বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপের পূর্বাভাস

চার বছরে উদীয়মান বাজারে যোগ হবে ১২ ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদ

উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোয় ২০৩০ সালের মধ্যে বিপুল পরিমাণ নতুন সম্পদ যুক্ত হতে যাচ্ছে।

বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপের (বিসিজি) সাম্প্রতিক গ্লোবাল ওয়েলথ রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক আর্থিক সম্পদ ১০ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড ৩৩৩ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা ২০২১ সালের পর সবচেয়ে দ্রুততম বৃদ্ধি। খবর ইউরো নিউজ।

বিসিজির পূর্বাভাস অনুযায়ী, চীনসহ উদীয়মান বাজারগুলো ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ১২ ট্রিলিয়ন ডলারের নতুন আর্থিক সম্পদ যোগ করবে। ফলে বিশ্ব সম্পদের মানচিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর বিস্তৃতি। অতীতের অনেক সম্পদ উত্থান নির্দিষ্ট কোনো দেশ বা অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এবার একসঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন ধনিকশ্রেণী তৈরি হচ্ছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এখনো বিশ্বের মোট সম্পদের বড় অংশ উত্তর আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপের দখলে। তবে নতুন সম্পদ তৈরির গতি সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে উদীয়মান অর্থনীতিগুলোয়। বিশেষ করে ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, সৌদি আরব, ব্রাজিল ও মেক্সিকোর মতো দেশগুলো দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।

বিসিজির হিসাব বলছে, আর্থিক সম্পদের পরিমাণ আড়াই লাখ ডলারের বেশি এমন পরিবারের সংখ্যা আগামী কয়েক বছরে গড়ে প্রায় ৮ শতাংশ হারে বাড়বে। ফলে চলতি দশক শেষ হওয়ার আগেই বিশ্বে আরো ১০ লাখের বেশি নতুন বিলিয়নেয়ার তৈরি হবে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন সম্পদ সৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় অবদান রাখবে ভারত। দেশটি ২০৩০ সালের মধ্যে ২ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি নতুন সম্পদ যোগ করতে পারে। একই সময়ে ব্রাজিলে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ও মেক্সিকোয় প্রায় ৬০০ বিলিয়ন ডলারের নতুন সম্পদ সৃষ্টি হতে পারে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্বের ধনী মানুষের বড় অংশ এখন আর কেবল নিউইয়র্ক, লন্ডন কিংবা জুরিখের মতো ঐতিহ্যবাহী আর্থিক কেন্দ্রে তৈরি হচ্ছে না। দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন শহরেও নতুন সম্পদের উত্থান দেখা যাচ্ছে। এ কারণে বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান, প্রাইভেট ব্যাংক ও বিলাসপণ্য নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর নজরও ধীরে ধীরে নতুন বাজারগুলোর দিকে যাচ্ছে। কারণ ভবিষ্যতের ধনী গ্রাহকদের বড় অংশ এসব অঞ্চল থেকেই আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নাইট ফ্র্যাঙ্কের ২০২৬ সালের ওয়েলথ রিপোর্টেও একই ধরনের চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, ভারতে অতি ধনী মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।

যেসব ব্যক্তির সম্পদের পরিমাণ ৩ কোটি ডলারের বেশি, তাদের ‘আল্ট্রা হাই নেট ওয়ার্থ’ ব্যক্তি হিসেবে ধরা হয়। ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে ভারতে এ শ্রেণীর মানুষের সংখ্যা ৬৩ শতাংশ বেড়েছে। ২০৩১ সালের মধ্যে দেশটিতে এমন মানুষের সংখ্যা ২৫ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

নাইট ফ্র্যাঙ্ক বলছে, ভারত এখন শুধু উদ্যোক্তাদের দেশ নয়। সেখানে বড় মূলধন, উন্নত আর্থিক বাজার এবং আন্তর্জাতিকভাবে সংযুক্ত বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীদের সংখ্যা বাড়ছে। ফলে দেশটির সম্পদ সৃষ্টির গতি আরো শক্তিশালী হচ্ছে।

তবে সবচেয়ে দ্রুত প্রবৃদ্ধির বাজার শুধু ভারত নয়। আগামী চার বছরে অতি ধনী মানুষের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ইন্দোনেশিয়া বিশ্বের শীর্ষে থাকতে পারে। দেশটিতে এ শ্রেণীর মানুষের সংখ্যা ৮২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। একই সময়ে সৌদি আরব ও পোল্যান্ডে এ সংখ্যা ৬০ শতাংশের বেশি বাড়তে পারে। ভিয়েতনামেও প্রায় ৬০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যও ধীরে ধীরে বৈশ্বিক সম্পদের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠছে। গত পাঁচ বছরে বিশ্বের অতি ধনী জনগোষ্ঠীর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের অংশীদারত্ব ২ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছেছে। সৌদি আরবে ধনকুবের বা বিলিয়নেয়ারের সংখ্যাও দ্রুত বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

একই সঙ্গে ধনকুবেরদের ভৌগোলিক অবস্থানেও পরিবর্তন আসছে। বর্তমানে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বিশ্বের অন্য যেকোনো অঞ্চলের তুলনায় বেশি বিলিয়নেয়ার বাস করেন। এটি অতীতের চিত্রের বিপরীত, যখন উত্তর আমেরিকা এ তালিকায় শীর্ষে ছিল।

নাইট ফ্র্যাঙ্কের গবেষকরা বলছেন, এশিয়ার তরুণ ধনী জনগোষ্ঠী প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও জনমিতিক পরিবর্তনের বিষয়ে বেশি সচেতন। ফলে তাদের বিনিয়োগের ধরনও আগের প্রজন্মের তুলনায় ভিন্ন। এ পরিবর্তনের একটি বড় উদাহরণ ভারতের মুম্বাই। শহরটি এখন দেশটির আর্থিক শক্তির অন্যতম প্রতীক হিসেবে উঠে এসেছে।

নাইট ফ্র্যাঙ্কের মতে, মুম্বাইয়ের প্রবৃদ্ধি মূলত দেশীয় সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। বিদেশী পুঁজির চেয়ে স্থানীয় উদ্যোক্তা, প্রযুক্তি খাতের প্রতিষ্ঠাতা, শিল্পপতি ও বিনিয়োগকারীরাই সেখানে সম্পদ বৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি।

২০২৫ সালে শহরটির অভিজাত আবাসনের দাম ৮ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে। গত পাঁচ বছরে ভারতের অর্থনীতি প্রায় ৪০ শতাংশ সম্প্রসারণ হওয়ায় বিলাসবহুল আবাসনের চাহিদাও দ্রুত বেড়েছে। গত বছর মুম্বাইয়ে ৫০ লাখ ডলারের বেশি মূল্যের বহু আবাসন লেনদেন হয়েছে। এতে বোঝা যায়, শহরটিতে উচ্চ সম্পদশালী মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।

আরও