আমরা সবাই এটি জানি। আমরা আমাদের চ্যালেঞ্জগুলোও স্বীকার করি। আমরা কীভাবে আমাদের একাডেমিক মান, শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও গবেষকদের মূল্যায়ন করছি, সেই সমস্যাটিও আমাদের বুঝতে হবে। প্রতিষ্ঠানের মান এবং চারপাশের ইকোসিস্টেম—সবই এর অংশ। বাংলাদেশের শিক্ষার্থী ও গবেষকরা যখন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে প্রবেশ করে, তখন তারা অত্যন্ত ভালো পারফর্ম করে।
আন্তর্জাতিক রেটিংয়ের ক্ষেত্রে আমর সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছি। নিজেদের আরো ভালোভাবে রেটিং করা আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে আমাদের শিক্ষার্থীরা কোনো অংশে কম বা খারাপ—আমি কখনই তা মানব না। আমি নিজের চোখেই দেখি, আমাদের শিক্ষার্থীরা যখন বিদেশে যায়, তারা দারুণ কাজ করে। কিন্তু আপনারা যখন আমাদের রেটিং দিচ্ছেন, তখন আমরা আশানুরূপ মার্ক পাচ্ছি না। আমি আগেই ব্যাখ্যা করেছি, আমাদের এখানে কিছু সমস্যা রয়েছে। বিদেশী শিক্ষার্থীরা এখানে আসতে চায় না, কারণ আমাদের পরিবেশ, আমাদের নিরাপত্তা, ঢাকা শহরের মতো একটি জায়গার সার্বিক পরিস্থিতি বা দূষণ—এ সবকিছু মিলিয়েই আমরা কাঙ্ক্ষিত বেঞ্চমার্ক অর্জন করতে পারি না।
কিউএস রেটিংয়ের মূল উদ্দেশ্য আন্তর্জাতিক গতিশীলতা, শিক্ষাগত অর্জন এবং ক্যারিয়ার উন্নয়নের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে মানুষদের তাদের সম্ভাবনা পূরণে অনুপ্রাণিত ও ক্ষমতায়ন করা। তো এ র্যাংকিংয়ে কেন আমরা ভালো করতে পারছি না? এ প্রশ্নটাই আমার মনে বারবার ঘোরে।
মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যের মতো এডুকেশন হাবগুলোতে যেসব শিক্ষার্থী মাইগ্রেট করেছে, তারা আমাদের দেশের সীমাবদ্ধ পরিবেশ থেকে গিয়েও সেখানে চমৎকার ফল করছে। আমার দেশ যতই পিছিয়ে থাকুক না কেন, আমরা একে ভালোবাসি কারণ বাংলাদেশ আমার জন্মভূমি। এখানকার সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই এ মেধাবীদের গড়ে তুলেছে। এরপর তারা বিদেশে গিয়ে ভালো করছে। কিন্তু আমরা তার কোনো স্বীকৃতি পাচ্ছি না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হোক, আর নর্থ সাউথ বা অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয় হোক—আমরাই তাদের তৈরি করছি। কিন্তু কেউ স্বীকৃতি দিচ্ছে না যে তারা কোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসেছে। কেউ যখন নিউইয়র্ক ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি থেকে গ্র্যাজুয়েট হয়, সে বলে ‘আমি এনওয়াইআইটি থেকে গ্র্যাজুয়েট’, সে কখনই বলে না ‘আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট’। অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা আমাদের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই হচ্ছে সেই ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাউজ’, যারা এ চমৎকার ‘প্রডাক্ট’ বা মেধাবীদের তৈরি করেছে। কিউএস র্যাংকিং অন্য দেশের বিশ্ববিদ্যালয়কে স্বীকৃতি দিলেও বাংলাদেশেরগুলোকে দেয় না।
আমি কিউএস কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করব, দয়া করে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বোঝার চেষ্টা করুন। এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞানী, ভালো শিক্ষক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পরও আমরা কেন পিছিয়ে পড়ব? বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা এখন ১১৬টি। গবেষণার জন্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বড় ফান্ড চায়। আমি কি তাদের পর্যাপ্ত টাকা দিতে পারি? না। তবে সম্প্রতি সরকার প্রথমবারের মতো শিক্ষায় জিডিপির ২ শতাংশ বাজেট বরাদ্দ করেছে। আগে আইসিটি মন্ত্রণালয়সহ এটি ছিল মাত্র ১ দশমিক ৩৯ শতাংশ। কিন্তু এখন সরাসরি ২ শতাংশ শুধু শিক্ষার জন্যই দেয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এটি জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। বর্তমান সরকার শিক্ষা নিয়ে অত্যন্ত আন্তরিক।
আমরা তো এতদিন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পিএইচডি বা গবেষণার সুযোগই দিইনি। ১৯৯২ সাল থেকে এতগুলো বছর পেরিয়ে গেলেও কেন আমরা আগেই এ সমস্যার সমাধান করিনি? গবেষণা ছাড়া কিউএস কীভাবে আমাদের ভালো রেটিং দেবে?
ইউজিসি এবং অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান নিশ্চিত করা হবে এবং গবেষণায় বরাদ্দ বাড়ানো হবে।