বিআইবিএমের বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলনের উদ্বোধনীতে বক্তারা

দেশে ২০টির মতো ব্যাংক ভালো বাকিগুলোর অধিকাংশই দুর্দশাগ্রস্ত

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্সের (বিএবি) চেয়ারম্যান আব্দুল হাই সরকার বলেন, ‘দেশের আর্থিক খাতের মূল সমস্যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি ব্যাংক।

দেশে কার্যরত ব্যাংকগুলোর মধ্যে ২০টি ভালো পারফর্ম করছে, বাকিগুলোর অধিকাংশই দুর্দশার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মূলত ব্যাংকের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি হওয়ায় আর্থিক খাতে সংকট তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে তাড়াহুড়ো না করে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণের মাধ্যমে দুর্বল ব্যাংকগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রেসক্রিপশন (ব্যবস্থাপত্র) অন্ধভাবে অনুসরণ না করে দেশীয় বাস্তবতা ও অভিজ্ঞতার আলোকে ব্যাংক খাত পুনর্গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদ, নীতিনির্ধারক ও ব্যাংকাররা। রাজধানীর মিরপুরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) মিলনায়তনে গতকাল ১১তম বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ বিষয় উঠে আসে। ‘অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে ব্যাংক খাতের পুনর্গঠন’ প্রতিপাদ্যে দুই দিনব্যাপী এ সম্মেলনের গণমাধ্যম সহযোগী বণিক বার্তা।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্সের (বিএবি) চেয়ারম্যান আব্দুল হাই সরকার বলেন, ‘দেশের আর্থিক খাতের মূল সমস্যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি ব্যাংক। এ বিষয়ে সরকারকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবে এক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো না করে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগোতে হবে।’ বিচারিক প্রক্রিয়ার দুর্বলতাও আর্থিক খাতের সংকটের অন্যতম কারণ বলে মনে করেন তিনি।

সম্মেলনে সম্মানিত অতিথি ছিলেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘নির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণমূলক নীতিমালা ছাড়া বেসরকারি খাতের ব্যাংক অনুমোদন দেয়ার মধ্য দিয়েই দেশের ব্যাংক খাত ভুল পথে যাত্রা করেছিল। আশি ও নব্বইয়ের দশকে উদারীকরণ এবং বেসরকারি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই এ খাত নানা বিতর্ক ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। নব্বইয়ের দশকের সংস্কারের পর বেসরকারি খাতের বেশ কয়েকটি ব্যাংক আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হতে পেরেছিল। কিন্তু ২০১০ সালের পর যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই যত্রতত্র নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দেয়ায় এ খাত আবারো অবনতির মুখে পড়ে।’

ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ আরো বলেন, ‘প্রথমবার দেশের ব্যাংক খাতের সংস্কৃতি নষ্ট হয়েছে ঋণখেলাপির মাধ্যমে। পরবর্তী সময়ে সেই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার পর আবারো লুটপাটের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যা আরো বেশি মারাত্মক। অতীতের ভুল ও তার পরিণতি মাথায় রেখে বর্তমান নীতিনির্ধারকদের নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। ব্যাংক খাত পুনর্গঠনে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রেসক্রিপশন অন্ধভাবে অনুকরণ না করে দেশের নিজস্ব বাস্তবতা ও অভিজ্ঞতার আলোকে সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।’

বর্তমানে অর্থনীতির শ্লথগতি এবং ব্যাংক ও শিল্প খাতের তারল্য সংকট থেকে উত্তরণে নিয়মকানুন শিথিল করার যে আলোচনা চলছে, সে বিষয়েও সতর্ক করেন এ অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, ‘অতীতে বিধিবিধান অতিরিক্ত শিথিল করায় বর্তমান সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। এ সংকট মোকাবেলায় নিয়ম কিছুটা শিথিল করা হলেও তা যেন আবারো লুটপাট ও অনিয়মের সুযোগ তৈরি না করে, সেজন্য পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। সৎ ও প্রকৃত উদ্যোক্তাদের চিহ্নিত করে তাদের সহায়তা দিতে হবে।’

সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) চেয়ারম্যান ড. জাইদি সাত্তার। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের বর্তমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় মুদ্রানীতি, রাজস্বনীতি ও বাণিজ্যনীতির পারস্পরিক নির্ভরতার ভিত্তিতে সমন্বিত নীতিকাঠামো প্রয়োজন। ব্যাংক খাতের পদ্ধতিগত মূলধন ঘাটতি ও সম্পদের মানের অবক্ষয় নিরসন কার্যকর আর্থিক মধ্যস্থতার পূর্বশর্ত। তবে টেকসই স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে নীতিনির্ধারণের বিস্তৃত ক্ষেত্রগুলোয় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।’

শুধু সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির ওপর নির্ভর করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন পিআরআই চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি বহুমাত্রিক কারণে ঘটে। ফলে শুধু সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির প্রভাব অসমভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষতিপূরণমূলক অবমূল্যায়ন ব্যবস্থা বাস্তবায়নের মধ্যেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সর্বোত্তম কৌশলগত পথ নিহিত রয়েছে।’

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. কবির আহাম্মদ। তিনি বলেন, ‘ব্যাংক খাতের সংকট উত্তরণে আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার, সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও ব্যালান্সশিটের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাংক পর্ষদকে স্বতন্ত্র যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঋণ অনুমোদন করতে হবে। ঋণগ্রহীতার পরিশোধ সক্ষমতার ভিত্তিতেই ঋণ অনুমোদন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।’

অন্যদিকে দেশের অর্থনীতি সংকুচিত হয়ে আসছে বলে মন্তব্য করেন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান এবং সিটি ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসরুর আরেফিন। তিনি বলেন, ‘মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি তলানিতে নেমেছে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিও ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে। এ অবস্থায় অর্থনীতি সংকুচিত হচ্ছে। অন্যদিকে ব্যাংকগুলো সরকারি খাতে ঋণ দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, যা অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক নয়।’

বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান অঞ্চলের বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেম বলেন, ‘ব্যাংক খাতের সমস্যা সমাধানে একটি সমন্বিত ও ব্যবস্থাপনাভিত্তিক রোডম্যাপ প্রয়োজন। বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি শক্তিশালী ব্যাংক থাকলেও এমন কিছু ব্যাংক রয়েছে, যেগুলোর ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। সম্পদের মান পর্যালোচনা, সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং দায় পরিশোধের সক্ষমতার ভিত্তিতে ব্যাংকগুলোকে শ্রেণীবিন্যাস করতে হবে।’

উদ্বোধনী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘ব্যাংকিং ব্যবস্থার মূল ভিত্তি আস্থা, এটি না থাকলে সঞ্চয়কে দক্ষতার সঙ্গে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে রূপান্তর করা সম্ভব নয়। উচ্চ অর্থায়ন ব্যয়, বিনিয়োগে স্থবিরতা, অবকাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা দেশের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ বাড়িয়ে তুলেছে। অন্যদিকে সুশাসন, সম্পদের গুণগত মান ও জবাবদিহির দুর্বলতা আর্থিক মধ্যস্থতার ওপর মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ন করেছে।’

উল্লেখ্য, দুই দিনব্যাপী ১১তম বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলনের প্রথম দিনে ছয়টি অধিবেশনে মোট ৪৮টি গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়।

আরও