সাক্ষাৎকার

অবকাঠামো ও আবাসন সংকট দূর করে নোবিপ্রবিকে শিক্ষা-গবেষণায় এগিয়ে নেয়াই মূল লক্ষ্য

দায়িত্ব নেয়ার পর প্রথম কাজই ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকট ও সম্ভাবনা গভীরভাবে বোঝা।

অধ্যাপক ড. গোলাম রাব্বানী, উপাচার্য, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (নোবিপ্রবি)। উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন চার মাস। সম্প্রতি তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা সংকট, শিক্ষা ও গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিং নিয়ে পরিকল্পনা, শিল্প খাতের উপযোগী গ্র্যাজুয়েট তৈরি, ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতির ভবিষ্যৎ এবং চার বছরের মেয়াদে সামগ্রিক ভিশন নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে

উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর কী কী চ্যালেঞ্জ ফেস করছেন এবং আপনার কাজের অগ্রাধিকার কী?

দায়িত্ব নেয়ার পর প্রথম কাজই ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকট ও সম্ভাবনা গভীরভাবে বোঝা। যোগদানের শুরু থেকেই আমি সব স্টেকহোল্ডার—শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রী, ৩৩ বিভাগ-ইনস্টিটিউটের প্রায় ৩৩০ জন শিক্ষার্থী প্রতিনিধি, ৫৩টি ক্লাবের প্রতিনিধি, প্রায় ৭০০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সাংবাদিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ মতবিনিময় করে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করেছি। প্রধান সমস্যাগুলো হলো— শিক্ষার্থীদের মাত্র ২৫ শতাংশ আবাসিক হলে থাকতে পারে ফলে অধিকাংশকে কষ্টার্জিত অর্থে বাইরে থেকে নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে; পর্যাপ্ত পরিবহন নেই; পানিতে লবণাক্ততা, আর্সেনিক ও আয়রনের ত্রিমুখী সংকট; ক্যাশলেস লেনদেন চালু হয়নি; খেলার মাঠে ওয়াশরুম-নিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকায় খেলাধুলা অনিয়মিত; এবং অবকাঠামো না বাড়ায় ক্লাসরুম ও শিক্ষকদের বসার সংকট প্রকট। এসব সমাধানে উদ্যোগ নিয়েছি।

একাডেমিক ভবন-৩-এর কাজ ২০২৮ সালে শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে, যা সম্পন্ন হলে ক্লাসরুম ও বসার সংকট অনেকাংশে দূর হবে। পানির সমস্যা সমাধানে জাইকার কাছে প্রকল্প জমা দেয়া হয়েছে। আবাসন সংকট সমাধানে ছেলেদের দুটি ও মেয়েদের দুটি হল নির্মাণের প্রকল্প সরকারের কাছে জমা দেয়ার প্রক্রিয়ায় আছে। ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রতিষ্ঠার অনুমোদন পাওয়া গেছে, পাশাপাশি সরকারের ল্যাঙ্গুয়েজ ইনস্টিটিউট প্রকল্পে নোবিপ্রবির জন্য বরাদ্দ রাখতে ইউজিসির সঙ্গে আলোচনা চলছে। পরিবহন সংকট সমাধানে অকেজো বাস মেরামতসহ বিআরটিসি থেকে ডাবল ডেকার বাস সংযোজন করেছি, আরো দুটির রিকুইজিশন দেয়া আছে। ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরীণ চলাচলে ই-কার চালু করেছি। আশা করি আগামী দুই বছরে শিক্ষার্থীদের মৌলিক সমস্যাগুলোর বড় অংশ সমাধান হবে।

সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে উপাচার্য পরিবর্তনের বিষয়টি কীভাবে দেখেন?

প্রতিটি সরকারই নিজস্ব উন্নয়ন এজেন্ডা বাস্তবায়নে যোগ্য মনে করা শিক্ষক-গবেষক-প্রশাসকদের দায়িত্ব দেয়। এখানে বিতর্কের সুযোগ নেই বলে আমি মনে করি। বরং দেখা উচিত যাদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তারা যথাযথভাবে কাজ করছেন কিনা। একাডেমিক যোগ্যতা, প্রশাসনিক দক্ষতা, নেতৃত্বগুণ ও সততা বিবেচনা করেই নিয়োগ হওয়া উচিত এবং এসব বিবেচনা করেই সরকার নিয়োগ দিয়েছে বলে মনে করি। সরকারের বয়স মাত্র ছয় মাস, নতুন উপাচার্যদেরও দেড় থেকে চার মাস হয়েছে—তাই সবাইকে কাজ করার সুযোগ ও সময় দেয়া উচিত।

ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি নিয়ে আপনার অবস্থান কী?

