দক্ষিণ কোরিয়া সফরে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

সিউলের সঙ্গে বাণিজ্য-বিনিয়োগে নতুন অংশীদারত্বের সূচনা চায় ঢাকা

সফর প্রসঙ্গে গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘নতুন সরকারের আওতায় দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক শক্তিশালী করার সূচনা হবে এ সফরের মধ্য দিয়ে।

দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা আরো বাড়াতে নতুন অংশীদারত্বের সূচনা করতে চায় বাংলাদেশ। এ লক্ষ্যে গতকাল রাতে দেশটির রাজধানী সিউলের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। সফরে দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রথম ভাইস মিনিস্টার, বাণিজ্যমন্ত্রী, জাতীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং দেশটির আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা কোরিয়া ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশনের (কেওআইসিএ) চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠক করবেন তিনি।

সফর প্রসঙ্গে গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘নতুন সরকারের আওতায় দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক শক্তিশালী করার সূচনা হবে এ সফরের মধ্য দিয়ে। এর মাধ্যমে সিউলের সঙ্গে সম্পর্ক আরো জোরদার করার নতুন অঙ্গীকার ব্যক্ত হবে।’

তিনি বলেন, ‘সফরটি হলো সম্পৃক্ততার প্রক্রিয়া উন্মুক্ত করা এবং ঢাকা ও সিউলের মধ্যে মন্ত্রী পর্যায়ের সম্পৃক্ততার ক্ষেত্র ও দৃশ্যমানতা তৈরি করা। অক্টোবর শেষে বা নভেম্বরের মধ্যে বাণিজ্যমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রীসহ যাব। মন্ত্রী পর্যায়ের সম্পৃক্ততার দৃশ্যমানতা বাড়বে। ওনারাও ঢাকায় আসবেন, আমরাও সিউলে যাব।’

হুমায়ুন কবির বলেন, ‘এ সফরের মাধ্যমে ফলপ্রসূ অংশীদারত্বের ভিত্তি তৈরিতে প্রয়োজনীয় কিছু প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠার সুযোগ হবে। বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্টের (সিইপিএ) আলোচনা এরই মধ্যে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। চুক্তিটি সম্পন্ন হওয়ার কাছাকাছি রয়েছে।’ সফরটি সেই অংশীদারত্বকে এগিয়ে নেয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতের অন্যান্য অংশীদারত্বের পথও উন্মুক্ত করবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরের প্রসঙ্গ তুলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘সে সময় বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বিশেষত ভবন নির্মাণ, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও মহাকাশসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে অংশীদারত্বে আগ্রহ দেখিয়েছে দেশটি। এসব প্রকল্পে আন্তর্জাতিক অর্থায়নের সুযোগ রয়েছে। কোরিয়া প্রতিযোগিতামূলক ও সাশ্রয়ী ঋণের প্রস্তাব দিচ্ছে এবং বাংলাদেশও তা নিতে আগ্রহী।’

দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ‘বাণিজ্য ও বিনিয়োগ যেন দুই দেশের মধ্যে আরো বাড়ে, সে চেষ্টা করছি।’

বাংলাদেশের অগ্রাধিকারে দক্ষিণ কোরিয়াকে অংশীদার হিসেবে মন্তব্য করে হুমায়ুন কবির বলেন, ‘দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নত ও শক্তিশালী করার চেষ্টা চলছে।’ জনশক্তি রফতানি, শিপবিল্ডিং, অন্যান্য অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব এবং প্রকল্পে আন্তর্জাতিক অর্থায়নকে দুই দেশের সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে নতুন সম্পর্কের সূচনা করতে যাচ্ছি, যাতে অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং ব্যবসা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দেশটির সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক আরো শক্তিশালী হয়।’

এর আগে বাংলাদেশে নিযুক্ত দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রদূত কিম জি-জুন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এ প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী জানান, তাদের মধ্যে অত্যন্ত আন্তরিক পরিবেশে মতবিনিময় হয়েছে।

গতকাল ব্রিফিংয়ে কোরিয়ান ইপিজেড প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কোরিয়ান ইপিজেড যেটা আছে, সেটা ব্রিলিয়ান্ট ইপিজেড। এটা একটা মডেল। একটা সুন্দর ইপিজেড। বিগত ১৫ বছরে স্বৈরাচার সরকার এটা একেবারেই ব্যবহার করেনি। আমরা কোরিয়ান ইপিজেডকে আরো বেশি ব্যবসার কাজে ব্যবহার করব।’ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অগ্রাধিকার বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আগের সরকারের সময়ে কোরিয়ান ইপিজেড নিয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে হুমায়ুন কবির বলেন, ‘এ ধরনের প্রতিহিংসামূলক হেইট্রেডের রাজনীতি বন্ধ করতে হবে।’ তিনি শেখ হাসিনার সরকারের সমালোচনা করে বলেন, ‘কোরিয়ান ইপিজেডটি আগের বিএনপি সরকারের সময়ে শুরু হয়েছিল বলেই সেটি ব্যবহার করা হয়নি।’

এ প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, ‘কোনো সরকারের সময়ে ভালো কোনো উদ্যোগ নেয়া হলে শুধু আগের সরকারের সময়ে হয়েছে বলে সেটি বন্ধ করে দেয়ার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।’ দেশে ভালো কোনো উদ্যোগ থাকলে বর্তমান সরকার সেটি চালু রাখার চেষ্টা করবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।

এদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, রাষ্ট্রদূত কিমের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের গুরুত্ব তুলে ধরেন হুমায়ুন কবির। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, উন্নয়ন, মানবসম্পদ ও প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়।

বৈঠকে প্রতিমন্ত্রীর আসন্ন সফর নিয়ে আলোচনা হয়। এ সফরে তিনি কোরিয়ার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের এবং কেওআইসিএর প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষ থেকে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ পৌঁছে দেবেন হুমায়ুন কবির।

রাষ্ট্রদূত কিম ব্যক্তিগতভাবে আমন্ত্রণ পৌঁছে দেয়ার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে এটিকে দুই দেশের সম্পর্ককে আরো শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন।

সিইপিএ নিয়ে আলোচনা চূড়ান্ত হওয়া প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘চুক্তিটি দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ আরো সম্প্রসারিত করবে। প্রযুক্তি, এআই, শিপবিল্ডিং, ইলেকট্রনিকসসহ উচ্চ মূল্য সংযোজন ও প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশে কোরীয় বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ নিয়েও দুই পক্ষ আলোচনা করবে।’

বৈঠকের শেষে দুই পক্ষ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরো গভীর করা এবং বাংলাদেশ-দক্ষিণ কোরিয়া সম্পর্ক সম্প্রসারণে নিজেদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

আরও