একাডেমিক চাপ যেভাবে সামলাবেন

একাডেমিক চাপ বা মানসিক ক্লান্তি কিন্তু কোনো একক ব্যর্থতা নয়, বরং আন্তর্জাতিক গবেষণাও বলছে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এমন স্ট্রেস অনুভব করা অত্যন্ত স্বাভাবিক।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুম, ক্যাফেটেরিয়ার কিংবা ক্যাম্পাসের কোনো এক কর্নারে আড্ডারত হাসিমাখা মুখগুলোকে দূর থেকে বেশ প্রাণবন্ত মনে হতে পারে। কিন্তু এ চঞ্চলতার আড়ালেই জমতে থাকে এক অদৃশ্য ক্লান্তি। সেমিস্টার ফাইনালের ব্যস্ততা, মিডটার্মের তোড়জোড়, প্রেজেন্টেশনের স্ক্রিপ্ট গোছানো, ৩.৫০+ সিজিপিএ ধরে রাখার প্রাণপণ লড়াই, আর তার ওপর মাথার ওপর ঝুলতে থাকা সেশনজট, টিউশন ফ্রি কিংবা চাকরির বাজারের দুশ্চিন্তা—বাংলাদেশের পাবলিক বা বেসরকারি যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে এ চিত্রটা অত্যন্ত চেনা। একের পর এক সামাজিক ও পারিবারিক প্রত্যাশার জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে শিক্ষা জীবনটাকে অনেক সময় এক হাঁসফাঁস লাগা দৌড় বলে মনে হয়।

এ একাডেমিক চাপ বা মানসিক ক্লান্তি কিন্তু কোনো একক ব্যর্থতা নয়, বরং আন্তর্জাতিক গবেষণাও বলছে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এমন স্ট্রেস অনুভব করা অত্যন্ত স্বাভাবিক। মূল বিষয় হলো এ চাপকে আপনি কীভাবে সামলাচ্ছেন।

চাপ চিনে নেয়াই প্রথম ধাপ

অনেক শিক্ষার্থী নিজের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার পরও বুঝতে পারেন না যে তারা চাপে আছেন, যতক্ষণ না পরিস্থিতি খারাপ হয়ে যায়। অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রবন্ধে বলা হয়েছে, ঘুমে সমস্যা, খিটখিটে মেজাজ বা কাজ ফেলে রাখার প্রবণতা বেড়ে যাওয়া—এ সংকেতগুলো খেয়াল করে আগেভাগেই সচেতন হওয়া জরুরি।¹ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ লক্ষণগুলো প্রায়ই পরীক্ষার ঠিক আগে বা ভাইভার আগের রাতে সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

সময়কে ভাগ করে নিন

যুক্তরাষ্ট্রের একটি শিক্ষা সহায়তা সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী, বড় কাজকে ছোট ছোট ধাপে ভাগ করে প্রতিটির জন্য আলাদা সময় বরাদ্দ করলে শেষ মুহূর্তের চাপ অনেকটাই কমে যায়।²আমাদের দেশে যেখানে একই সপ্তাহে একাধিক কোর্সের অ্যাসাইনমেন্ট আর প্রেজেন্টেশন একসঙ্গে জমা পড়ে, সেখানে প্ল্যানার বা ক্যালেন্ডার অ্যাপে ডেডলাইন আগে থেকে লিখে রাখা এবং প্রতিদিন অল্প অল্প করে এগোনো রাত জেগে সব একসঙ্গে শেষ করার চেষ্টার চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর।

নিজের সঙ্গে সদয় হন

ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয় শিকাগোর পরামর্শ সেবা কেন্দ্রের একটি নির্দেশনায় বলা হয়েছে, নিজের প্রতি কঠোর সমালোচনা মানসিক অবস্থাকে আরো খারাপ করে, আর নিজেকে কিছুটা ছাড় দেয়ার অভ্যাস বরং আত্মবিশ্বাস বাড়ায়।³ক্লাস টেস্ট, কুইজ, মিডটার্ম কিংবা ফাইনাল পরীক্ষা—একটা খারাপ ফল বা ভাইভায় একটা প্রশ্নের ভুল উত্তর মানেই পুরো ক্যারিয়ার শেষ নয়। এ বাস্তবতা মেনে নেয়া এবং নিজের ভুল থেকে শেখার মানসিকতা রাখা দীর্ঘমেয়াদে সাহায্য করে। একই সঙ্গে, যা নিয়ন্ত্রণ করা যায় না তা নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে নিজের প্রস্তুতি ও সময়ের ওপর মনোযোগ দেয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ।

