‘‌নয়কুড়ি কান্দার ছয়কুড়ি’ বিলে একদিন

ভোরের আলো ফোটার আগেই যাত্রা শুরু হয়েছিল বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষার্থীদের।

গন্তব্য সুনামগঞ্জ জেলায় অবস্থিত দেশের দ্বিতীয় রামসার সাইট ‘টাঙ্গুয়ার হাওর’। এটি কেবল একটি শিক্ষা সফর ছিল না, বরং ছিল হাওর অঞ্চলের প্রান্তিক অর্থনীতি ও জীববৈচিত্র্য সরাসরি পর্যবেক্ষণের এক অনবদ্য প্রয়াস।

প্রায় ১২৬ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এ জলাভূমি স্থানীয়ভাবে ‘নয়কুড়ি কান্দার ছয়কুড়ি বিল’ নামেও পরিচিত। শ্রেণীকক্ষের তাত্ত্বিক জ্ঞান আর হাওরের বাস্তবতা দেখতেই শিক্ষা সফরের জন্য নির্বাচিত হয়েছিল টাঙ্গুয়ার হাওর। ইনস্টিটিউশনাল ইকোনমিকস অ্যান্ড রুরাল ডেভেলপমেন্ট কোর্সের আওতায় হাওরের প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মকানুন, গ্রামীণ উন্নয়ন ও জীবনযাত্রা সরজমিনে পর্যবেক্ষণ করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য।

সেই লক্ষ্যে বাসে করে সুনামগঞ্জের অভিমুখে যাত্রা শুরু হয়। এরপর মোহনগঞ্জ থেকে ইজিবাইকের ঝাঁকুনি আর আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে আমরা পৌঁছাই মধ্যনগর ঘাটে। সেখান থেকে ভাড়া করা নৌকায় শুরু হয় আসল হাওর বিলাস। মাথার ওপর প্রখর সূর্য। কড়া রোদের স্পর্শে হাওরের বিশাল জলরাশি হীরার মতো চকচক করছে। মেঘালয় পাহাড়গুলো যেন দাঁড়িয়ে আছে পানির ওপর। সারি সারি হিজল-করচের বন আর পানির ওপর ছোট্ট দ্বীপের মতো জেগে থাকা গ্রামগুলো হাওরের অন্যতম আকর্ষণ। দূর থেকে দেখলে মনে হয় গ্রামগুলো জলের ওপর ভেসে রয়েছে।

যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছোট ছোট ডিঙি নৌকা। নৌকায় ভেসে চলার পথে আমরা কথা বলি স্থানীয় জেলেদের সঙ্গে। হাওরপাড়ে নিবন্ধিত মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সদস্যরা নির্দিষ্ট নীতিমালা মেনে মাছ ধরার সুযোগ পান। তবে অভয়াশ্রমে অবৈধভাবে মাছ শিকার এখনো বন্ধ হয়নি।

এরপর তাহিরপুরের টেকেরঘাট থেকে ইজিবাইকে আমরা যাই ভারতের সীমান্তসংলগ্ন লাকমাছড়ায়। খাসিয়া-জৈন্তিয়া ও মেঘালয় পাহাড়ের ঠিক কোল ঘেঁষে জিরো পয়েন্টের কাছাকাছি এটি অবস্থিত। এখানে পাহাড়ি শীতল ঝরনার পানি নুড়ি পাথরের ওপর দিয়ে বয়ে চলেছে। দেখা মিলল পাথর কুড়াতে ব্যস্ত স্থানীয় মানুষদের, যাদের জীবিকা পুরোপুরি প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। পাশেই অবস্থিত নীলাদ্রি লেক বা শহীদ সিরাজ লেক, যা স্থানীয়দের কাছে টেকেরঘাট পাথর কোয়ারি নামে পরিচিত। এর নীলাভ পানি আর টিলার সৌন্দর্য পর্যটকদের মুগ্ধ করে। নীল পানি, ছোট-বড় টিলা, চীনপাথর আর পাহাড়ের সমন্বয়ে পর্যটকদের জন্য এটি যেন বাংলার কাশ্মীর।

দুপুরের খাবারের পর লাইফ জ্যাকেট গায়ে চড়িয়ে ছোট নৌকায় করে আমরা গেলাম ওয়াচ টাওয়ারে। ওয়াচ টাওয়ার থেকে দেখলে মনে হয় স্বচ্ছ পানির বুকে ভেসে থাকা শত শত নৌকা যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা কোনো ছবি। দিন শেষে ফেরার পালা। ফেরার পথে গোধূলি আর তার লাল আভা মুহূর্তেই ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয়। গোধূলি পেরিয়ে আঁধার নামলে চাঁদের মায়াবী আলোয় মনে হচ্ছিল, আকাশের তারা বুঝি নেমে এসেছে হাওরের শান্ত পানিতে।

আরও