যেসব সামুদ্রিক প্রাণী খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়, ওষুধ ও পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করে, প্রসাধন শিল্পে কাজে লাগে বা অন্যান্য অর্থনৈতিক গুরুত্ব বহন করে, সেগুলোর সঠিক ব্যবস্থাপনার ওপর এ বিষয়টি গুরুত্ব দেয়। মেরিন ফিশারিজ মূলত সাগর থেকে প্রাকৃতিক উপায়ে মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণী আহরণের পদ্ধতি, আর অ্যাকুয়াকালচার হলো পরিকল্পিত উপায়ে এগুলোর কৃত্রিম চাষ। ২০১৯ সাল থেকে বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটিতে মেরিন ফিশারিজ ও অ্যাকুয়াকালচার বিষয়ে স্নাতক শিক্ষা দেয়া হয়, যার মূল লক্ষ্য ন্যাচারাল হার্ভেস্টিংয়ের ওপর চাপ কমানো, জেলে সম্প্রদায়ের আয়ের উৎস বৃদ্ধি, তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং সুনীল অর্থনীতির প্রসার।
অ্যাকুয়াকালচারের মধ্যে ফ্রেশওয়াটার অ্যাকুয়াকালচারে মিঠা পানির মাছ চাষ করা হয়, যেখানে অভ্যন্তরীণ জলাশয় তথা পুকুর, লেক, ধানখেত ইত্যাদি ব্যবহৃত হয়। কোস্টাল অ্যাকুয়াকালচারে উপকূলীয় অঞ্চলে চিংড়ি, কাঁকড়া, পাখনাযুক্ত মাছ, সামুদ্রিক শৈবাল, মলাস্কা ইত্যাদির চাষকে বোঝায় এবং মেরিকালচার হলো সম্পূর্ণ সামুদ্রিক পরিবেশে মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণী ও অর্থনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ শৈবালের চাষ সংক্রান্ত গবেষণা ও চর্চার বিষয়টি নিয়ে কাজ করা হয়। বাংলাদেশের বিশাল সমুদ্র এলাকা এবং বিস্তৃত উপকূল অঞ্চলকে কাজে লাগিয়ে এ খাতের ব্যাপক সম্প্রসারণ সম্ভব, যা দেশের অর্থনীতি ও মানুষের কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
একদিকে সাগর থেকে কীভাবে টেকসই উপায়ে সামুদ্রিক সম্পদ আহরণ করা যায় এবং অন্যদিকে কীভাবে কোস্টাল ও ইনশোর অঞ্চলে চাষের পরিধি বৃদ্ধি করা যায়—এ বিষয়ে বিশেষভাবে কাজ করা হয় মেরিন ফিশারিজ ও অ্যাকুয়াকালচার অধ্যয়নে। শিক্ষার্থীরা সামুদ্রিক মাছ ধরা, প্রক্রিয়াকরণ, মূল্য সংযোজন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক বাজারে রফতানির কৌশল শিখতে পারে। চিংড়ি, কাঁকড়া, সামুদ্রিক শৈবাল, মলাস্কা, পার্ল কালচার ইত্যাদির উৎপাদন ও বিপণন দেশে ও বিদেশে ব্যাপক অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। দেশের গ্র্যাজুয়েটরা ভবিষ্যতে এসব বিষয়কে পেশা হিসেবে গ্রহণ করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশকে আরো এগিয়ে নিতে পারে।
এ বিভাগে মৎস্যবিজ্ঞানের সব বিষয়ে পাঠদান করা হয়ে থাকে। শিক্ষার্থীদের সামুদ্রিক পরিবেশ, ওশানোগ্রাফি, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট, হারভেস্টিং প্রযুক্তি, প্রসেসিং ও মার্কেটিং, বায়োসিকিউরিটি এবং টেকসই সামুদ্রিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে পড়ানো হয়। উপকূলীয় অঞ্চলে চাষকৃত প্রাণীগুলোর স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, রোগ প্রতিরোধ, পরিবেশগত প্রভাব এবং বায়োসিকিউরিটির ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়। এছাড়া ফিশ ফিড ম্যানেজমেন্ট, ফিশ প্যাথলজি, পরিবেশগত সংরক্ষণ, সামাজিক বিজ্ঞান, অর্থনীতি ও বায়োস্ট্যাটিস্টিক্স সম্পর্কিত বিষয়ও পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত।
বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মৎস্য উৎপাদনকারী দেশ, যেখানে প্রতি বছর প্রায় ৪৭ লাখ টন মাছ উৎপাদিত হয়। এর ৫৭ শতাংশ মিঠা পানির মাছ। তবে সামুদ্রিক ও উপকূলীয় অঞ্চলে মাছের উৎপাদন তুলনামূলক কম। মেরিন ফিশারিজ ও অ্যাকুয়াকালচার গবেষণার মাধ্যমে এ খাতে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব। বিস্তীর্ণ সাগর ও উপকূলীয় অঞ্চল গবেষণার জন্য উন্মুক্ত হওয়ায় শিক্ষার্থীদের জন্য গবেষণার সুযোগ অনেক বেশি। ভবিষ্যতে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, পরিবেশবান্ধব চাষ পদ্ধতি ও নীতিমালা প্রণয়নে গবেষণার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে মেরিন ফিশারিজ ও অ্যাকুয়াকালচারে গ্র্যাজুয়েটরা।
সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রেই কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে। সরকারি পর্যায়ে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং বিসিএস মৎস্য ক্যাডারে চাকরির সুযোগ রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা, গবেষণা ও উন্নয়নমূলক কাজেও চাকরির সম্ভাবনা রয়েছে। বেসরকারি পর্যায়ে মেরিন ফার্ম, ফিশ প্রসেসিং, এক্সপোর্ট কোম্পানি ও আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন এফএও, ওয়ার্ল্ড ফিশে ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ রয়েছে।
উন্নত দেশগুলোর অর্থনীতি সামুদ্রিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এ বিষয়ে দক্ষ জনশক্তির চাহিদা ব্যাপক। সামুদ্রিক ফিশারিজ, অ্যাকুয়াকালচার, ক্লাইমেট চেঞ্জ ও ব্লু ইকোনমি নিয়ে গবেষণার জন্য উন্নত দেশে উচ্চ শিক্ষা ও স্কলারশিপের সুযোগ রয়েছে। ইউরোপ, আমেরিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে সামুদ্রিক সম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে দক্ষ জনবল প্রয়োজন, যা বাংলাদেশী গ্র্যাজুয়েটদের জন্য একটি বড় সুযোগ তৈরি করেছে।
ভূভাগে কৃষি ও প্রাণিসম্পদ উৎপাদনে আমরা বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হই। জলবায়ু পরিবর্তন, ভূমির সংকট এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। তবে বাংলাদেশের বিশাল সমুদ্রসীমা এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। সুনীল অর্থনীতি আজ বিশ্বব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় এবং বাংলাদেশ যদি এ সম্পদ যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারে, তাহলে দেশের অর্থনীতি আরো সমৃদ্ধ হবে।
অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল ওহাব: মেরিন ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার বিভাগ, বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি