যে কাঠ স্থাপত্য বিভাগের মডেল তৈরির পর অবহেলায় পড়ে থাকে, নাহরীন আহমেদের হাতে সেটিই রূপ নেয় ব্রেসলেট, চুড়ি, পেনডেন্ট, কানের দুল কিংবা নেকলেসে। চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) স্থাপত্য বিভাগের পঞ্চম বর্ষের এ শিক্ষার্থীর কাছে প্রতিটি অলংকার বাংলাদেশের প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ছুঁয়ে যাওয়া একেকটি গল্প।
নিজের উদ্যোগের নামও রেখেছেন ‘নক্ষত্র’। নামটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে ব্যক্তিগত এক আবেগ। ‘নক্ষত্র’ তার মায়ের দেয়া ডাকনাম। আনুষ্ঠানিক নামে না থাকলেও ছোটবেলা থেকেই এ নামটিকে নিজের পরিচয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ইচ্ছা ছিল তার। আর যেহেতু ‘নক্ষত্র’ একটি খাঁটি বাংলা-সংস্কৃত শব্দ, তাই দেশের ঐতিহ্যনির্ভর তার কাজের সঙ্গে নামটির যেন স্বাভাবিক এক মিল খুঁজে পান তিনি।
উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন অবশ্য আরো আগের। তবে সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেয়ার সাহস আসে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই। প্রথম বর্ষে পড়ার সময় একই বিভাগের সিনিয়র তন্নী কবীরকে পড়াশোনার পাশাপাশি নিজস্ব জুয়েলারি ব্র্যান্ড নিয়ে কাজ করতে দেখেন। পরে জানতে পারেন, তার সেই উদ্যোগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পরিচিতি পেয়েছে। তখনই নাহরীনের মনে হয়, ইচ্ছা আর পরিশ্রম থাকলে স্থাপত্যের শিক্ষার্থী হয়েও নিজস্ব পরিচয় তৈরি করা সম্ভব।
তবে শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। ২০২৪ সালের জুলাই-পরবর্তী কঠিন সময়ে, যখন মানুষের জীবনে অনিশ্চয়তা আর মানসিক চাপ গভীর হয়ে উঠেছিল, তখনই যাত্রা শুরু করে ‘নক্ষত্র’। বিলাসপণ্য কেনার আগ্রহও তখন অনেক কম। নতুন উদ্যোক্তা হিসেবে মানুষের কাছে পৌঁছানো, নিজের কাজের পরিচয় তুলে ধরা, সবকিছুই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। এর সঙ্গে ছিল স্থাপত্য বিভাগের স্টুডিও, ক্লাস আর ইন্টার্নশিপের ব্যস্ততা।
‘নক্ষত্র’-এর প্রতিটি নকশার অনুপ্রেরণা বাংলাদেশের নিজস্ব পরিচয়। লোকজ জ্যামিতিক নকশা, নয়নতারা কিংবা বকুলের মতো পরিচিত ফুল, প্রকৃতি আর স্থাপত্যের নান্দনিকতা, সবকিছুই তার ডিজাইনে নতুন রূপ পায়। প্রতিটি গহনা ব্যবহারকারীর সঙ্গে মানানসই করে তৈরি করেন তিনি।
নাহরীন বলেন,‘আমার স্বপ্ন এমন কিছু তৈরি করা, যেটা হাতে নিলেই মনে হবে, এটা বাংলাদেশের। আমাদের মাটি, গাছ, প্রকৃতি, ঐতিহ্য সবকিছুর একটা অনুভূতি যেন এর মধ্যে থাকে। আমি চাই, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মানুষ এ কাজের মাধ্যমে বাংলাদেশকে চিনুক।’
পরিবেশের প্রতিও রয়েছে তার বিশেষ দায়বদ্ধতা। স্থাপত্য বিভাগের মডেল তৈরির পর অবশিষ্ট কাঠ পুনর্ব্যবহারের পাশাপাশি জলভিত্তিক ভার্নিশ ব্যবহার করেন তিনি, যাতে ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ কমানো যায়। ভবিষ্যতে আরো পরিবেশবান্ধব উপকরণ নিয়ে কাজ করার ইচ্ছাও রয়েছে তার।
তবে নাহরীনের স্বপ্ন শুধু গহনায় সীমাবদ্ধ নয়। ব্যাগ, বুকমার্ক, জুয়েলারি বক্স, ল্যাম্প কিংবা বাংলাদেশের ঐতিহ্যভিত্তিক বিভিন্ন স্যুভেনির তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে একটি নিজস্ব শোরুম গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে তার। যেখানে স্থানীয় কারুশিল্পীরা একসঙ্গে কাজ করবেন, আর ক্রেতারা নিজের পছন্দ অনুযায়ী তাৎক্ষণিকভাবে অলংকার কাস্টমাইজ করতে পারবেন।