শীতের সকাল। চারপাশ ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা। দৃষ্টিসীমা যেখানে থমকে দাঁড়ায় কয়েক হাত দূরেই, সেখানে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) একদল শিক্ষার্থীর গন্তব্য ক্যাম্পাসের পাশের গ্রাম সাজিয়ালী। লক্ষ্য—গাছ থেকে নামানো টাটকা খেজুরের রস। কথায় আছে, ‘যশোরের যশ, খেজুরের রস’। আর এ প্রবাদের সার্থকতা যেন খুঁজে পাওয়া যায় যবিপ্রবি ক্যাম্পাসের মেঠোপথে। যখন সূর্যের প্রথম কিরণ কুয়াশা ভেদ করে উঁকি দেয়, তখন হিমশীতল রসে চুমুক দেয়ার অনুভূতি শুধু রসনা তৃপ্তি নয়, বরং এক পরম মানসিক প্রশান্তি।
শিক্ষার্থীরা শীতের সকালে দলবেঁধে কাঁপতে কাঁপতে রওনা হন গাছিদের বাড়ির দিকে। সেখানে মাটির হাঁড়িতে জমা হওয়া অমৃত সমান রস ছেঁকে যখন গ্লাসে ঢালা হয়, তখন তৈরি হয় এক অন্যরকম আনন্দঘন পরিবেশ। রসপ্রেমী অনেক শিক্ষার্থী আগে থেকেই সঙ্গে করে নিয়ে যান মুড়ি। রসের সঙ্গে মুড়ি ভিজিয়ে খাওয়ার সেই চিরচেনা ঐতিহ্যে মেতে ওঠেন সবাই। এ মুহূর্তগুলোকে লেন্সবন্দি করতেও ভুল হয় না কারো।
কখনো কখনো এ আনন্দ মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। বন্ধুরা মিলে গভীর রাতে গাছ থেকে রস খাওয়ার যে রোমাঞ্চ, শিক্ষার্থীরা তার নাম দিয়েছেন ‘রস অভিযান’। যদিও এতে মাঝে মাঝে গাছিরা বিড়ম্বনায় পড়েন, তবুও শীতের রাতে বা ভোরে বন্ধুদের এ খুনসুটি ক্যাম্পাস জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গাছ থেকে রস নামানো, গাছিদের সঙ্গে গল্প করা আর কুয়াশামাখা পথে হাঁটা—সব মিলিয়ে শিক্ষার্থীরা যেন কিছুক্ষণের জন্য ফিরে যান তাদের ফেলে আসা শৈশবে। যবিপ্রবির এআইএস বিভাগের শিক্ষার্থী ইমরান তার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, ‘ভোরের কুয়াশা আর ঠাণ্ডা বাতাসের সঙ্গে টাটকা মিষ্টি রস খাওয়া এক অসাধারণ অনুভূতি। এটি আমাদের গ্রামবাংলার সংস্কৃতি, শৈশবের স্মৃতিগল্প এবং রস-গুড়, পিঠে-পুলি আর নারকেল দুধের ক্ষীরের কথা মনে করিয়ে দেয়।’
একইভাবে ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন বায়োসায়েন্স বিভাগের শিক্ষার্থী তনুশ্রী বিশ্বাস বলেন, ‘বন্ধুদের সঙ্গে ক্যাম্পাসের পাশের গ্রামের মেঠোপথে হেঁটে রস খেতে যাওয়ার অভিজ্ঞতাটা ছিল সত্যিই অসাধারণ। হালকা কুয়াশায় ঢাকা পথ আর বন্ধুদের হাসি-গল্প মিলিয়ে সকালটা হয়ে উঠেছিল প্রাণবন্ত। এমন ছোট ছোট মুহূর্তই ক্যাম্পাস জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতি।’
শুধু রস খেয়েই ক্ষান্ত হন না শিক্ষার্থীরা। গাছিদের কাছ থেকে তারা সংগ্রহ করেন খাঁটি পাটালি ও ঝোলা গুড়। শীতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ গুড়ের চাহিদাও বাড়ে। অনেকেই বাড়িতে পিঠাপুলি বানানোর জন্য যবিপ্রবি সংলগ্ন গ্রামগুলোর এ বিখ্যাত গুড় কিনে নিয়ে যান।
খেজুরের রসের স্বাদ অতুলনীয় হলেও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা কাঁচা রস পানের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। খোলা পরিবেশে সংগৃহীত রসে বাদুড়ের লালা বা অন্যান্য জীবাণু থেকে সংক্রমণের (যেমন নিপাহ ভাইরাস) ঝুঁকি থাকে। তাই রস সংগ্রহের সময় পাত্রে জাল বা ঢাকনা ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি। আশার কথা হলো যবিপ্রবি সংলগ্ন গ্রামের অনেক গাছি এখন স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে রস সংগ্রহের উদ্যোগ নিচ্ছেন। শিক্ষার্থীদেরও এক্ষেত্রে সচেতন থাকা প্রয়োজন।
যান্ত্রিক জীবনের ব্যস্ততা আর পড়াশোনার চাপের মাঝে যবিপ্রবির এ ‘রস উৎসব’ যেন এক চিলতে স্বস্তি। ক্যাম্পাসের সবুজ চত্বর আর পাশের গ্রাম্য প্রকৃতি মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় এ শীতের সকালে। এ খেজুরের রস ও বন্ধুত্বের মেলবন্ধনই যবিপ্রবির শীতকে করে তোলে অনন্য ও স্মৃতিময়।