বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখার মধ্য দিয়েই সিংহভাগ শিক্ষার্থীর জীবনে আসে প্রথম প্রত্যক্ষ আর্থিক স্বাধীনতা। ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট আর বন্ধুত্বের আড্ডার পাশাপাশি যে বিষয়টি সবচেয়ে প্রভাব ফেলে তা হলো অর্থ ব্যবস্থাপনা। পরিবারের পাঠানো পকেট মানি, নিজের টিউশনের আয় বা পার্টটাইম কাজের বেতন—সঠিক পরিকল্পনার অভাবে মাস শেষ হওয়ার আগেই অনেককে পড়তে হয় আর্থিক সংকটে। বিশ্বখ্যাত ফাইন্যান্সিয়াল বিশেষজ্ঞদের মতে, আর্থিক স্বাধীনতা কোনো এককালীন ঘটনা নয়—এটি একটি চর্চাজাত অভ্যাস। অর্থাৎ অর্থ ব্যবস্থাপনার বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত চর্চার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে। তাই ক্যারিয়ারে পা ফেলার আগেই বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই পার্সোনাল ফাইন্যান্স ব্যবস্থাপনার অভ্যাস রপ্ত করা উচিত।
প্রতিটা টাকার গন্তব্য আগেই ঠিক করুন
আমেরিকান অর্থবিষয়ক লেখক ডেইভ র্যামসির জনপ্রিয় ধারণা হলো মাস শুরুর আগেই আয়ের প্রতিটা টাকার হিসাব নির্দিষ্ট খাতে বরাদ্দ করে ফেলা। প্রথমে মাসে কত টাকা আসছে—পকেট মানি, টিউশন, বৃত্তি বা ফ্রিল্যান্সিং থেকে—তা ডায়েরি বা মোবাইল নোটে স্পষ্ট লিখুন। এরপর সম্ভাব্য সব খরচ বাদ দিয়ে অবশিষ্ট অংক যেন ‘শূন্য’ না হয়—অর্থাৎ ব্যাংক-ওয়ালেট খালি করা নয়, বরং বাড়তি টাকাটুকুও সঞ্চয় করুন।
শিক্ষার্থীদের জন্য ৫০/৩০/২০ ফ্রেমওয়ার্ক
অর্থনীতিবিদ এলিজাবেথ ওয়ারেনের জনপ্রিয় এ বাজেট সূত্র মেস বা হল জীবনের প্রেক্ষাপটে দারুণ কাজে আসতে পারে। এলিজাবেথ ওয়ারেন ও তার মেয়ে ২০০৫ সালের ‘অল ইয়োর ওর্থ: দ্য আলটিমেট লাইফটাইম মানি প্ল্যান’ বই লেখেন। বইটির মাধ্যমেই তারা বিশ্বজুড়ে অত্যন্ত জনপ্রিয় বাজেট নিয়ম ৫০/৩০/২০’ ছড়িয়ে দেন। আয়ের ৫০ শতাংশ প্রয়োজনীয় খরচে, ৩০ শতাংশ ঐচ্ছিক খরচে ও ২০ শতাংশ সঞ্চয়ে রাখা। শিক্ষার্থীরা ৫০ শতাংশ অত্যাবশ্যকীয় খরচ যেমন মেস/হল ভাড়া, খাবার, বই-নোট, যাতায়াত ও মোবাইল রিচার্জে ব্যবহার করতে পারেন। এ খাত বাদ দিয়ে চলা অসম্ভব। আর ৩০ শতাংশ ব্যক্তিগত ইচ্ছা ও সামাজিকতা খাতে যেমন টিএসসি বা ক্যাফেটেরিয়ার আড্ডা, ঘুরতে যাওয়া, ওটিটি সাবস্ক্রিপশন বা পোশাক কেনা। এটি শখের খরচ, প্রয়োজনীয় নয়। বাকি ২০ শতাংশ সঞ্চয় ও ভবিষ্যতের জন্য রাখুন। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি বা ভবিষ্যতের মূলধনের জন্য মাসের শুরুতেই এ অংশ সরিয়ে রাখুন। শুরুতে ২০ শতাংশ সঞ্চয় কঠিন মনে হলে অল্প দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে বাড়াতে পারেন।
আবেগপ্রবণ কেনাকাটা ও ৭২ ঘণ্টার নিয়ম
