শুধু ইউরোপে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় প্রোগ্রাম নির্বাচন করলে সফলতার সম্ভাবনা কমে যায়

ড. মো. আশিকুর রহমান, ইরাসমাস মুন্ডাস অ্যাসোসিয়েশনের (ইএমএ) সাবেক প্রেসিডেন্ট।

তিনি ইরাসমাস মুন্ডাস জয়েন্ট মাস্টার্স স্কলারশিপের একজন প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের উচ্চশিক্ষা ও স্কলারশিপ প্রচারে এশিয়ায় পরিচিত একটি মুখ। বর্তমানে তিনি এশিয়া অঞ্চলের ইরাসমাস প্লাস ন্যাশনাল ফোকাল পয়েন্টসের আঞ্চলিক ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শফিকুল ইসলাম

ইউরোপের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা এবং সেখানকার একাডেমিয়া বাংলাদেশকে কোন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে?

বাংলাদেশকে একটি সম্ভাবনাময় এবং দ্রুত অগ্রসরমাণ দেশ হিসেবে দেখেন। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা সাধারণত পরিশ্রমী, প্রতিযোগিতামুখী, নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে সক্ষম এবং বিজ্ঞান, প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি, জনস্বাস্থ্য, উন্নয়ন অধ্যয়ন ও সামাজিক বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভালো করছে। ইউরোপের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশী শিক্ষার্থী ও গবেষকদের ইতিবাচক উপস্থিতিও এখন দৃশ্যমান। তবে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় অনেক ক্ষেত্রে মুখস্থনির্ভরতা বেশি এবং স্বাধীন গবেষণা, সমালোচনামূলক চিন্তা, একাডেমিক লেখালেখি ও সমস্যা সমাধানভিত্তিক শিক্ষার সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত। ইউরোপীয়ান প্রতিষ্ঠানগুলো তাই শুধু ভালো ফল নয়; একজন আবেদনকারীর গবেষণার সম্ভাবনা, সৃজনশীলতা, যোগাযোগের দক্ষতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশে কাজ করার প্রস্তুতিও মূল্যায়ন করে।

একজন বাংলাদেশী আবেদনকারী কীভাবে তার প্রোফাইল সাজালে ইরাসমাস মুন্ডাস স্কলারশিপ পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে?

প্রথম কাজ হলো নিজের শিক্ষা, অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্যের সঙ্গে যথাযথভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রোগ্রাম নির্বাচন করা। শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিতি বা ইউরোপে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে প্রোগ্রাম নির্বাচন করলে সফলতার সম্ভাবনা কমে যায়। ভালো সিজিপিএ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, তবে এটিই একমাত্র বিবেচ্য বিষয় নয়। গবেষণা, থিসিস, প্রকাশনা, ইন্টার্নশিপ, চাকরি, স্বেচ্ছাসেবা কিংবা বাস্তব প্রকল্পে কাজের অভিজ্ঞতা থাকলে সেগুলো ফলাফলসহ তুলে ধরতে হবে। দুর্বল সিজিপিএ থাকলে পরবর্তী সময়ের উন্নতি, প্রাসঙ্গিক কাজ, গবেষণা বা বিশেষ দক্ষতার মাধ্যমে তা কিছুটা ভারসাম্যপূর্ণ করা সম্ভব। এসওপি বা মোটিভেশন লেটারে অতীতের অভিজ্ঞতা, নির্বাচিত প্রোগ্রাম এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মধ্যে পরিষ্কার সংযোগ থাকতে হবে। একই লেখা সামান্য পরিবর্তন করে সব প্রোগ্রামে পাঠানো উচিত নয়।

প্রায়ই শিক্ষার্থীরা টেক্সটবুককেন্দ্রিক সিজিপিএ ও এক্সট্রা-কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিসের মধ্যে সামঞ্জস্য রাখতে হিমশিম খায়। স্কলারশিপ নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোনটিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়?

এর কোনো সর্বজনীন উত্তর নেই, কারণ প্রতিটি ইরাসমাস মুন্ডাস প্রোগ্রামের নিজস্ব নির্বাচন নীতি ও স্কোরিং পদ্ধতি রয়েছে। সাধারণভাবে সিজিপিএ একজন শিক্ষার্থীর একাডেমিক ভিত্তি, ধারাবাহিকতা এবং নির্দিষ্ট বিষয়ে পড়াশোনার সক্ষমতার প্রধান প্রমাণ। অন্যদিকে প্রাসঙ্গিক কো/এক্সট্রা-কারিকুলার কার্যক্রম তার নেতৃত্ব, যোগাযোগ, দলগতভাবে কাজ করা এবং সামাজিক দায়িত্ববোধের পরিচয় দেয়। তবে শুধু অনেকগুলো সংগঠনের সদস্য হওয়া বা অসংখ্য সনদ সংগ্রহ করা বিশেষ সুবিধা দেয় না। বরং এক বা দুটি কার্যক্রমে দীর্ঘমেয়াদি সম্পৃক্ততা, নির্দিষ্ট দায়িত্ব এবং দৃশ্যমান ফলাফল বেশি মূল্যবান। শিক্ষার্থীদের মূল একাডেমিক রেজাল্ট ঠিক রেখে গবেষণা, ইন্টার্নশিপ, স্বেচ্ছাসেবা বা নেতৃত্বের মতো প্রাসঙ্গিক কাজে যুক্ত হওয়া উচিত। সংখ্যার চেয়ে কাজের মান ও প্রাসঙ্গিকতাই এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

অনেক শিক্ষার্থীর সিজিপিএ ভালো থাকা সত্ত্বেও একটি দুর্বল এসওপির কারণে আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়। একটি শক্তিশালী এসওপি লেখার মূল উপাদানগুলো কী কী?

