পরীক্ষার আগের শেষ সপ্তাহ

আফসানা নাজনীন জিছিয়া

পরীক্ষার আগে অতিরিক্ত নার্ভাসনেস বা বুক ধড়ফড় করার এ সমস্যাটিকে মনোবিজ্ঞানে ‘পারফরম্যান্স অ্যাংজাইটি’ বলা হয়।

অনেক সময় দেখা যায় শুরু থেকে পড়ার সুযোগ না পেয়ে পরীক্ষার আগের সপ্তাহে এসে অনেকেই প্যানিক করেন। পরীক্ষার আগে অতিরিক্ত নার্ভাসনেস বা বুক ধড়ফড় করার এ সমস্যাটিকে মনোবিজ্ঞানে ‘পারফরম্যান্স অ্যাংজাইটি’ বলা হয়। এ সময়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে ‘ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট থিংকিং’ কাজ করে যেমন, ‘হয় আমি ভালো রেজাল্ট করব আর না হলে আমার জীবন ব্যর্থ।’ এ নেতিবাচক চিন্তাগুলো তীব্র ভীতি তৈরি করে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক শেখার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ‘আগে পড়া হয়নি’ এ সত্যিটা অপরাধবোধ ছাড়াই মেনে নেয়ার চেষ্টা করতে হবে। আফসোস না করে শান্ত মস্তিষ্কে শেষ কয়দিন কাজে লাগানোর বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা করতে হবে।

মানসিক চাপ সামলে শেষ মুহূর্তের স্মার্ট প্রস্তুতি—

ইতিবাচক আত্মকথন (পজিটিভ সেলফ-টক)

মনের ভেতরের নেতিবাচক কথাগুলোকে সচেতনভাবে থামিয়ে দিয়ে ফলাফলের চেয়ে পড়ার প্রক্রিয়ায় ফোকাস করতে হবে। নিজেকে মনে করিয়ে দেয়া যেতে পারে যে ভুল করার ভয় কাটিয়ে ওঠা জরুরি; একটি ভুল উত্তর মানেই সব শেষ নয়।

সিলেবাসের স্মার্ট সিলেকশন

শেষ মুহূর্তে পুরো বই শেষ করার অবাস্তব চাপ না নিয়ে ক্লাসের গুরুত্বপূর্ণ টপিকগুলো বাছাই করা যেতে পারে। অর্থাৎ যে বিষয় পড়লে অন্তত বেশি উত্তর দেয়া সম্ভব, আপাতত সেগুলোতে ফোকাস করা যেতে পারে।

ব্রেইন-ফগ ও টাইম-ব্লকিং

একটানা পড়ার চাপ থেকে ‘ব্রেইন-ফগ’ বা মাথা শূন্য লাগতে পারে। মস্তিষ্ককে বিশ্রাম দিতে প্রতি ৪৫-৫০ মিনিট পড়ার পর ১০-১৫ মিনিটের একটি ব্রেক নেয়া যেতে পারে যাকে ‘পোমোডোরো টেকনিক’ বলা হয়। এ সময়ে স্ক্রিনে (ফোন/ল্যাপটপ) না তাকিয়ে একটু হাঁটাহাঁটি করুন বা ৪-৭-৮ টেকনিকে (৪ সেকেন্ড শ্বাস নেয়া, ৭ সেকেন্ড ধরে রাখা, ৮ সেকেন্ডে ধীরে ধীরে ছাড়া) ডিপ ব্রিদিং করতে পারেন, যা নেতিবাচক চিন্তাগুলো নিয়ন্ত্রণ করে মস্তিষ্ক শান্ত রাখে।

ডিজিটাল ডিটক্স ও পড়ার পরিবেশ

পড়ার বিরতিতে স্মার্টফোনে সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করা মস্তিষ্ককে আরো ক্লান্ত করে। কে কতটুকু পড়ল তা জানতে গেলে আপনার অ্যাংজাইটি আরো বাড়বে। সবার পড়ার ধরন আলাদা, তাই নিজের ট্র্যাকেই মনোযোগ দেয়া যেতে পারে। তাই পরীক্ষার এ কয়দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে সাময়িক বিরতি নিন। আলো-বাতাস পূর্ণ একটি নির্দিষ্ট টেবিলে পড়ার চেষ্টা করুন।

ঘুমের সঙ্গে আপস নয়

শেষ সপ্তাহে শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বড় ভুল হলো সারা রাত জেগে পড়া। আপনি যখন ঘুমান, তখনই আপনার মস্তিষ্ক সারাদিনের পড়া তথ্যগুলোকে শর্ট-টার্ম মেমোরি থেকে লং-টার্ম মেমোরিতে সেভ করে। অন্তত ৬-৭ ঘণ্টার নিরবচ্ছিন্ন ঘুম না হলে পরীক্ষার হলে সব ‘ব্ল্যাঙ্ক’ হয়ে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা থাকে।

সতেজতা ও পুষ্টি

মানসিক চাপ ও রাত জাগার ক্লান্তি কাটাতে অতিরিক্ত চা-কফির বদলে প্রচুর পানি পান করুন। পড়ার ফাঁকে সহজলভ্য, ফাইবার ও ভিটামিনযুক্ত পুষ্টিকর খাবার খেতে পারেন, যা শরীরে এনার্জি জোগায় এবং স্ট্রেস কমাতে সাহায্য করে।

শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপের পেছনে পরিবারের অভিভাবকদের নীরব ভূমিকা থাকে। সন্তান সাধারণ নম্বর পেলে বাবা-মায়ের হতাশ মুখচ্ছবি তার মনে তীব্র অপরাধবোধ তৈরি করে। তাই এ দৌড়ে সন্তানকে শামিল না করে ফল যা-ই হোক পাশে থাকার আশ্বাস দেয়া যেতে পারে।

মনে রাখা প্রয়োজন, একটি পরীক্ষা মেধার চূড়ান্ত মানদণ্ড নয়, জীবনের একটি অংশ মাত্র। যতটুকু সময় আছে, নিজের প্রতি সদয় থেকে শুধু নিজের সেরাটুকু দেয়ার চেষ্টা করাটাই সেরা সিদ্ধান্ত।

লেখক: অ্যাসিস্ট্যান্ট কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট, মেন্টাল হেলথ ইউনিট, উত্তরা ইউনিভার্সিটি

আরও