বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়নের প্রয়োজনীয়তা

ইউরোপের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে ১৬৪৮ সালের ওয়েস্টফেলিয়ার শান্তিচুক্তি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করে।

এটি আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার ভিত্তি গড়ে দেয়। সেই অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতায় পরবর্তী সময়ে শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন একটি প্রয়োজনভিত্তিক একাডেমিক শাস্ত্র হিসেবে বিকশিত হয়।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন ভিন্ন নামে পরিচিত। কোথাও পিস স্টাডিজ, কোথাও পিস অ্যান্ড কনফ্লিক্ট স্টাডিজ, আবার কোথাও পিস অ্যান্ড কনফ্লিক্ট রেজল্যুশন নামে। নাম ভিন্ন হলেও মূল লক্ষ্য এক—সংঘর্ষের কারণ বোঝা এবং টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার উপায় খুঁজে বের করা। ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায়, মানবসভ্যতার বড় বড় যুদ্ধ ও সংঘাতের অভিজ্ঞতা থেকেই এ শাস্ত্রের বিকাশ।

প্রথমদিকে এ ধরনের অধ্যয়ন মূলত গ্লোবাল নর্থের দেশগুলোতে চালু হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোতেও বিস্তার লাভ করে। বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, শ্রীলংকা, নেপাল, ভুটানসহ অনেক দেশেই শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক বিষয় হিসেবে পড়ানো হচ্ছে।

দেশের প্রেক্ষাপটে এ বিষয়ে অধ্যয়নের প্রয়োজনীয়তা আরো গভীর। বাংলাদেশের জন্মই হয়েছে একটি রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। এর আগে ভাষা আন্দোলন, পরে বিভিন্ন গণ-আন্দোলন ও রাজনৈতিক উত্তাল সময়—সব মিলিয়ে দেশের ইতিহাসে সংঘাত ও প্রতিরোধের অভিজ্ঞতা সুস্পষ্ট। সাম্প্রতিক সময়েও রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক বৈষম্য ও গণ-আন্দোলনের ঘটনা আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজে সংঘর্ষের বাস্তবতাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। ফলে এসব ঘটনার পেছনের কারণ, কাঠামোগত বৈষম্য ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব বিশ্লেষণ করা এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ খুঁজে বের করা অত্যন্ত জরুরি।

এছাড়া বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনৈতিক অস্থিরতা, মানবাধিকার লঙ্ঘন, দুর্নীতি, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, উগ্রবাদ ও অভিবাসন সংকটের মতো জটিল সমস্যা বিদ্যমান। শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন এসব সমস্যার মূল কারণ বিশ্লেষণ করে এবং সংঘর্ষ নিরসনের জন্য শান্তিপূর্ণ কৌশল সম্পর্কে তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক জ্ঞান প্রদান করে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সংঘর্ষের প্রকৃতি, পক্ষগুলোর পরস্পরবিরোধী স্বার্থ এবং আলোচনাভিত্তিক সমাধানের উপায় সম্পর্কে গভীর ধারণা অর্জন করতে পারে। বাংলাদেশকে অনেক গবেষক শান্তি ও সংঘর্ষ বিশ্লেষণের একটি ‘ক্ষুদ্র গবেষণাগার’ হিসেবেও উল্লেখ করেন। কারণ এখানে ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতি ও পরিবেশগত নানা উপাদান মিলিয়ে সংঘাতের বহুমাত্রিক বাস্তবতা দেখা যায়। ফলে এ দেশের অভিজ্ঞতা অধ্যয়ন করলে শান্তি প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক দিক আরো ভালোভাবে বোঝা সম্ভব।

শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন শুধু একটি একাডেমিক বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, সামাজিক স্থিতি ও টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। বাংলাদেশের মতো একটি ইতিহাসসমৃদ্ধ ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ সমাজে এ বিষয়ের প্রয়োজনীয়তা তাই নিঃসন্দেহে অপরিসীম।