নোবিপ্রবিতে অফিশিয়ালি ছাত্র রাজনীতি বন্ধ ছিল রিজেন্ট বোর্ডের সিদ্ধান্তে। সম্প্রতি বিষয়টি রিজেন্ট বোর্ডে উত্থাপন করেছিলাম, তবে সিদ্ধান্ত হয়েছে এজেন্ডাটি স্থগিত রেখে পরবর্তী বোর্ডে আলোচনা হবে। সুস্থ ধারার রাজনীতি হলে অনুমতি দিতে আপত্তি নেই, তবে সাম্প্রতিক ছাত্র সংগঠনের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ অনাকাঙ্ক্ষিত—এমন চলতে থাকলে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে হবে। মূলত সংগঠনগুলোর আচরণের ওপরই নির্ভর করবে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন।

আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে বিজ্ঞান-প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান ভালো নয়—নোবিপ্রবির অবস্থান উন্নয়নে কী উদ্যোগ নিচ্ছেন?

শিক্ষা-গবেষণায় নোবিপ্রবি দিন দিন ভালো করছে। যোগদানের পর দেখলাম ইন্টারন্যাশনাল অফিস ও র‍্যাংকিং সেলের কোনো পৃথক অবকাঠামো ছিল না—শিক্ষকরা নিজ অফিসে থেকে কাজ চালাতেন। এখন এ দুটির জন্য আলাদা অফিস করে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও জনবল দিয়েছি। র‍্যাংকিং উন্নয়নে গবেষণা, প্রকাশনা ও কার্যক্রমের তথ্য সঠিকভাবে সংগ্রহ ও উপস্থাপন জরুরি। ইন্টারন্যাশনাল অফিস স্থাপনে ইউজিসির নির্দেশনার আগেই নোবিপ্রবিতে আমি এ উদ্যোগ নিয়েছি। টাইমস হায়ার এডুকেশনের সাসটেইনেবিলিটি ইমপ্যাক্ট রেটিংসে নোবিপ্রবি বিশ্বব্যাপী ৪০১-৬০০ ব্যান্ডে স্থান পেয়েছে। দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে প্রথম স্থান অর্জন করেছে। র‍্যাংকিংয়ে শীর্ষস্থান ধরে রাখতে সব ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হবে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আরো বেশি গবেষণার সঙ্গে সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

নিয়োগকর্তাদের অভিযোগ শিল্প খাতের চাহিদা অনুযায়ী গ্র্যাজুয়েট পাওয়া যাচ্ছে না—এর কারণ কী?

মূল সমস্যা, কারিকুলাম এতদিন শুধু ডিগ্রি দেয়ার উদ্দেশ্যে তৈরি হয়েছে, শিল্পমুখী করে গড়ে ওঠেনি। সরকার এখন শিল্প-একাডেমিয়া সহযোগিতাকে গুরুত্ব দিচ্ছে, ইউজিসি বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপের নির্দেশনা দিয়েছে। আমরা “আউটকাম বেজড এডুকেশন” (ওবিই) কারিকুলাম গ্রহণ করছি, যার লক্ষ্য শিল্পের চাহিদা পূরণ। ৩৩টি ডিপার্টমেন্টের অর্ধেক ওবিই কারিকুলাম তৈরি করতে পেরেছে, বাকিদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ল্যাঙ্গুয়েজ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা সময়সাপেক্ষ হলেও বিদ্যমান অবকাঠামোতে এখনই এক-দুটি ভাষা কোর্স চালুর পরিকল্পনা করছি।

চার বছরের মেয়াদে আপনার সামগ্রিক ভিশন কী?

আমার প্রধান স্বপ্ন—১০০ একরের সমপরিমাণ জমিতে নোবিপ্রবির একটি দ্বিতীয় ক্যাম্পাস স্থাপন, যেখানে ওশানোগ্রাফি ইনস্টিটিউট, ফিশারিজ ও এগ্রিকালচার ফ্যাকাল্টি থাকবে; জমি অধিগ্রহণ নিয়ে আলোচনা চলছে, আমার মেয়াদের মধ্যে অন্তত কাজ শুরুর চেষ্টা করব। আবাসন সক্ষমতা ২৫ থেকে ৫০-৬০ শতাংশে উন্নীত করা, পরিবহন ও পানি সমস্যার সমাধান এবং শিক্ষা-গবেষণার মান উন্নয়ন অব্যাহত রাখব। ৫০ বছর মেয়াদি মাস্টারপ্ল্যানের প্রথম পর্যায়ের কিছু অংশ চার বছরের মেয়াদে বাস্তবায়নের চেষ্টা করব—কিছু স্বল্পমেয়াদি, কিছু দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছি। আশা করি কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারব, আর যা বাকি থাকবে তা ভবিষ্যৎ প্রশাসন এগিয়ে নেবে।

আরও