তিন দশক পেরিয়ে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি

পাশ্চাত্যের সুসংহত শিক্ষাপদ্ধতি ও উদ্ভাবনা এবং প্রাচ্যের নীতি-নৈতিকতার মেলবন্ধন ঘটিয়ে এদেশের মধ্যবিত্তের জন্য সাশ্রয়ী বিনিয়োগে মানসম্মত শিক্ষা।

১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। রাজধানীর মহাখালীর একটি ভাড়া করা ভবনে মাত্র ২০ জন শিক্ষার্থী ও ছয়জন শিক্ষক নিয়ে অনাড়ম্বর যাত্রা শুরু করেছিল একটি উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তবে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। পাশ্চাত্যের সুসংহত শিক্ষাপদ্ধতি ও উদ্ভাবনা এবং প্রাচ্যের নীতি-নৈতিকতার মেলবন্ধন ঘটিয়ে এদেশের মধ্যবিত্তের জন্য সাশ্রয়ী বিনিয়োগে মানসম্মত শিক্ষা। তিন দশক পর, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি সেই স্বপ্নের চারাগাছটিকে পরিণত বৃক্ষে রূপান্তর করতে সক্ষম হয়েছে। আফতাবনগরের আট বিঘার কিছু বেশি জমিতে গড়ে ওঠা দৃষ্টিনন্দন স্থায়ী ক্যাম্পাসে বর্তমানে শিক্ষা গ্রহণ করছেন ১৬ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী। তাদের মেধা ও মনন গঠনে নিয়োজিত রয়েছেন চার শতাধিক প্রথিতযশা শিক্ষক। যাদের এক-তৃতীয়াংশ পিএইচডি ডিগ্রির অধিকারী। এখানে জেন্ডার ভারসাম্য স্পষ্ট; অমুসলিম শিক্ষক ও বিদ্যার্থীরা অবদান রাখছেন অকাতরে। ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির ৩০ বছরের এ অভিযাত্রা বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় খাতের এক স্মরণীয় ইতিহাস।

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচিতে (ইউএনডিপি) দীর্ঘ ১৩ বছর দায়িত্ব পালন শেষে দেশে ফেরেন অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন। তার নেতৃত্বে একদল দূরদর্শী শিক্ষানুরাগী অনুধাবন করেছিলেন, দেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা সুবিধা নিশ্চিত করা আবশ্যক। সেই সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির জন্ম।

ট্রাস্টি বোর্ডের প্রতিষ্ঠাতা এবং বর্তমান সভাপতি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, ‘মধ্যবিত্ত সমাজই গণতন্ত্র ও সমৃদ্ধির মেরুদণ্ড। আমরা চেয়েছিলাম এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করতে যেখানে আর্থিক সক্ষমতা নয়, শিক্ষার্থীদের মেধাই হবে প্রধান যোগ্যতা। বিশ্ববিদ্যালয়টির নামকরণের পেছনেও রয়েছে গভীর দর্শন—পশ্চিমের বিজ্ঞান ও গবেষণা প্রজ্ঞার সঙ্গে আগের মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন।’

মহাখালীর ভাড়া বাড়ি থেকে আফতাবনগরের সুবিশাল লাল ইটের স্থায়ী ক্যাম্পাসে স্থানান্তর ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। রামপুরা সেতুর কোল ঘেঁষে জহুরুল ইসলাম সিটিতে অবস্থিত আট বিঘার অধিক জমির ওপর নির্মিত পরিবেশবান্ধব লাল ইটের আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর ক্যাম্পাসটি সম্পূর্ণ করতে কোনো শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ক্যাম্পাস উন্নয়ন ফি বা সারচার্জ নেয়া হয়নি। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক ফরাসউদ্দিন বলেন, ‘আমরা অতিরিক্ত খরচ কমানো, অপচয় রোধ করা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা দিয়ে আমাদের ব্যয় সংকোচন করতে পেরেছি এবং উদ্বৃত্ত অর্থ দিয়ে স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছি। স্থপতি বন্ধুবর প্রয়াত বশিরুল হককে বিনম্র শ্রদ্ধা। বিদ্যা অর্জনে বিশ্বভুবন ছাড়িয়ে ঊর্ধ্বলোকে বিচরণ করতে পারার লোগোটি তৈরি করে দিয়ে কৃতার্থ করেছেন স্নেহভাজন এনায়েত কবির।’

ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির আফতাবনগরের এ ক্যাম্পাসে রয়েছে পর্যাপ্ত আলো-বাতাসসমৃদ্ধ ক্লাসরুম, বিশ্বমানের গবেষণাগার, সুবিশাল অডিটরিয়াম এবং ডিজিটাল সুবিধা সমৃদ্ধ লাইব্রেরি। প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে অত্যাধুনিক কম্পিউটার ল্যাব এবং প্রকৌশল গবেষণাগারগুলো শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক মানের হয়ে গড়ে ওঠার সুযোগ দিচ্ছে।

ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি কেবল শিক্ষার্থীর সংখ্যায় বাড়েনি, শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিতকরণে ধারাবাহিকভাবে নিজেদের ছাপ রেখে চলেছে। সময়ের সঙ্গে যুগোপযোগী কারিকুলাম তৈরি এবং অত্যাধুনিক কোর্সের অন্তর্ভুক্তি করেছে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড মেশিন লার্নিংয়ের মতো মাস্টার্স কোর্স চালু তার একটা বড় উদাহরণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ অর্জন করেছে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ের অ্যাক্রেডিটেশন বা স্বীকৃতি।

বিশ্ববিদ্যালয়টির বিভিন্ন একাডেমিক প্রোগ্রামের বৈশ্বিক মান ও শিক্ষার্থীদের পেশাগত উৎকর্ষ নিশ্চিত করছে বেশ কয়েকটি মর্যাদাপূর্ণ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। এর মধ্যে ‘অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল ফর বিজনেস স্কুলস অ্যান্ড প্রোগ্রামস’ (এসিবিএসপি) ব্যবসায় প্রশাসন ও অর্থনীতি বিভাগের আন্তর্জাতিক গুণগত মান নিশ্চিত করছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার মানদণ্ডে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই), ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) এবং সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং প্রোগ্রামের বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করছে ‘বোর্ড অব অ্যাক্রেডিটেশন ফর ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনিক্যাল এডুকেশন’ (বিএইটিই)।

একইভাবে, ‘ফার্মেসি কাউন্সিল’ ও ‘ল কাউন্সিল’-এর অনুমোদন বি ফার্ম ও এলএলবি ডিগ্রিধারী শিক্ষার্থীদের সরাসরি কর্মক্ষেত্রে পেশাগত যোগ্যতার আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করছে। এছাড়া চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্সি (সিএ), অ্যাসোসিয়েশন অব চার্টার্ড সার্টিফায়েড অ্যাকাউন্ট্যান্টস (এসিসিএ), ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএমএবি) এবং ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড সেক্রেটারিজ অব বাংলাদেশের (আইসিএসবি) মতো শীর্ষস্থানীয় পেশাদার সংস্থাগুলোর সঙ্গে ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের কার্যকর সংযোগ শিক্ষার্থীদের উচ্চতর প্রফেশনাল ক্যারিয়ারের পথ সুগম করছে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের চড়া টিউশন ফি যখন অনেক শিক্ষার্থীর স্বপ্নের পথ রুদ্ধ করে দেয়, তখন ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি হাঁটছে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী পথে। প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় ট্রাস্টি বোর্ড সিদ্ধান্ত নেয়—পরিচালনগত কোনো উদ্বৃত্ত থাকলে তা ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার না করে সরাসরি শিক্ষার্থী কল্যাণ ও গবেষণায় পুনর্বিনিয়োগ করা হবে।

বার্ষিক বাজেটের প্রায় ১২-১৩ শতাংশ অর্থ মেধা ও অন্যান্য বৃত্তিতে ব্যয় করা হয়। ভর্তি পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বরধারী এবং এসএসসি ও এইচএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের শতভাগ টিউশন ফি মওকুফ করা হয়। দেশের ৬৪টি জেলা থেকেই একজন করে অসচ্ছল মেধাবী শিক্ষার্থীকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পড়াশোনার পাশাপাশি থাকা-খাওয়ার খরচ দেয়া হয়। মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ২০ শতাংশ (প্রতি ৫ জনে ১ জন) কোনো না কোনো ধরনের আর্থিক সুবিধা পান।

ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি কেবল সনদ প্রদানের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ মানসিক ও সামাজিক ক্ষমতায়ন কেন্দ্র। শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ ও পারিবারিক সংকট উত্তরণে অভিজ্ঞ সাইকোলজিস্ট দ্বারা সম্পূর্ণ গোপনীয়তা রক্ষা করে সেবা প্রদান করে মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সিলিং সেন্টার। রাজনীতিমুক্ত নিরাপদ পরিবেশে শিক্ষা অর্জন করতে পারে শিক্ষার্থীরা। রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় চলাকালীন সার্বক্ষণিক অভিজ্ঞ চিকিৎসক ও অ্যাম্বুলেন্সসহ সরঞ্জামাদি দিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসার সুব্যবস্থা। সহশিক্ষা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে কৃষি, শিল্প, পরিবেশ, ডিবেটিং, স্পোর্টস, কালচারাল ক্লাবসহ প্রায় সব খাতের ২৩ ক্লাব শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব ও দলগত কাজের দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে।

৩০ বছরের পথচলায় ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি প্রমাণ করেছে—স্বচ্ছতা, সততা এবং জনকল্যাণমূলক মূল্যবোধ বজায় রেখেও কীভাবে শিক্ষা ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা যায়। এখানকার শিক্ষার্থী আজ ছড়িয়ে আছেন দেশ-বিদেশের খ্যাতনামা নানা প্রতিষ্ঠানে, বহুজাতিক সংস্থায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে কিংবা গবেষণাগারে।

আরও