ইউরোপে উচ্চশিক্ষা

স্বপ্ন নয়, সঠিক পরিকল্পনাই খুলে দেয় দ্বার

ঢাকার কোচিং সেন্টারের দেয়াল থেকে ফেসবুকের বিজ্ঞাপন—সবখানেই এখন একটি শব্দ ঘুরেফিরে আসে: ইউরোপ।

একসময় বিদেশে উচ্চশিক্ষা মানেই ছিল যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা কিংবা অস্ট্রেলিয়া। সে চিত্র দ্রুত বদলাচ্ছে। জার্মানি, ফ্রান্স, ফিনল্যান্ড, সুইডেন, নেদারল্যান্ডস, ইতালি, হাঙ্গেরিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ইংরেজি মাধ্যমে ব্যাচেলর, মাস্টার্স ও পিএইচডি প্রোগ্রামের সংখ্যা বেড়েছে বহুগুণ। বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়, বহুমুখী স্কলারশিপ, সাশ্রয়ী শিক্ষা ব্যয় আর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সুযোগ—সব মিলিয়ে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের কাছে ইউরোপ এখন অন্যতম আকর্ষণীয় ঠিকানা। তবে স্বপ্ন আর বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে একটি শব্দ—পরিকল্পনা।

কেন ইউরোপ: ইউরোপের সবচেয়ে বড় শক্তি এর বৈচিত্র্য। প্রতিটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা, টিউশন ফি ও জীবনযাত্রার ব্যয় আলাদা; ফলে শিক্ষার্থী নিজের প্রোফাইল, বাজেট ও ক্যারিয়ারের লক্ষ্য অনুযায়ী দেশ বেছে নিতে পারেন। ইঞ্জিনিয়ারিং, কম্পিউটার সায়েন্স, এআই, ডেটা সায়েন্স, বিজনেস থেকে শুরু করে আর্টস—প্রায় সব ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ডিগ্রির সুযোগ রয়েছে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকায় মেইলে ইন্টার্নশিপ ও গবেষণার সুযোগও। বাড়তি পাওনা শেনজেনভুক্ত দেশে পড়লে ছুটিতে ইউরোপের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত ঘুরে দেখার বহুসাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা।

কোন দেশ কার জন্য: জার্মানির সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ প্রোগ্রামে টিউশন ফি নেই বা খুবই কম। ইঞ্জিনিয়ারিং, অটোমোটিভ, কম্পিউটার সায়েন্স ও রিনিউয়েবল এনার্জিতে বিশেষ শক্তিশালী; রয়েছে ড্যাড স্কলারশিপও। তবে ব্লকড অ্যাকাউন্ট, আবাসন ও বীমার খরচ আগেই হিসাব করা জরুরি। ফ্রান্স বিজনেস, ম্যানেজমেন্ট, ফ্যাশন ও হসপিটালিটি সাবজেক্টের জন্য সুপরিচিত; রয়েছে খ্যাতনামা গ্রাঁদ একোল ও আইফেল এক্সিলেন্স স্কলারশিপ।

ফিনল্যান্ড ও সুইডেন আধুনিক শিক্ষা, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের দেশ। আইসিটি, ডেটা সায়েন্স ও সাসটেইনেবিলিটিতে আকর্ষণীয় প্রোগ্রামের পাশাপাশি রয়েছে স্কলারশিপ ও টিউশন ছাড়। তবে জীবনযাত্রার ব্যয় তুলনামূলক বেশি। নেদারল্যান্ডসে বিপুলসংখ্যক ইংরেজি মাধ্যমের প্রোগ্রাম বড় আকর্ষণ। তবে নন-ইইউ শিক্ষার্থীদের টিউশন ও আবাসন ব্যয় বেশি; বড় শহরে বাসস্থান পাওয়াও চ্যালেঞ্জিং। ইতালিতে রিজিওনাল ও ইউনিভার্সিটি স্কলারশিপের সুবাদে কম খরচে পড়া সম্ভব। হাঙ্গেরির স্টাইপেন্ডিয়াম হাঙ্গারিকাম স্কলারশিপে মেলে টিউশন, মাসিক ভাতা, আবাসন সহায়তা ও স্বাস্থ্য বীমা। এছাড়া ইইউর অর্থায়নে ইরাসমাস মুন্ডাস জয়েন্ট মাস্টার্সে এক আবেদনেই একাধিক দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ মেলে; সঙ্গে টিউশন, ভাতা ও ভ্রমণ ব্যয়। প্রতিযোগিতা তীব্র হলেও শক্তিশালী প্রোফাইল থাকলে এটি সোনার হরিণ ধরার মতো সুযোগ।