চার বছর মেয়াদি আন্ডারগ্র্যাজুয়েট এবং এক বছর মেয়াদি মাস্টার্স কোর্সে শিক্ষার্থীরা শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়নের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক নানা দিক সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করে। পাঠ্যক্রমে পজিটিভ ও নেগেটিভ পিস, স্ট্রাকচারাল ভায়োলেন্স, পিস ডিভিডেন্ড ও ডেমোক্রেটিক পিস থিওরিসহ শান্তি ও সংঘর্ষবিষয়ক মৌলিক তত্ত্বগুলো গুরুত্বের সঙ্গে পড়ানো হয়। পাশাপাশি মানবাধিকার, মানবিক নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক কূটনীতি, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসন সংকট এবং সশস্ত্র সংঘাতের মতো সমসাময়িক বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত থাকে। এছাড়া বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি, গণমাধ্যম ও শান্তি এবং গবেষণা পদ্ধতি সম্পর্কেও শিক্ষার্থীরা পাঠ গ্রহণ করে। এর মাধ্যমে তারা সংঘর্ষের কারণ বিশ্লেষণ, গোষ্ঠীগত ও আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংঘাত ব্যবস্থাপনা, শান্তি বিনির্মাণ ও শান্তিরক্ষা প্রক্রিয়া সম্পর্কে বাস্তবভিত্তিক ধারণা অর্জন করে। একই সঙ্গে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা সম্পর্কেও শিক্ষার্থীরা বিস্তারিতভাবে অবগত হয়।

শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগে পড়াশোনার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সংঘর্ষ ও শান্তি বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক ধারণা সম্পর্কে গভীর বোঝাপড়া অর্জন করে। যেমন—পজিটিভ পিস, নেগেটিভ পিস, স্ট্রাকচারাল ভায়োলেন্স এবং সংঘর্ষের মূল কারণ বিশ্লেষণ। এসব তত্ত্বের মাধ্যমে তারা বুঝতে শেখে যে শান্তি শুধু যুদ্ধের অনুপস্থিতি নয়; বরং দারিদ্র্য, বৈষম্য, নিপীড়ন বা বর্ণবাদমুক্ত একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও শান্তির বিষয়টি জড়িত। এছাড়া শিক্ষার্থীরা সংঘর্ষ বিশ্লেষণ, সংলাপ ও মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি, গবেষণা ও নীতি বিশ্লেষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা অর্জন করে। এ তাত্ত্বিক ও বিশ্লেষণধর্মী দক্ষতা তাদের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান বা মানবিক সংকট মোকাবেলায় কাজ করার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার এনে দেয়। উদাহরণ হিসেবে রোহিঙ্গা সংকটসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ বিভাগের শিক্ষার্থীরা দেশী-বিদেশী সংস্থায় কাজ করছে।

এ বিভাগের গ্র্যাজুয়েটরা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক এনজিও, উন্নয়ন সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, মানবাধিকার সংস্থা, গণমাধ্যম এবং সরকারি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কাজ করার সুযোগ পায়। পাশাপাশি জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানে পিস বিল্ডিং বা কনফ্লিক্ট ম্যানেজমেন্ট সংক্রান্ত কাজেও তারা যুক্ত হচ্ছে।

শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন মূলত একটি বিশেষায়িত বিষয়। যারা ভবিষ্যতে কূটনীতিক, মধ্যস্থতাকারী (মিডিয়েটর), নীতি বিশ্লেষক বা সংঘর্ষ নিরসনসংক্রান্ত কাজে যুক্ত হতে চান, তাদের জন্য এ বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করে। পাশাপাশি বৈশ্বিক রাজনীতি, মানবাধিকার, উন্নয়ন ও শান্তি প্রতিষ্ঠা নিয়ে পড়াশোনা ও গবেষণার আগ্রহ থাকাও প্রয়োজন।

অধ্যাপক ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী: চেয়ারম্যান, শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও