তমানে ৪ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার। বৈশ্বিক হিসাবে দেশটি পঞ্চম বৃহত্তম সরকারি ঋণগ্রহীতা। দেশটির ঋণ জিডিপির ১১৮ দশমিক ৫ শতাংশ। মোট ঋণের পরিমাণে ফ্রান্স ইতালির চেয়ে এগিয়ে থাকলেও ইতালির অর্থনীতির তুলনায় ঋণের বোঝা বেশি। দেশটির ঋণ জিডিপির ১৩৮ শতাংশ। অন্যদিকে জার্মানির সরকারি ঋণ ৩ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ৬৫ শতাংশ।
আইএমএফ পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ফ্রান্সের সরকারি ঋণ জিডিপির ১২১ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছতে পারে। এতে দেশটির সরকারি অর্থ ব্যবস্থাকে দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই অবস্থায় ফিরিয়ে আনার কাজ আরো কঠিন হয়ে পড়বে।
সংস্থাটির তথ্যানুযায়ী, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ঋণের সুদ পরিশোধে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে। গত এক বছরে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো সরকারি বন্ডের সুদ বাবদ ৩ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করেছে। এ ব্যয় বিশ্বে প্রতিরক্ষা খাতে মোট ব্যয়ের ৩ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলারের চেয়েও বেশি।