ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিনারে বক্তারা

বৈশ্বিক বাজারে হস্তশিল্পের সক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

বিশ্বব্যাপী দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে হস্তশিল্পের বাজার। ২০২৪ সালে এর আকার ছিল ১ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি।

বিশ্বব্যাপী দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে হস্তশিল্পের বাজার। ২০২৪ সালে এর আকার ছিল ১ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি। ২০৩২ সাল নাগাদ তা প্রায় আড়াই ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছার সম্ভাবনা রয়েছে। অথচ হস্তশিল্পের বিশাল এ বাজারে বাংলাদেশের অবদান এখনো ৩ কোটি ডলারের ঘরে। এ খাতে দেশের সক্ষমতা বাড়াতে নীতিনির্ধারক, উদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।

রাজধানীর ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে গতকাল অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে এ মতামত দেন বক্তারা। ‘বাংলাদেশী হস্তশিল্প পণ্য: রফতানি সক্ষমতা বৃদ্ধি ও বৈশ্বিক বাজারের চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এ সেমিনারটি যৌথভাবে আয়োজন করে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর অন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ ডেভেলপমেন্ট (সিইডি) প্লাটফর্ম।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ হাসান আরিফ। তিনি বলেন, ‘হস্তশিল্পের জন্য এখন ৬ শতাংশ প্রণোদনা দেয়া হয়। কিন্তু স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে এটা আর দেয়া যাবে না। সে জন্য এখন থেকেই কার্যকরি কর্মপরিকল্পনা নেয়া দরকার।’

বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও হস্তশিল্পের বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকার পেছনে সংশ্লিষ্ট সবাই দায়ী বলে মনে করেন ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, ‘বৈশ্বিক বিভিন্ন মেলায় কীভাবে অংশগ্রহণ করতে হয়, আমাদের অনেক উদ্যোক্তাই তা জানেন না। বিভিন্ন সময় সরকারি খরচে তাদের নিয়ে যাওয়া হলেও অভিজ্ঞতা ও পরিকল্পনার অভাবে এসব মেলা থেকে ভালো ফল আনতে পারেন না তারা। এক্ষেত্রে ইপিবিরও হয়তো গা-ছাড়া ভাব রয়েছে।’ দেশের হস্তশিল্পকে এগিয়ে নিতে হলে উদ্যোক্তা, কারিগর, সরকার ও একাডেমিয়া—সবার একসঙ্গে কাজ করে যেতে হবে বলেও মন্তব্য করেন মোহাম্মদ হাসান আরিফ।

সেমিনারে ‘‌এক্সপোর্ট পটেনশিয়াল অব হ্যান্ডিক্রাফট সেক্টর: চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড ওয়ে ফরওয়ার্ড’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইপিবির পরিচালক আবু মোখলেছ আলমগীর হোসেন। এতে বলা হয়, ২০২৪ সালে হস্তশিল্পের বৈশ্বিক বাজার ছিল ১ হাজার ১০৭ বিলিয়ন ডলারের। বার্ষিক ১০ দশমিক ১৫ শতাংশ গড় প্রবৃদ্ধি হারে ২০৩২ সাল নাগাদ এর আকার ২ হাজার ৩৯৭ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়াতে পারে। বিপরীতে ২০২১-২২ অর্থবছরে এ খাতে বাংলাদেশের রফতানি ৪ কোটি ৩ লাখ ডলারে পৌঁছলেও গত পাঁচ বছরে তা ৩ কোটি ডলারের ঘরেই ওঠানামা করছে।

আলমগীর হোসেন বলেন, ‘পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি, প্লাস্টিক ব্যবহারে বিধিনিষেধ এবং ফ্যাশন, প্যাকেজিং, কৃষি ও নির্মাণ খাতে প্রাকৃতিক উপকরণের ব্যবহার বাড়ায় এ বাজার দ্রুত বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, জাপান, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোয় হস্তশিল্পের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তবে কৌশলগত পরিকল্পনা ও সমন্বিত উদ্যোগের অভাবে বাংলাদেশ এ বাজারে পিছিয়ে রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘এ খাতে বাংলাদেশের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। দক্ষ কারিগর, ঐতিহ্যবাহী নকশা, পাট ও প্রাকৃতিক তন্তুর শক্ত ভিত্তি এবং পরিবেশবান্ধব পণ্যের বৈশ্বিক চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য হস্তশিল্প খাতে আমাদের বড় শক্তি। একই সঙ্গে ই-কমার্সের প্রসার, টেকসই জীবনধারার বৈশ্বিক প্রবণতা ও দাতা সংস্থার সহায়তা এ খাতের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করছে। তবে দুর্বলতাও কম নয়। গবেষণা ও নকশা কেন্দ্রের অভাব, অর্থায়নের সীমিত সুযোগ, দক্ষ কারিগরের ঘাটতি, কাঁচামালের উচ্চমূল্য, নগদ প্রণোদনার স্বল্পতা, অবকাঠামো ও লজিস্টিক দুর্বলতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দুর্বল সংযোগ হস্তশিল্প খাতের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আরশাদ মাহমুদ চৌধুরী। পানেল আলোচক ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান, এসএমই ফাউন্ডেশনের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নাজিম হাসান সাত্তার, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক নুসরাত হাফিজ ও হেড অব সিইডি আফসানা চৌধুরী, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) প্রধান নকশাবিদ মো. রাহাত উদ্দিন, বাংলাদেশ পাটজাত পণ্য রফতানিকারক সমিতির (বিজেজিইএ) উপদেষ্টা শাহেদুল ইসলাম হেলাল এবং বাংলাদেশ হস্তশিল্প প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বাংলাক্রাফট) সভাপতি মো. বেলাল হোসেন।

আরও