যুক্তরাষ্ট্রের টালসার আকাশ তখন বৈরী, একের পর এক প্রতিযোগী দলের ড্রোন ভূপাতিত হচ্ছে মাটিতে। ৮১টি দলের মধ্যে ২১টি দলই হার মানল প্রতিকূল আবহাওয়ার কাছে। ঠিক এ কঠিন পরিস্থিতিতেই বাংলাদেশের পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে রইল একটি দল—ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ইউআইইউ) এরিয়াল রোবোটিকস টিম (ইউএআরটি)।
যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমা অঙ্গরাজ্যের টালসা শহরের স্কাইওয়ে রেঞ্জে ১৪-১৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয় স্টুডেন্ট আনম্যানড এরিয়াল সিস্টেমস (এসইউএএস) ২০২৬ প্রতিযোগিতা। ২০০৩ সাল থেকে চলে আসা এ আসর বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ড্রোন প্রতিযোগিতাগুলোর একটি, যেখানে প্রতি বছর হাজির হয় বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এরিয়াল রোবোটিকস দল।
এবারই প্রথম এ প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় ইউআইইউর ইউএআরটি। আর প্রথমবার অংশ নিয়েই তারা লিখল নতুন ইতিহাস—এসইউএএসের দুই দশকের বেশি সময়ের ইতিহাসে প্রথম কোনো বাংলাদেশী দল হিসেবে পোডিয়ামে জায়গা করে নেয় তারা। প্রতিকূল আবহাওয়ায় যখন প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর ড্রোন একের পর এক বিধ্বস্ত হচ্ছিল, তখন কৌশলগত পরিকল্পনা আর প্রযুক্তিগত দক্ষতায় মিশন সফলভাবে সম্পন্ন করে বিশ্বে চতুর্থ স্থান অর্জন করে ইউএআরটি।
দেশে ফেরার পর ২৩ সেপ্টেম্বর সকালে ইউআইইউ ক্যাম্পাসে আয়োজন করা হয় এক বর্ণাঢ্য সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, বিশ্ববিদ্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং আমন্ত্রিত অতিথিদের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো আয়োজন।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ইউআইইউ উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. আবুল কাশেম মিয়া তার বক্তব্যে বলেন, শিক্ষার্থীদের এ সাফল্য তাদের মেধা, কঠোর পরিশ্রম, উদ্ভাবনী চিন্তা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার এক উজ্জ্বল বহিঃপ্রকাশ, যা বাংলাদেশের উচ্চ শিক্ষা ও তরুণ প্রজন্মের সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। গবেষণা ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার প্রসারে বিশ্ববিদ্যালয় সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।
ইউএআরটির মেন্টর ও কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ড. রিয়াসাত আজিম এ অর্জনকে আখ্যায়িত করেন শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও পরামর্শকদের দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, সৃজনশীলতা ও দলগত প্রচেষ্টার ফসল হিসেবে। তার মতে, এ সাফল্য অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষা ও উদ্ভাবননির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি ইউআইইউর ধারাবাহিক অঙ্গীকারেরই প্রতিফলন। প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে শিক্ষার্থীরা বাস্তব সমস্যা সমাধান, দলগত নেতৃত্ব ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের হাতেকলমে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেন তিনি।
এসইউএএসের মতো বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নাম তুলে ধরা ইউএআরটির এ সাফল্য শুধু একটি প্রতিযোগিতার ফলাফল নয়—এটি আন্তর্জাতিক রোবোটিকস ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে ইউআইইউর ধারাবাহিক অর্জনের তালিকায় আরেকটি উজ্জ্বল সংযোজন। শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণা ও উদ্ভাবনী উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারাবাহিক বিনিয়োগ তরুণদের সামনে খুলে দিচ্ছে বাস্তব জীবনের জটিল সমস্যা সমাধান ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের মেলে ধরার সুযোগ।
ইউআইইউর এরিয়াল রোবোটিকস দলের সদস্যরা জানান, দূরদর্শী নেতৃত্ব, নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক-পরামর্শক আর মেধাবী শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা যে বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে, ইউএআরটির এ ঐতিহাসিক অর্জন তারই আরেকটি প্রমাণ। এ সাফল্য নিঃসন্দেহে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বড় স্বপ্ন দেখাতে এবং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের সক্ষমতা তুলে ধরতে অনুপ্রেরণা জোগাবে।