সাইদুল হক জুইসের ‘বনবিবির খোঁজে’

বনের অধিষ্ঠাত্রী দেবী বনবিবি। লৌকিক দেবী তিনি। হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের সমন্বিত অরণ্য দেবী। সুন্দরবন ও এর নিকটবর্তী গ্রামীণ সমাজের মানুষ বনবিবিকে পূজা করে থাকে।

বনের অধিষ্ঠাত্রী দেবী বনবিবি। লৌকিক দেবী তিনি। হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের সমন্বিত অরণ্য দেবী। সুন্দরবন ও এর নিকটবর্তী গ্রামীণ সমাজের মানুষ বনবিবিকে পূজা করে থাকে। স্বভাবে দয়াশীল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দেবী বনবিবি। বনের মাঝে মানুষের নিরাপত্তা বিধান করাই বনবিবির কাজ। বনবিবির ভাবনাকে আশ্রয় করে সাইদুল হক জুইস কাজ করেছেন করোনা মহামারীর সময়ে। এক বিপন্ন সময়ে তিনি বনবিবিকে খুঁজেছেন।

কলাকেন্দ্রে চলমান প্রদর্শনীতে ‘‌বনবিবির খোঁজে’ শিরোনামে রয়েছে ড্র‌ইংনির্ভর কোলাজ, তারের ভাস্কর্য ও দুটি বোর্ডের ভাস্কর্য। করোনা মহামারীর সময়ে তিনি কোলাজগুলো আঁকা শুরু করেন। ৫০টির অধিক কোলাজ আছে প্রদর্শনীতে। রঙিন ছাপা কাগজ ছিঁড়ে কোলাজগুলো করা হলেও লাল, কালো, সবুজ‌ ও নীল কালি কলমের রেখার মাধ্যমে সেগুলো একটি নির্দিষ্ট রূপ পেয়েছে। ছেঁড়া কাগজগুলো রেখার ফাঁকে দৃশ্যমান। প্রায় প্রতিটি রেখানির্ভর কোলাজ কাগজের মাঝে ফাঁকা পটভূমিতে কিছুটা কৌণিকভাবে আঁকা এবং তরঙ্গায়িত রেখার মাধ্যমে মানবদেহের অংশ, কীটপতঙ্গ, জলজ প্রাণী ইত্যাদির অবয়ব গড়ে উঠেছে। এতে ফর্মগুলোকে কাগজের ফাঁকা পটভূমিতে ভাসমান মনে হয়। ফর্মগুলো ‘‌ভেলা ভাসান’-এর কথা মনে করিয়ে দেয়। বনবিবির সঙ্গে মনসা দেবীর ভাবনাও উঠে আসে।

‘‌বনবিবির খোঁজে’ শিরোনামে ২৪৪×৬১ সেমি আয়তনের তিনটি উল্লম্ব এবং একটি কৌণিকভাবে দেয়ালে স্থাপিত তার দিয়ে তৈরি ভাস্কর্যে বনজঙ্গলের আবহ পরিস্ফুট। মানুষ বা অন্য প্রাণীর দেহাংশ, শ্বাসমূল, গাছপালা ও কৌণিকভাবে স্থাপন করা ভাস্কর্যে সাপের দেহ এবং মনসা দেবীর অবয়ব দৃশ্যমান। দেয়ালের গায়ে স্থাপন করা আরো দুটি ভাস্কর্যে নারীর অবয়বকে মূর্ত করেছেন, যা বনবিবিকে প্রতিনিধিত্ব করছে। পশ্চাৎপটে সংযুক্ত রিলিফের মতো করে স্থাপন করা ভাস্কর্যগুলো অসংখ্য তারের আঁকাবাঁকা, তরঙ্গায়িত, ছন্দবদ্ধ রেখার মাধ্যমে নানা আকৃতির ফর্ম গড়ে তুলেছে। রেখানির্ভর এ ভাস্কর্যগুলো ফাঁকা পরিসরকে আবদ্ধ করে নানা আকৃতির ফর্ম সৃষ্টির মাধ্যমে। কাজেই শুধু তার নয়, ফাঁকা পরিসর ভাস্কর্যগুলো তৈরির উপাদানে পরিণত হয়েছে। তার ও পরিসর জৈবিক আকৃতির ভাবনাকে প্রকাশ করেছে।

দুটি মুক্ত ভাস্কর্য বোর্ড দিয়ে বানানো হয়েছে। অনুভূমিকভাবে আয়াতাকার বোর্ডকে সর্পিল আঁকাবাঁকাভাবে স্থাপন করা হয়েছে। বোর্ডের পরিসরকে পাতা, পাখি, কচ্ছপ প্রভৃতির কাছাকাছি নানা জৈব আকৃতিতে আংশিক কেটে বাইরের দিকে বের করে দেয়া হয়েছে। বোর্ড থেকে ফর্মগুলো উদ্গত বা বের হয়ে আসছে বলে মনে হয়। সাদা ও কালো রঙ দিয়ে ফর্মগুলো এবং বোর্ডের পরিসর রঙ করা হয়েছে। এখানেও ফর্ম কেটে বের করার মাধ্যমে যে রেখার সৃষ্টি হয়েছে তাও জৈবিক। বস্তুত পুরো প্রদর্শনীতে রেখার মাধ্যমেই ফর্ম তৈরি করা হয়েছে, হোক তা কলমে বা তারে অথবা বোর্ড কেটে। এক ধরনের জীবনদায়ী শক্তি বা জৈবিকতা প্রদর্শনীতে দৃশ্যমান, যা প্রাণ-প্রকৃতির সহজাত স্বাভাবিকতাকে মূর্ত করে। এর‌ই বিপরীতে শিল্পী পৃথিবীর পরিবেশ বিপন্ন করার প্রক্রিয়াকে বনবিবির শ্লোকের মতো করে তুলে ধরেন। বনবিবির শ্লোকের আদলে শিল্পী নিজে শ্লোক রচনা করেছেন, যেখানে মানুষের হঠকারী আচরণ, প্রকৃতিকে ধ্বংস করা প্রভৃতি ব্যক্ত হয়েছে।

ছবি: মাসফিকুর সোহান

প্রদর্শনীতে দুটি বড় আকারের চিত্র আছে। চিত্র দুটিতে পরিসর থেকে ত্রিমাত্রিক হাত, মুখমণ্ডল রিলিফ আকারে উঠে আসছে। চিত্র দুটিতে এক‌ই সঙ্গে পানির ঢেউ ও বাঘের ডোরাকাটা শরীর মনে করিয়ে দেয়। একটি চিত্রে কচ্ছপ আকৃতির ফর্ম তার মধ্যে ত্রিমাত্রিক হাত এবং অন্যটিতে ত্রিমাত্রিক মুখমণ্ডল নির্মাণ করা হয়েছে। দুটি চিত্রেই ফর্মগুলোকে ভাসমান মনে হয় ‘‌ভেলা ভাসানি’র মতো। শিল্পীর সব কাজে এক ধরনের গতি পরিলক্ষিত হয়। সব রেখা, রঙের ব্যবহার গতিময়, অনেক ক্ষেত্রে ভাসমান কিংবা খালি পরিসরকে আবদ্ধ করার প্রক্রিয়ায় নিয়োজিত। এক ধরনের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতা এবং জীবনের অনুভব কাজগুলোর মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে। যার বিপরীতে শিল্পী শ্লোকের মাধ্যমে বর্তমান সময়ের অসংলগ্নতা ও বিপন্নতাকে উপস্থাপন করেছেন।

আপাতদৃষ্টিতে প্রদর্শনীর কাজগুলো সহজ মনে হলেও একাধিক মাধ্যমে এবং উপকরণের সাবলীল ও সমন্বিত ব্যবহার শিল্পীর মেধা ও উদ্ভাবনী শক্তির পরিচয় বহন করে।

ছাপচিত্র মাধ্যমে পাঠ গ্রহণ করলেও সাইদুল হক জুইস পরে নিরীক্ষায় ব্রতী হন। পাপেট তৈরি, মুখোশ নির্মাণ প্রভৃতি কৌশলকে তিনি শিল্পকর্ম নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেন। এভাবে মাধ্যমের গণ্ডি অতিক্রম করেন। একাধিক মাধ্যমের সমন্বয়ে ভাস্কর্য তৈরি কিংবা দ্বিমাত্রিক চিত্রপটে রিলিফ ভাস্কর্যসুলভ ফর্ম সংযোজন সবকিছুতেই নিরীক্ষা আর নতুনত্ব প্রকাশ করতে সক্ষম হন। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে দেশ ও বৈশ্বিক সমাজ, রাজনীতি ও পরিবেশ ভাবনা।

আরও