একই সঙ্গে জৈব সার ও ছত্রাকনাশক

বাকৃবি গবেষকদের পরিবেশবান্ধব উদ্ভাবন ‘পিজি ট্রাইকোডার্মা’

পিজি ট্রাইকোডার্মা সম্পর্কে প্রধান গবেষক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শাহজাহান মঞ্জিল জানান, এটি দেশীয় উৎসের ট্রাইকোডার্মা অ্যাসপেরেলাম থেকে সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি।

বর্তমানে দেশে ব্যবহৃত মোট বালাইনাশকের প্রায় ৪৫-৪৬ শতাংশই রাসায়নিক ছত্রাকনাশক। এসব ছত্রাকনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার শুধু ক্ষতিকর ছত্রাকই নয়, মাটিতে থাকা উপকারী অণুজীব ও ছত্রাকও ধ্বংস করে। ফলে পরিবেশ, মাটির স্বাস্থ্য ও জনস্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এ বাস্তবতায় পরিবেশবান্ধব ও টেকসই বিকল্প হিসেবে, দীর্ঘ ২৫ বছরের নিরবচ্ছিন্ন গবেষণার পর বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষক উদ্ভাবন করেছেন ‘পিজি ট্রাইকোডার্মা’, যা একই সঙ্গে জৈব ছত্রাকনাশক ও জৈব সার হিসেবে কাজ করে।

পিজি ট্রাইকোডার্মা সম্পর্কে প্রধান গবেষক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শাহজাহান মঞ্জিল জানান, এটি দেশীয় উৎসের ট্রাইকোডার্মা অ্যাসপেরেলাম থেকে সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি। এতে প্রতি গ্রাম পণ্যে ন্যূনতম ২০ লাখ জীবন্ত ট্রাইকোডার্মা স্পোর রয়েছে। এটি বিভিন্ন ফসলের রোগ দমন, ফলন বৃদ্ধি, মাটির স্বাস্থ্য উন্নয়ন এবং মৎস্য খাতে পানির গুণগত মান উন্নত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।

তিনি আরো জানান, গবেষণার শুরুতে দেশের বিভিন্ন কৃষি-পরিবেশ অঞ্চল থেকে হাজার হাজার মাটি ও রাইজোস্ফিয়ার (ছত্রাকের স্পোর) নমুনা সংগ্রহ করা হয়। সেখান থেকে শতাধিক ট্রাইকোডার্মা ছত্রাক পৃথক করে তাদের কার্যকারিতা দীর্ঘদিন ধরে যাচাই-বাছাই করা হয়। পরবর্তী সময়ে সর্বাধিক কার্যকর, স্থিতিশীল ও বাংলাদেশের জলবায়ুর সঙ্গে অভিযোজিত ট্রাইকোডার্মা অ্যাসপেরেলাম নির্বাচন করে এর ভিত্তিতে বায়োফরমুলেশন তৈরি করা হয়। যেহেতু এটি দেশীয় উৎসের অণুজীব, তাই আমদানিনির্ভর বায়োপণ্যের তুলনায় এটি অধিক কার্যকর, টেকসই ও তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়বহুল হবে বলে আশা করছেন গবেষকরা।

গবেষণায় দেখা গেছে, এ জৈব ছত্রাকনাশক সব ধরনের ফসলেই কার্যকর। বিশেষ করে টমেটো, আলু, বেগুন, ঢেঁড়স, মরিচ, শসা, লাউ, কুমড়াসহ বিভিন্ন সবজি, ডালজাতীয় ফসল, চা ও পান চাষে এর ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। এসব ফসলে ফিউজারিয়াম উইল্ট, রুট রট, স্ক্লেরোটিয়াম ব্লাইট এবং পাতার দাগ রোগ সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে।

মাঠপর্যায়ের পরীক্ষায় টমেটোতে ৪০ থেকে ৭০ শতাংশ, আলুতে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ, ধানে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ, গমে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ এবং চা গাছে ৮০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত ফলন বৃদ্ধি লক্ষ করা গেছে। এছাড়া মরিচ ও ডালজাতীয় ফসলে বীজবাহিত ছত্রাকজনিত রোগ ৫০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত দমন করা সম্ভব হয়েছে বলে জানান তিনি।

কার্যকারিতার বিষয়ে অধ্যাপক মঞ্জিল বলেন, পিজি ট্রাইকোডার্মা উদ্ভিদের শিকড়ের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে, পুষ্টি গ্রহণের সক্ষমতা বাড়ায় এবং মাটির জৈবিক স্বাস্থ্য উন্নত করে। পাশাপাশি রাসায়নিক সারের প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে আনে এবং প্রাকৃতিক উপায়ে রোগ ও পোকামাকড় দমনে সহায়তা করে। সহজে প্রয়োগযোগ্য হওয়ায় এটি কৃষকদের জন্য সাশ্রয়ী ও ব্যবহারবান্ধব প্রযুক্তি।

পিজি ট্রাইকোডার্মা ২০০ গ্রাম, ৫০০ গ্রাম এবং এক কেজি পরিমাণে প্যাকেটজাত করে বিক্রি করা হয়। প্যাকেটজাত মূল্য ২০০ গ্রামে ২১০ টাকা, ৫০০ গ্রাম ৪৬৫ টাকা এবং এক কেজি ৯০০ টাকায় বিক্রি করা হয়।

গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রস্তাবিত পণ্যটি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) নির্ধারিত স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন ও নিবন্ধন প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে উদ্ভাবিত এ পরিবেশবান্ধব বায়োপণ্যগুলো কৃষকদের কাছে সহজলভ্য হবে এবং দেশের টেকসই কৃষি উন্নয়ন, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও রাসায়নিক বালাইনাশকের ব্যবহার হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

আরও