শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন

শিক্ষার্থীরা দেশীয় ও বৈশ্বিক পর্যায়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখতে পারে

ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পিস অ্যান্ড কনফ্লিক্ট স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান।

ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পিস অ্যান্ড কনফ্লিক্ট স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান। তিনি ইউনিভার্সিটি অব নিউ ইংল্যান্ড থেকে হাইব্রিড পিসবিল্ডিংয়ে পিএইচডি এবং ইউনিভার্সিটি অব বার্গেন থেকে লোকপ্রশাসনে এমফিল ডিগ্রি অর্জন করেন। বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে গবেষণা ও নীতিগত পরামর্শমূলক কার্যক্রমেও যুক্ত তিনি। সম্প্রতি পিস অ্যান্ড কনফ্লিক্ট স্টাডিজ বিভাগে পড়াশোনা ও ক্যারিয়ারের নানা দিক নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে।সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শফিকুল ইসলাম

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিষয়ে পড়াশোনার প্রয়োজনীয়তা কতটা?

বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো, বিশেষত দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সংঘাত, মানবাধিকার লঙ্ঘন, দুর্নীতি, জলবায়ু সংকট, উগ্রবাদ, অভিবাসন সংকটসহ নানামুখী সমস্যা বিরাজমান। এ প্রেক্ষাপটে শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন অত্যন্ত সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয়। কারণ এটি শিক্ষার্থীদের শান্তির মূলনীতি, সংঘর্ষের কারণ (যেমন ইনকম্পেটিবল গোল) ও তা নিরসনে কৌশল (যেমন নন-অ্যাডভারসারিয়াল) সম্পর্কে তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক জ্ঞান প্রদান করে, যা দেশীয় এবং বৈশ্বিক পর্যায়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

চার বছরের কোর্সে কোন কোন বিষয়গুলো পড়ানো হয়?

চার বছরের আন্ডারগ্র্যাজুয়েট ও এক বছরের মাস্টার্স কোর্সে শিক্ষার্থীরা শান্তি ও সংঘর্ষবিষয়ক মৌলিক তত্ত্ব (যেমন পজিটিভ অ্যান্ড নেগেটিভ পিস, স্ট্রাকচারাল ভায়োলেন্স, পিস ডিভিডেন্ড, ডেমোক্রেটিক পিস থিওরি ইত্যাদি), মানবাধিকার, নিরাপত্তা, কূটনীতি, পরিবেশ, অভিবাসন, সশস্ত্র দ্বন্দ্ব, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি, গণমাধ্যম, শান্তি ও সংঘর্ষ, গবেষণা পদ্ধতি ইত্যাদি বিষয়ে পড়াশোনা করে। শিক্ষার্থীরা আন্তঃরাষ্ট্রীয় হতে গোষ্ঠীগত সংঘর্ষ ব্যবস্থাপনা, শান্তি বিনির্মাণ, শান্তিরক্ষা এবং জাতিসংঘের ভূমিকা সম্পর্কেও বিশদভাবে শিখে থাকে।

এ বিভাগে একজন শিক্ষার্থী কী ধরনের থিওরি ও প্র্যাকটিক্যাল স্কিল অর্জন করেন, যা তাদের ক্যারিয়ারে সাহায্য করে?

সাধারণভাবে ‘শান্তি’ বলতে আমরা অনেক সময় যুদ্ধের অনুপস্থিতি বা মানসিক প্রশান্তিকে বুঝি। তবে এ বিভাগের তাত্ত্বিক অবস্থান আরো বিস্তৃত ও গভীর। এখানে শেখানো হয় যুদ্ধের অনুপস্থিতিই কেবল শান্তি নয়। একটি সমাজে যুদ্ধ না থাকলেও সেখানে দুর্নীতি, বৈষম্য, দারিদ্র্য, লিঙ্গভিত্তিক নিপীড়ন (জেন্ডারড এপিস্টেমিক ইনজাস্টিস) যা কাঠামোগত সহিংসতা হিসেবে পাঠ করা হয়। তাই শুধু যুদ্ধ না থাকা ‘নেগেটিভ পিস’ বা নেতিবাচক শান্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। অন্যদিকে এসব কাঠামোগত সহিংসতা, বৈষম্য ও অবিচারের অনুপস্থিতিই বোঝায় ‘পজিটিভ পিস’ বা ইতিবাচক শান্তি। এ ভাবনাগুলোর মাধ্যমেই শান্তির ধারণাকে একটি তৃণমূল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ভিত্তিতে ব্যাখ্যা এবং গবেষণা করা হয়। এ বিভাগে শিক্ষার্থীরা শান্তি তত্ত্ব (যেমন পজিটিভ ও নেগেটিভ পিস), সংঘর্ষ বিশ্লেষণ, দ্বন্দ্ব ব্যবস্থাপনা এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জন করে। পাশাপাশি তারা নেগোসিয়েশন (আলোচনার কৌশল), মিডিয়েশন (মধ্যস্থতা), ফ্যাসিলিটেশন (সহায়ক ভূমিকা পালন) এবং কনফ্লিক্ট ম্যাপিংয়ের (সংঘর্ষের মানচিত্র তৈরি) মতো ব্যবহারিক দক্ষতাও অর্জন করে। এছাড়া শিক্ষার্থীরা গবেষণার কৌশল, রিপোর্ট লেখার পদ্ধতি, তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা এবং ডাটা বিশ্লেষণের দক্ষতা অর্জন করে, যা তাদের চাকরি বা উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক ভূমিকা রাখে।