পড়াশোনা শেষে কী হবে: দেশ নির্বাচনের সময় অনেকে যে প্রশ্নটি এড়িয়ে যান—ডিগ্রি শেষে কী হবে? ইউরোপের অনেক দেশই স্নাতক শেষে চাকরি খোঁজার জন্য নির্দিষ্ট মেয়াদের ‘স্টে-ব্যাক’ বা জব-সিকার ভিসার সুযোগ দেয়। আবার কিছু দেশে স্থানীয় ভাষা জানা চাকরির বাজারে বড় ভূমিকা রাখে। তাই পড়াশোনার পাশাপাশি স্থানীয় ভাষার প্রাথমিক দক্ষতা অর্জন, ইন্টার্নশিপ ও নেটওয়ার্কিং—তিনটি বিষয়ে শুরু থেকেই মনোযোগী হলে ক্যারিয়ারের পথ অনেক মসৃণ হয়।

ভিসা রেশিও নিয়ে ভুল ধারণা

শুধু কথিত ভিসা রেশিও দেখে দেশ নির্বাচন ঠিক নয়। ভিসার সিদ্ধান্ত নির্ভর করে একাডেমিক প্রোফাইল, আর্থিক সক্ষমতা, অর্থের উৎস, স্টাডি গ্যাপ, ভাষা দক্ষতা ও স্টাডি প্ল্যানের বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর। তাই ‘৯০-৯৫ শতাংশ ভিসা সাকসেস’ ধরনের চটকদার প্রচারণায় বিভ্রান্ত না হয়ে নিজের প্রোফাইলের সঙ্গে মানানসই প্রোগ্রাম বেছে নেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

প্রস্তুতি কীভাবে: ইনটেকের অন্তত ৮-১২ মাস আগে প্রস্তুতি শুরু করুন। সাধারণত প্রয়োজন হয় সার্টিফিকেট ও ট্রান্সক্রিপ্ট, পাসপোর্ট, সিভি, মোটিভেশন লেটার, আইইএলটিএস/টোফেল, রিকমেন্ডেশন লেটার এবং প্রোগ্রামভেদে পোর্টফোলিও বা রিসার্চ প্রপোজাল। ভর্তির পর আসে টিউশন ডিপোজিট, আবাসন ও ভিসার প্রস্তুতি। মনে রাখতে হবে, ডিগ্রি শেষে অনেক দেশ চাকরি খোঁজার ‘স্টে-ব্যাক’ ভিসা দেয়; স্থানীয় ভাষা, ইন্টার্নশিপ ও নেটওয়ার্কিংয়ে শুরু থেকেই মনোযোগী হলে ক্যারিয়ারের পথ মসৃণ হয়।

আবেদনকারীদের জন্য পরামর্শ: জনপ্রিয়তা নয়; নিজের বিষয়, বাজেট ও ক্যারিয়ার লক্ষ্যের সঙ্গে দেশের সামঞ্জস্য যাচাই করুন। টিউশনের পাশাপাশি মোট জীবনযাত্রার ব্যয় হিসাব করুন। স্কলারশিপের সময়সীমা প্রায়ই ইনটেকের অনেক আগে শেষ হয়—আগেভাগে প্রস্তুতি নিন। আর্থিক কাগজপত্র ও অর্থের উৎস স্বচ্ছ রাখুন; স্টাডি গ্যাপের যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা তৈরি রাখুন। ‘ভিসা গ্যারান্টি’র বিজ্ঞাপনে ভরসা নয়; পার্টটাইম কাজকে মূল অর্থায়নের উৎস ধরবেন না। দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার পরিকল্পনা মাথায় রেখেই দেশ ও বিষয় নির্বাচন করুন।

সঠিক তথ্য ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্তই সফল পরিকল্পনার মূল কথা। যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের মান, মোট ব্যয়, স্কলারশিপ ও ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার বিবেচনায় নিয়ে এগোবেন, তার জন্য ইউরোপের উচ্চশিক্ষা শুধু একটি বিদেশী ডিগ্রি নয়; হয়ে উঠবে আন্তর্জাতিক দক্ষতা, পেশাগত নেটওয়ার্ক ও বৈশ্বিক ক্যারিয়ার গড়ার ভিত্তি।

আরও