শিক্ষা, গবেষণা ও স্মৃতির ৬৬ বছর: কী ভাবছেন বাকৃবিয়ানরা

১ হাজার ২০০ একরের সুবিশাল সবুজে ঘেরা এ ক্যাম্পাস দেখতে দেখতে ৬৫ বছর পার করে পা রাখছে ৬৬ বছরে। আয়তনের দিক থেকে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এ বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে অধ্যয়নরত ৭ হাজার ৭৭৪ শিক্ষার্থী এবং প্রায় ৬৬ হাজার প্রাক্তন শিক্ষার্থী দেশে ও দেশের বাইরে সুনামের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন।

১৯৬১ সালের ১৮ আগস্ট ব্রহ্মপুত্র নদের পশ্চিম তীরে যাত্রা শুরু করেছিল দেশের প্রথম বিশেষায়িত কৃষি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি)। ১ হাজার ২০০ একরের সুবিশাল সবুজে ঘেরা এ ক্যাম্পাস দেখতে দেখতে ৬৫ বছর পার করে পা রাখছে ৬৬ বছরে। আয়তনের দিক থেকে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এ বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে অধ্যয়নরত ৭ হাজার ৭৭৪ শিক্ষার্থী এবং প্রায় ৬৬ হাজার প্রাক্তন শিক্ষার্থী দেশে ও দেশের বাইরে সুনামের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এ বিশেষ মুহূর্তে প্রিয় প্রাঙ্গণকে ঘিরে প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের আবেগ, প্রাপ্তি, অভিজ্ঞতা এবং ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা তুলে ধরেছেন বণিক বার্তার বাকৃবি প্রতিনিধি তাহমিনা সোনিয়া

খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের প্রধান বাতিঘর

‎আমার কাছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কেবল একটি উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, এটি দেশের খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের প্রধান বাতিঘর। কৃষি, প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য খাতে যুগান্তকারী গবেষণা এবং হাতে-কলমে শিক্ষার মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে বাকৃবির অবদান অনস্বীকার্য।

‎‘প্রকৃতি কন্যা’ খ্যাত এ সুবিশাল সবুজ ক্যাম্পাস আর কোল ঘেঁষে বয়ে চলা শান্ত ব্রহ্মপুত্রের রূপ প্রতিনিয়ত মুগ্ধ করে। পাশাপাশি শতভাগ আবাসিক ব্যবস্থা ও গবেষণার নিবিড় পরিবেশ বাকৃবিকে করেছে অনন্য।

‎এখানকার প্রাপ্তি কেবল শ্রেণীকক্ষেই সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সক্রিয় কার্যক্রমের মাধ্যমে নেতৃত্ব, দলগত কাজ, দায়িত্ববোধ ও যোগাযোগদক্ষতা অর্জনের সুযোগ পেয়েছি। প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান ও সহশিক্ষার এ মেলবন্ধন ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের প্রস্তুতির পাশাপাশি একজন সচেতন ও আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার শ্রেষ্ঠ প্রেরণা। গৌরবের ৬৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে প্রাণের বাকৃবি তার শ্রেষ্ঠত্বের ধারা অব্যাহত রেখে এগিয়ে যাক অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এ শুভকামনা।

মো. মুজাহিদুল ইসলাম রিফাত

শিক্ষার্থী, অ্যানিমেল হাজবেন্ড্রি অনুষদ

জীবন বদলে যাওয়ার সাক্ষী বাকৃবি

‎বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, আমার জীবনের এমন এক অধ্যায় যেখানে প্রাপ্তির পাশাপাশি কিছু না পাওয়ার গল্পও জড়িয়ে আছে। এখানে আসার আগে জীবনকে হয়তো একটু সহজভাবেই দেখতাম। বাকৃবি আমাকে শিখিয়েছে বাস্তবতা সবসময় নিজের ইচ্ছামতো হয় না। এ ক্যাম্পাসের সবুজের আড়ালে আমি পেয়েছি কিছু সুন্দর সম্পর্ক, অসংখ্য স্মৃতি, আবার কিছু কঠিন সময়, নীরব কষ্ট ও অপূর্ণতার সঙ্গেও পরিচিত হয়েছি। অনেক কিছু হারিয়ে, অনেক কিছু মেনে নিয়ে নিজেকে আরো শক্ত, ধৈর্যশীল ও আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছি। তাই বাকৃবি আমার কাছে শুধু ভালোবাসার স্মৃতি নয়, আমার বদলে যাওয়ারও সাক্ষী। কিছু কষ্ট হয়তো ভুলব না, তবে সেই কষ্টগুলোই আমাকে আজকের আমি হতে শিখিয়েছে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে প্রিয় বাকৃবির প্রতি রইল ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা।

