গবেষণা

প্লাস্টিক বর্জ্য ও কৃষিজ অবশিষ্টাংশে কম্পোজিট টাইলস তৈরি যবিপ্রবির শিক্ষার্থীদের

ক্রমবর্ধমান প্লাস্টিক দূষণ এবং কৃষিজ অবশিষ্টাংশের কার্যকর ব্যবস্থাপনা এখন বিশ্বজুড়েই বড় চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশেও প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পুনর্ব্যবহারের বাইরে থেকে পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। একই সঙ্গে ধান কাটার পর বিপুল পরিমাণ ধানের খড় অব্যবহৃত থেকে যায় কিংবা খোলা মাঠে পুড়িয়ে ফেলা হয়, যা পরিবেশ দূষণের অন্যতম কারণ। এ দুই ধরনের বর্জ্যকে মূল্যবান নির্মাণসামগ্রীতে রূপান্তরের লক্ষ্য নিয়ে গবেষণা করেছেন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং (আইপিই) বিভাগের দুই শিক্ষার্থী।

পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিককে ম্যাট্রিক্স এবং পাটের তন্তু, ধানের খড়ের তন্তু ও উভয়ের হাইব্রিড তন্তুকে রিইনফোর্সমেন্ট হিসেবে ব্যবহার করে তারা পরিবেশবান্ধব কম্পোজিট টাইলস তৈরি করেছেন। একই সঙ্গে বিভিন্ন অনুপাতে প্লাস্টিক ও প্রাকৃতিক তন্তুর সমন্বয় ঘটিয়ে টাইলসগুলোর যান্ত্রিক ও ভৌত বৈশিষ্ট্য মূল্যায়ন, ক্যারেক্টারাইজেশন এবং অপ্টিমাইজেশন সম্পন্ন করেছেন।

আইপিই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. সাখাওয়াত হোসেনের তত্ত্বাবধানে গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন বিভাগের শিক্ষার্থী শিহাব উদ্দিন সরকার ও পলাশ চন্দ্র রায়। পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিক দিয়ে কম্পোজিট টাইলস তৈরির ওপর দেশে ও বিদেশে আগেও বিভিন্ন গবেষণা হয়েছে। তবে এবারের গবেষণার বিশেষত্ব হলো পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিক কম্পোজিটে ধানের খড়ের তন্তুকে রিইনফোর্সমেন্ট হিসেবে ব্যবহার করার পাশাপাশি একই গবেষণায় পাটের তন্তু, ধানের খড়ের তন্তু এবং এ দুই তন্তুর হাইব্রিড সমন্বয় নিয়ে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন পিইটি ও পিই অনুপাত এবং ফাইবারের শতাংশ পরিবর্তন করে কোন সমন্বয়ে সবচেয়ে ভালো কর্মক্ষমতা পাওয়া যায়, তা বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে।

গবেষণার জন্য পুনর্ব্যবহৃত পিইটি প্লাস্টিক, পলিথিন (পিইট), পাটের তন্তু এবং ধানের খড় সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়াজাত করা হয়। এরপর বিভিন্ন কম্পোজিশনে মোট নয়টি পরীক্ষামূলক নমুনা তৈরি করা হয়। প্রতিটি নমুনার কম্প্রেসিভ স্ট্রেন্থ, পানি শোষণ, অগ্নি প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং অন্যান্য ভৌত বৈশিষ্ট্য আন্তর্জাতিক এএসটিএম মান অনুযায়ী পরীক্ষা করা হয়। পরবর্তী সময়ে টাগুচি পরীক্ষামূলক নকশা এবং গ্রে রিলেশনাল অ্যানালাইসিস পদ্ধতির মাধ্যমে সব পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করে সর্বোত্তম কম্পোজিশন নির্ধারণ করা হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, বিভিন্ন উপাদানের সমন্বয়ে তৈরি কম্পোজিট টাইলসগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য যান্ত্রিক শক্তি, তুলনামূলক কম পানি শোষণ এবং সন্তোষজনক অগ্নি প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন সম্ভব হয়েছে। গবেষকদের মতে, এসব টাইলস ভবিষ্যতে ফুটপাত, পার্ক, বাগানের ওয়াকওয়ে, ল্যান্ডস্কেপিং, ছাদ এবং অন্যান্য নন-স্ট্রাকচারাল নির্মাণকাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। একই সঙ্গে এগুলো প্লাস্টিক বর্জ্য ও কৃষিজ অবশিষ্টাংশের টেকসই ব্যবহারের একটি কার্যকর উদাহরণ হতে পারে।

গবেষণায় যুক্ত শিক্ষার্থীরা বলেন, আমাদের লক্ষ্য ছিল প্লাস্টিক বর্জ্য ও কৃষিজ অবশিষ্টাংশকে পরিবেশবান্ধব ও ব্যবহারযোগ্য নির্মাণসামগ্রীতে রূপান্তরের একটি কার্যকর প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা।

গবেষণার তত্ত্বাবধায়ক ড. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, গত প্রায় তিন বছর ধারাবাহিকভাবে গবেষণা চলছে। প্রতি বছরই শিক্ষার্থীরা নতুন ধারণা ও নতুন উপকরণ যুক্ত করে এ গবেষণাকে আরো সমৃদ্ধ করছে। গবেষণাটি ভবিষ্যতে পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রী উন্নয়ন এবং কৃষিজ বর্জ্যের মূল্য সংযোজনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

গবেষকদের মতে, এ প্রযুক্তিকে আরো উন্নত করে শিল্প পর্যায়ে প্রয়োগ করা গেলে একদিকে প্লাস্টিক বর্জ্য পুনর্ব্যবহার বাড়বে, অন্যদিকে কৃষিজ অবশিষ্টাংশের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত হবে। ফলে পরিবেশ দূষণ কমানোর পাশাপাশি দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহার করে স্বল্পমূল্যের, টেকসই ও পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রী উৎপাদনের নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে।

আরও