আচরণগত অর্থনীতি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অধিকাংশ অনাবশ্যক খরচ হয় হঠাৎ তৈরি হওয়া আবেগের বশে। ক্যাম্পাসের বাইরে বা অনলাইনে কোনো অনাবশ্যক জিনিস পছন্দ হলে সঙ্গে সঙ্গে না কিনে নিজেকে ৭২ ঘণ্টা সময় দিন—তিনদিন পর সেই জিনিসের প্রতি ঝোঁক অনেকটাই কমে যায়। অনেক ক্ষেত্রেই মোবাইলে বিভিন্ন রিলস ও শর্ট ভিডিও নানা অপ্রয়োজনীয় জিনিসে প্রলুব্ধ করে। তাই নিজের আবেগ সংবরণে সময় নিন। এর পাশাপাশি প্রতিদিনের ছোট খরচ—অপ্রয়োজনীয় স্ন্যাকস, বারবার চা খাওয়া, কিংবা শহরে হলে রাইড শেয়ারিংয়ের বাড়তি ভাড়া মাস শেষে বড় ঘাটতি তৈরি করে। বিকাশ বা নগদের স্টেটমেন্ট নিয়মিত দেখে এসব ব্যয়ও চিহ্নিত করা জরুরি।
‘লাইফস্টাইল ক্রিপ’ থেকে সতর্ক থাকুন
আয় বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই খরচও বেড়ে যায়—অর্থনীতিতে একে বলে ‘লাইফস্টাইল ক্রিপ’। আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খরচ না বাড়িয়ে বরং সঞ্চয়ের হার বাড়ানো উচিত; অতিরিক্ত আয়ের অন্তত ৮০ শতাংশ সঞ্চয় বা স্কিল ডেভেলপমেন্টে যুক্ত করার অভ্যাস গড়ে তোলা ভালো।
জরুরি তহবিল, ডিপিএস ও নিজের জন্য বিনিয়োগ
আর্থিক নিরাপত্তার প্রথম শর্ত একটি জরুরি তহবিল। হঠাৎ অসুস্থতা, ল্যাপটপ-ফোন নষ্ট হওয়া বা টিউশন হাতছাড়া হওয়ার মতো পরিস্থিতিতে বন্ধুদের কাছে হাত না পেতে অন্তত দুই-তিন মাসের মৌলিক খরচের সমান টাকা আলাদা মোবাইল ব্যাংকিং বা সেভিংস অ্যাকাউন্টে রাখা উচিত। পাশাপাশি প্রতি মাসে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকার ছোট ডিপিএস চালু করলে সঞ্চয়ে একটি নিয়মতান্ত্রিক শৃঙ্খলা তৈরি হয়। এছাড়া ছাত্রজীবনে সবচেয়ে বেশি রিটার্ন দেয় নিজের দক্ষতায় করা বিনিয়োগ—ডাটা অ্যানালিটিক্স, ভাষা শেখা বা পেশাগত কোনো সার্টিফায়েড কোর্সে খরচ দীর্ঘমেয়াদে আয়ের সুযোগ বহু গুণ বাড়িয়ে দেয়।
বাড়তি আয়ের বিকল্প উৎস
খণ্ডকালীন কাজ শিক্ষার্থীদের আর্থিক অবস্থা উন্নত করার একটি স্বীকৃত পথ। যেমন টিউশনি, গ্রাফিক ডিজাইন বা ফ্রিল্যান্সিং, গবেষণা সহকারীর কাজ, কিংবা ফাঁকা সময়ে বিশ্বাসযোগ্য প্লাটফর্মে অনলাইন মাইক্রো-টাস্ক। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে খণ্ডকালীন কাজের সুযোগ তেমন না থাকলেও বাড়তি আয়ের জন্য অনলাইন প্লাটফর্ম ফেসবুক ব্যবহার করে অনেকেই নিজের ছোট ব্যবসা পরিচালনা করে ভালো আয় করছেন। এতে নিজের খেয়াল-খুশিমতো কাজ করা যায়, নির্দিষ্ট টাই ফ্রেমে কাজ করার বাড়তি চাপও থাকে না। অনেক শিক্ষার্থীই ছোট পরিসরে অনলাইনে ব্যবসা থেকে স্বাবলম্বী হয়ে পরিবারেরও হাল ধরেছেন। হয়েছেন বড় উদ্যোক্তা।
ঋণ নিয়ে সতর্কতা
ঋণ এড়িয়ে চলা জরুরি, কারণ তা ঋণের দুষ্টচক্রে ফেলে দিতে পারে। বন্ধুদের কাছ থেকে ঘন ঘন ধার নেয়া অনেকের অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়। এ ধার করার প্রবণতাই এক সময়ে নির্দিষ্ট ব্যয়ের সীমা থেকে বেরিয়ে বাজেটের অতিরিক্ত ব্যয়ের চর্চা তৈরি হয়। মাস শেষে আবার এ ধারের টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে শুরু হয় টানাপড়েন। তাই কোনোভাবেই বন্ধু কিংবা ক্যাম্পাসের বড় ভাইয়ের থেকে টাকা ধার করে চলার অভ্যাস তৈরি করা উচিত নয়। এতে নিজের ব্যক্তি ইমেজ খারাপের পাশাপাশি অন্যের ওপর নির্ভরশীলতাও বাড়তে থাকে।