ক্যাম্পাসের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের সহায়তা নিন

নিউ হ্যাম্পশায়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের মনস্তাত্ত্বিক পরামর্শ কেন্দ্রের পরামর্শ অনুযায়ী, পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত খাওয়া আর কিছুটা হাঁটাচলার মতো ছোট ছোট অভ্যাস চাপ সামলানোর ভিত্তি তৈরি করে, আর ক্যাম্পাসের স্টাডি গ্রুপ বা মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের পরামর্শ সেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ ব্যবহার করতে দ্বিধা করা উচিত নয়।⁴ বাংলাদেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন কাউন্সেলিং সেন্টার বা স্টুডেন্ট ওয়েলবিয়িং সেন্টার চালু হয়েছে, কিন্তু মানসিক সমস্যা নিয়ে সাহায্য চাওয়া দুর্বলতা—এ সামাজিক ভুল ধারণার কারণে অনেকেই সেই সুযোগ নিতে দ্বিধা করেন। অথচ শিক্ষকের অফিস আওয়ারে গিয়ে সমস্যা বোঝা বা সিনিয়রদের সঙ্গে স্টাডি গ্রুপ করাও একধরনের বাস্তব সহায়তা, যা অনেকেই অবহেলা করেন।

নিখুঁত হওয়ার চাপ থেকে বেরিয়ে আসুন

নিউ হ্যাম্পশায়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা সহায়তা সংস্থা বলছে, পরিপূর্ণতার পেছনে না ছুটে বাস্তবসম্মত লক্ষ্য ঠিক করা এবং ছোট সাফল্যকেও উদযাপন করা প্রয়োজন। আর একা লড়াই না করে বন্ধু, পরিবার বা শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে একটা সহায়তার বলয় তৈরি করাটাই দীর্ঘমেয়াদে চাপ সামলানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়। আমাদের সমাজে যেখানে ভালো সিজিপিএ সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি ধরা হয়, সেখানে "নিখুঁত হওয়ার এ ধারণাটা প্রতিষ্ঠা করা থেকে বেরিয়ে আসা আরো বেশি জরুরি।

সহপাঠ কার্যক্রমে অংশ নিন

পড়াশোনার একগুঁয়ে জীবন থেকে বের হতে না পারলেই অনেক সময় বেশি চাপ অনুভব হয়। তাই সহশিক্ষা ও বিনোদনমূলক কাজেও যুক্ত হতে পারেন। ক্যাম্পাসে সপ্তাহে অন্তত একদিন সহশিক্ষামূলক কার্যক্রমে সময় দিন হোক সেটি বিতর্ক, আবৃতি, সংগীত, স্পোর্টস কিংবা সাংস্কৃতিক সংগঠন। এতে নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয়ের পাশাপাশি মনের বিকাশ ও নতুন বন্ধুত্ব তৈরি হবে। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকলে যেমন ক্যাম্পাসে নিজের আলাদা পরিচিতি তৈরি হয়, তেমনি পুরো ক্যাম্পাসকেই এক সময় নিজের নতুন এক পরিবার হয়ে উঠবে।

শিক্ষা জীবনে পড়াশোনার চাপ হয়তো পুরোপুরি দূর করা যায় না, কিন্তু তাকে সামলানোর অভ্যাস গড়ে তোলা যায়। সময় ভাগ করা, নিজের প্রতি সদয় হওয়া, পর্যাপ্ত ঘুম-খাওয়া বজায় রাখা আর প্রয়োজনে সাহায্য চাইতে দ্বিধা না করা—এ সাধারণ অভ্যাসগুলোই একাডেমিক জীবনের অনিশ্চয়তার মধ্যে মানসিক স্থিতি ধরে রাখার মূল চাবিকাঠি।

আরও