এসওপিতে পাঁচটি প্রশ্নের পরিষ্কার উত্তর থাকতে হবে—আমি কে, কী করেছি, কেন এ নির্দিষ্ট প্রোগ্রামে পড়তে চাই, কেন আমি এ প্রোগ্রামের জন্য উপযুক্ত এবং ডিগ্রি শেষে অর্জিত জ্ঞান কীভাবে কাজে লাগাব। শুধু ‘ইউরোপে পড়া আমার স্বপ্ন’ বা ‘এ বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বসেরা’—এ ধরনের সাধারণ বক্তব্য যথেষ্ট নয়। নিজের শিক্ষা, গবেষণা, পেশাগত অভিজ্ঞতা বা কোনো বাস্তব সমস্যার সঙ্গে আগ্রহের ক্ষেত্রটি যুক্ত করতে হবে। নির্বাচিত প্রোগ্রামের নির্দিষ্ট কোর্স, বিশেষায়ন, গবেষণার সুযোগ, অংশীদার বিশ্ববিদ্যালয় ও মোবিলিটি কাঠামো কীভাবে নিজের লক্ষ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত, সেটিও ব্যাখ্যা করতে হবে। ভাষা হতে হবে স্বাভাবিক ও ব্যক্তিগত; অপ্রয়োজনীয় আবেগ, অতিরঞ্জিত দাবি, কপি করা বক্তব্য এবং প্রমাণহীন অর্জন পরিহার করতে হবে।

রিকমেন্ডেশন লেটারের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের কোন বিষয়ে নজর দেয়া উচিত?

এমন শিক্ষক, গবেষণা সুপারভাইজার বা পেশাগত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে নির্বাচন করতে হবে, যিনি আবেদনকারীকে ভালোভাবে চেনেন এবং তার যোগ্যতা সম্পর্কে নির্দিষ্ট উদাহরণ দিতে পারবেন। কেবল একজন উচ্চপদস্থ ব্যক্তির কাছ থেকে সাধারণ একটি রিকমেন্ডেশন লেটার নেয়ার চেয়ে পরিচিত শিক্ষকের বিস্তারিত ও প্রমাণনির্ভর রিকমেন্ডেশন লেটার অনেক বেশি কার্যকর। রেফারিকে যথেষ্ট সময় দিয়ে হালনাগাদ সিভি, ট্রান্সক্রিপ্ট, এসওপি, আবেদন করা প্রোগ্রামের বিবরণ এবং জমা দেয়ার সময়সীমা জানাতে হবে। একটি ভালো রিকমেন্ডেশন লেটারে শিক্ষার্থীর একাডেমিক দক্ষতা, গবেষণার সক্ষমতা, দায়িত্বশীলতা, নেতৃত্ব, দলগত কাজ এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সম্পর্কে বাস্তব উদাহরণ থাকা উচিত। সম্ভব হলে রেফারি আবেদনকারীকে তার অন্য শিক্ষার্থীদের তুলনায় কোথায় অবস্থান করেন, সেটিও উল্লেখ করতে পারেন।

যারা ইউরোপে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখছেন, তাদের উদ্দেশ্যে আপনার বিশেষ পরামর্শ কী?

শেষ মুহূর্তে আবেদন শুরু না করে অন্তত তিন-পাঁচ মাস আগে প্রস্তুতি নেয়া উচিত। প্রথমে নিজের শিক্ষা, অভিজ্ঞতা, আগ্রহ ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্যের ভিত্তিতে উপযুক্ত প্রোগ্রাম খুঁজতে হবে। এরপর ভাষা পরীক্ষা, ট্রান্সক্রিপ্ট, সিভি, এসওপি, রিকমেন্ডেশন লেটার এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য ডকুমেন্ট ধাপে ধাপে প্রস্তুত করতে হবে। শুধু সবচেয়ে পরিচিত কয়েকটি স্কলারশিপের পেছনে না ছুটে নিজের প্রোফাইলের সঙ্গে মানানসই একাধিক সুযোগে আবেদন করা উচিত। প্রতিটি আবেদন হতে হবে আলাদা, প্রোগ্রামভিত্তিক ও প্রমাণনির্ভর। অন্যের এসওপি নকল করা, কৃত্রিম অর্জন যুক্ত করা বা এজেন্সির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর। রিজেকশনকে ব্যর্থতা হিসেবে না দেখে আবেদন উন্নত করার সুযোগ হিসেবে নিতে হবে। সঠিক তথ্য, পরিকল্পিত প্রস্তুতি, উপযুক্ত প্রোগ্রাম নির্বাচন ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টাই সফলতার সবচেয়ে কার্যকর পথ।

আরও