১০ পিস জার্সি বিক্রি থেকে নিজস্ব প্রিন্টিং ও সুইং ফ্যাক্টরির মালিক

যে গল্পের শুরুটা হয়েছিল মাত্র ১০ পিস জার্সি দিয়ে, কঠোর পরিশ্রম ও অদম্য একাগ্রতায় সেই উদ্যোগ আজ এক সুদৃঢ় বাস্তবে রূপ নিয়েছে। 'VYLOR' এখন আর কেবল একটি অনলাইন পেজ নয়; আত্মপ্রকাশ করেছে একটি পূর্ণাঙ্গ উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান হিসেবে, গড়ে উঠেছে নিজস্ব প্রিন্টিং ফ্যাক্টরি। নিজের ব্র্যান্ডের মান নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অন্য মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও ভূমিকা রাখছেন তিনি।

আজকের যুগে দাঁড়িয়ে যখন কোনো তরুণ সফল উদ্যোক্তা হয়ে ওঠেন, তার পেছনের গল্পটা কখনোই নিছক মসৃণ হয় না। বরং প্রতিটি সাফল্যের নেপথ্যে থাকে অনিশ্চয়তা, ত্যাগ আর অদম্য মানসিকতার এক দীর্ঘ ইতিহাস। তেমনই এক অনুপ্রেরণার গল্প পোশাক ব্র্যান্ড 'VYLOR' (ভাইলোর) এবং এর পেছনের কারিগর রিয়াদ মজুমদারের।

শুরুটা বেশ কয়েক বছর আগের। তখন না ছিল শক্তিশালী কোনো নেটওয়ার্ক, না ছিল সুনির্দিষ্ট পরিচিতি। ছিল কেবল একবুক স্বপ্ন আর আকাশছোঁয়া আত্মবিশ্বাস। পরিচিত মানুষদের মধ্যে মাত্র ১০ পিস জার্সি বিক্রি করে পথচলা শুরু করেছিলেন রিয়াদ। প্রাতিষ্ঠানিক কোনো প্ল্যাটফর্ম কিংবা বড় পুঁজি না থাকলেও নিজের কাজের ওপর তাঁর ভরসা ছিল পূর্ণ।

পোশাক খাত নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে রিয়াদের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা ছিল তার অর্জিত অ্যাকাডেমিক শিক্ষা। বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি (বিইউএফটি)-তে অধ্যয়নের সুবাদে ফ্যাশন ও টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রির কারিগরি বিষয়গুলো তার নিখুঁতভাবে জানা ছিল। তবে দ্বিতীয় সেমিস্টার পেরিয়ে পঞ্চম সেমিস্টারে পা রাখার পর শুরু হয় আসল লড়াই—ভবিষ্যতের পথ কোন দিকে? চারপাশ থেকে আসতে থাকে পরিবার ও সমাজের চেনা সমীকরণের চাপ।

ঠিক সেই দ্বিধাদ্বন্দ্বের সময়েই অ্যাকাডেমিক জ্ঞানকে সম্বল করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে জন্ম নেয় একটি পেজ, নাম ‘VYLOR’। তবে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে শুরুর টানা ছয় মাস পেজটির কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছিল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট চুকানোর শেষভাগে এসে পেজটি থেকে প্রতি মাসে গড়ে ২০০ থেকে ৩০০ পিস পোশাক বিক্রি হতে শুরু করে। তবে দেশের সাধারণ আর দশজন তরুণের মতোই তৈরি পোশাক খাতের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনে তিনি চাকরির খাতায় নাম লেখান, যোগ দেন গার্মেন্টসে। কিন্তু এই বাস্তব কর্মক্ষেত্রেই লুকিয়ে ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ‘টার্নিং পয়েন্ট’।

ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করতে গিয়েই রিয়াদ অনুভব করেন—অন্যের অধীনে ধরাবাঁধা চাকরি তার স্বাধীন পরিকল্পনা ও স্বপ্নের সাথে মিলছে না। নিজের স্বকীয় কিছু গড়ে তোলার যে তীব্র ক্ষুধা মনে সুপ্ত ছিল, তা কেবল চাকরি দিয়ে মেটানো সম্ভব নয়।

চাকরির মায়া ত্যাগ করে ঘরে ফিরেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন রিয়াদ। পুরনো পেজ 'VYLOR'-কে নতুন করে পূর্ণোদ্যমে সচল করার মিশনে নামেন। শুরুর দিকে নানামুখী প্রতিকূলতা ও ধাক্কা আসলেও টেক্সটাইল শিক্ষার সঠিক প্রয়োগ এবং পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করে গ্রাহকের আস্থা অর্জনের নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যান। কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে নেমে পড়েন অলআউট যুদ্ধে।

যে গল্পের শুরুটা হয়েছিল মাত্র ১০ পিস জার্সি দিয়ে, কঠোর পরিশ্রম ও অদম্য একাগ্রতায় সেই উদ্যোগ আজ এক সুদৃঢ় বাস্তবে রূপ নিয়েছে। 'VYLOR' এখন আর কেবল একটি অনলাইন পেজ নয়; আত্মপ্রকাশ করেছে একটি পূর্ণাঙ্গ উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান হিসেবে, গড়ে উঠেছে নিজস্ব প্রিন্টিং ফ্যাক্টরি। নিজের ব্র্যান্ডের মান নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অন্য মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও ভূমিকা রাখছেন তিনি।

তবে রিয়াদের স্বপ্ন এখানেই থমকে নেই। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে এবার নতুন এক বড় পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে 'VYLOR'।

রিয়াদ বলেন, খুব শীঘ্রই চালু হতে যাচ্ছে আমার নিজস্ব সুইং (সেলাই) ফ্যাক্টরি। এর মাধ্যমে ডিজাইন থেকে শুরু করে প্রিন্টিং ও সুইং—পোশাক তৈরির পুরো প্রক্রিয়াটি নিজস্ব তত্ত্বাবধানে এনে আরো উন্নত মানে গ্রাহকের হাতে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।

আরও