খোশনূর ইয়াসমিন রত্না

শিক্ষার্থী, মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদ

‎আন্দোলন ও অধিকারসংক্রান্ত বিষয়ও তুলে ধরেছি লেখনীর মাধ্যমে

‎৬৬ বছরে পদার্পণ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি)। এ গৌরবময় প্রতিষ্ঠানের একজন প্রাক্তন শিক্ষার্থী হিসেবে আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন ছিল জ্ঞান, নেতৃত্ব ও দায়িত্ববোধ অর্জনের এক অনন্য যাত্রা। ‎দীর্ঘ আট বছরের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে লেখাপড়ার পাশাপাশি ক্যাম্পাস সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। এ কাজের মাধ্যমে বাকৃবির শিক্ষা, গবেষণা, সাফল্য ও বিভিন্ন ইতিবাচক উদ্যোগের খবর জাতীয় গণমাধ্যমে তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছি। একই সঙ্গে অনিয়ম-দুর্নীতি ও অপরাধের সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পক্ষে সোচ্চার থেকেছি। ‎শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি, আন্দোলন ও অধিকারসংক্রান্ত বিষয়ও তুলে ধরেছি লেখনীর মাধ্যমে। আমার বিশ্বাস, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন শুধু সনদ নয়; বরং সেই শিক্ষা, যা সমাজ ও প্রতিষ্ঠানের কল্যাণে কাজে লাগানো যায়। বাকৃবি আমাকে সেই সুযোগ ও সাহস দুটোই দিয়েছে।

‎আজ পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, বাকৃবির সবুজ প্রাঙ্গণে কাটানো আট বছর আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান অধ্যায়গুলোর একটি। এখানকার শিক্ষক, সহপাঠী, সিনিয়র-জুনিয়র এবং অসংখ্য স্মৃতি আমার ব্যক্তিত্ব গঠনে গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছে। আমার লেখনীতে বাকৃবির অর্জন তুলে ধরতে পারা যেমন ছিল দায়িত্ব, তেমনি ছিল পরম গৌরবের।

মো. হাবিবুর রহমান রনি

প্রাক্তন শিক্ষার্থী, কৃষি (অনার্স), কৃষিতত্ত্ব (স্নাতকোত্তর)

‎সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় গবেষণার সুফল পৌঁছাতে হবে

‎একজন শিক্ষার্থী হিসেবে বাকৃবি থেকে আমি শুধু একটি ডিগ্রি নয়, নিজের চিন্তাভাবনা, আত্মবিশ্বাস ও দায়িত্ববোধকে গড়ে তোলার সুযোগ পেয়েছি। পড়াশোনার পাশাপাশি গবেষণা, বিভিন্ন সংগঠন ও সহশিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত হয়ে মানুষের সঙ্গে কাজ করা এবং নিজের মতামত প্রকাশ করতে শিখেছি। বাকৃবির সবচেয়ে ভালো লাগার দিক হলো এর সমৃদ্ধ একাডেমিক পরিবেশ, অভিজ্ঞ শিক্ষক এবং কৃষি ও দেশের উন্নয়নকেন্দ্রিক শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ। তবে আমার মনে হয়, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ভালো গবেষণা ও সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সেগুলো সাধারণ মানুষের কাছে এবং বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে আরো বেশি পৌঁছানো দরকার। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে আরো কার্যকর যোগাযোগ তৈরি করা এবং গবেষণার ফল মাঠপর্যায়ে প্রয়োগের উদ্যোগ বাড়ানো এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

‎সূমাইয়াত মেহজাবীন উর্বী

শিক্ষার্থী, কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান অনুষদ

বাস্তব দুনিয়ার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত করে বাকৃবি

একজন প্রাক্তন শিক্ষার্থী। বর্তমানে কর্মরত আছি ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ পিএলসির টেকনোলজি ডেভেলপমেন্ট এক্সিকিউটিভ হিসেবে। আমি খুব দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি আমার এ পরিচয়ের পেছনে বাকৃবির অবদান অত্যন্ত গভীর। ‎কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি বিভিন্ন ক্লাব কার্যক্রম এবং সহপাঠী, সিনিয়র ও জুনিয়রদের সঙ্গে কাটানো মিষ্টিমধুর স্মৃতিগুলো আমাকে এখনো ভাবুক করে তোলে। এখন যখন পেছনে তাকাই, বুঝতে পারি বাকৃবির সেই দিনগুলো কীভাবে একজন অনভিজ্ঞ স্বপ্নবাজ তরুণকে বাস্তব দুনিয়ার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত করে তুলেছিল। তাই আজ কৃষিবিদ তৈরির এই আঁতুড়ঘরের ৬৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বাকৃবিতে বর্তমানে অধ্যয়নরত সব শিক্ষার্থীকে আমি প্রাণভরে এই ১২০০ একরের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা স্মৃতি কুড়াতে, নিজেকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে এবং দেশ ও জাতির কল্যাণে নিবেদিত হয়ে কাজ করার আহ্বান জানাই।

‎তিয়াস সাহা

প্রাক্তন শিক্ষার্থী, কৃষি অনুষদ

আরও