ডিগ্রি অর্জনের পর দেশ ও বিদেশে কী ধরনের চাকরির সুযোগ বা ক্ষেত্র রয়েছে?

শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়নের গ্র্যাজুয়েটরা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক এনজিও, উন্নয়ন সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, কূটনৈতিক মিশন, জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা কার্যক্রম, মানবাধিকার সংস্থা, গণমাধ্যম এবং সরকারের বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কাজ করার সুযোগ পায়। অনেকেই আন্তর্জাতিক সংস্থায় পিস বিল্ডিং বা কনফ্লিক্ট ম্যানেজমেন্ট বিশেষজ্ঞ হিসেবেও কাজ করছে।

গ্র্যাজুয়েটরা কী ধরনের সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন? উল্লেখযোগ্য কয়েকজনের কথা যদি বলতেন।

আমাদের অনেক গ্র্যাজুয়েট বর্তমানে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা যেমন জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল, জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি; আন্তর্জাতিক এনজিও যেমন ব্র্যাক, অক্সফাম, সেভ দ্য চিলড্রেন; এবং দুর্নীতি দমন কমিশন, হিউম্যান রাইটস কমিশন, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, এমনকি সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। অনেকেই আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন এবং শিক্ষকতা পেশাকে বেছে নিয়েছেন। উল্লেখযোগ্য কয়েকজন গ্র্যাজুয়েটের মধ্যে রয়েছেন হিউম্যান রাইটস কমিশনের ডিরেক্টর কাজী আরফান আশিক, জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের অ্যাডোলেসেন্ট ও ইয়ুথ প্রজেক্টের দায়িত্বে হাবিবুর রহমান, জর্ডানে ইউএন মাইগ্রেশনের লেবার মাইগ্রেশন ও সোশ্যাল ইনক্লুশন ইউনিটে হৃত্বিকা বড়ুয়া। এছাড়া বিআইআইএসএসের গবেষণা কর্মকর্তা মুহাম্মদ মাজেদুল হক, স্বর্ণালী চন্দ বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশন, বার্মিংহামে প্রধান সহকারী হাইকমিশন হিসেবে কর্মরত আছেন। যুক্তরাষ্ট্রের জুনাইতা ইনস্টিটিউট ফর পিস অ্যান্ড কনফ্লিক্ট স্টাডিজে ডিরেক্টর ড. জিয়া হক, অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ড. অনুরাগ চাকমা সুনামের সঙ্গে কাজ করছেন।

এ বিষয়ে পড়াশোনার জন্য শিক্ষার্থীদের কোন ধরনের মানসিক প্রস্তুতি বা দক্ষতা থাকা প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?

শিক্ষার্থীদের উদার দৃষ্টিভঙ্গি, ক্রিটিক্যাল থিংকিং, বিশ্লেষণী দক্ষতা এবং আন্তঃব্যক্তিক যোগাযোগে পারদর্শিতা থাকা জরুরি। পাশাপাশি লিখন, গবেষণা এবং দলগত কাজে আগ্রহ ও দক্ষতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যুদ্ধে হয়তো একা লড়াই করা যায়, কিন্তু শান্তি গঠনের জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত প্রয়াস। শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে সহনশীলতা, সহমর্মিতা এবং ভিন্নমত গ্রহণ করার মানসিক প্রস্তুতি অপরিহার্য।

আরও