লিংকডইন ফর স্টুডেন্টস

প্রফেশনাল নেটওয়ার্কিংয়ের শুরুটাই হোক ক্যাম্পাস থেকে

ক্যারিয়ার গড়া মানেই আর শুধু ভালো সিজিপিএ কিংবা একটা ঝকঝকে সিভি বানানো নয়। এখনকার চাকরির বাজারে নিয়োগকর্তারা প্রার্থীকে চেনার আগে তার অনলাইন প্রফেশনাল পরিচয় দেখে নিচ্ছেন—আর এ পরিচয়ের সবচেয়ে বড় ঠিকানা লিংকডইন।

বিশ্বব্যাপী ৫০ কোটিরও বেশি মানুষ লিংকডইনে সক্রিয়, আর এর মধ্যে চার কোটির বেশি হলেন শিক্ষার্থী কিংবা সদ্য স্নাতক তরুণ-তরুণী। লিংকডইনে ৫০ কোটির বেশি ব্যবহারকারী রয়েছে, যাদের মধ্যে চার কোটির বেশি শিক্ষার্থী বা সাম্প্রতিক স্নাতক। অর্থাৎ প্রতিযোগিতা যেমন বিশাল, তেমনি সুযোগও অপার—শর্ত একটাই, নিজেকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে জানতে হবে।

নিয়োগকর্তারা কেন লিংকডইনেই খুঁজছেন প্রার্থী: বিভিন্ন জরিপ বলছে, প্রার্থী বাছাইয়ে লিংকডইন এখন প্রায় অপরিহার্য একটি ধাপ। প্রায় ৭৫ শতাংশ নিয়োগকর্তা প্রার্থী যাচাইয়ের সময় লিংকডইন প্রোফাইল দেখেন, আর ৭৩ শতাংশের বেশি নিয়োগ-প্রক্রিয়ায় নিয়মিতভাবে এটিকে গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করেন। এমনকি প্রার্থী খুঁজে বের করা ও প্রাথমিক বাছাইয়ের কাজেও ৬৭ শতাংশের বেশি প্রতিষ্ঠান এখন লিংকডইনের ওপর আগে থেকেই বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে।

শুধু সিভি নয়, নিয়োগকর্তারা প্রোফাইলে খোঁজেন প্রার্থীর কার্যক্রম, দক্ষতা, পারস্পরিক পরিচিতজন এবং সে নিজের লক্ষ্য ও কাজ কীভাবে উপস্থাপন করছে। নিউইয়র্কভিত্তিক ক্যারিয়ার উন্নয়ন পরামর্শক অ্যালিসন চেস্টনের মতে, শিক্ষার্থী সম্পর্কে বাড়তি তথ্য জানতে নিয়োগকর্তা সবার আগে লিংকডইনেই খোঁজ নেন। ক্যাম্পাসওয়েল জরিপেও দেখা গেছে, প্রফেশনাল উদ্দেশ্যে লিংকডইনকে সবচেয়ে কার্যকর সামাজিক মাধ্যম মনে করেন ৭১ শতাংশের বেশি উত্তরদাতা।

ক্যাম্পাস থেকেই কেন শুরু করা জরুরি: স্নাতক শেষ করার পর নয়, বরং ক্যাম্পাসে থাকা অবস্থাতেই লিংকডইন প্রোফাইল গড়ে তোলা উচিত। এটি অনেকটা”জীবন্ত সিভির মতো কাজ করে, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হালনাগাদ হতে থাকে এবং শিক্ষার্থীর দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে ক্রমাগত তুলে ধরে। টেক্সাস ক্রিশ্চিয়ান ইউনিভার্সিটির চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী জোশুয়ার অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়, লিংকডইন সহপাঠী ও করপোরেট জগতের মানুষের সঙ্গে নেটওয়ার্কিংয়ের একটি সহজ মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। ওয়েক টেকনিক্যাল কমিউনিটি কলেজের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আনালিসাও বলছেন, দক্ষতাগুলো তালিকাভুক্ত করার পাশাপাশি চাকরির খোঁজখবরের জন্যও এটি বেশ কাজে দেয়।

ক্যাম্পাসে থাকতেই লিংকডইনের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো স্বপ্নের চাকরিতে থাকা মানুষদের প্রোফাইল দেখে বোঝা যায় তারা কীভাবে সেই জায়গায় পৌঁছেছেন—কোন কোর্স করেছেন, কোন দক্ষতা অর্জন করেছেন। এভাবে নিজের পড়াশোনা ও ক্যারিয়ার-পরিকল্পনাকে সঠিক পথে চালিত করা সহজ হয়।

প্রোফাইল বানিয়ে বসে থাকলেই হবে না—নিয়মিত সক্রিয় থাকাও জরুরি। ‘‌ওপেন টু ওয়ার্ক’ অপশন চালু রাখা, মাসে অন্তত একবার নিজের প্রজেক্ট বা শেখা নিয়ে ছোট পোস্ট দেয়া, ক্ষেত্র-সংশ্লিষ্ট পোস্টে সাপ্তাহিক মন্তব্য করা এবং নিজ প্রতিষ্ঠানের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য অ্যালামনাই টুল ব্যবহার করা—এসব ছোট ছোট অভ্যাসই দীর্ঘমেয়াদে বড় পার্থক্য গড়ে দেয়।

শুধু লিংকডইন নয়, প্রয়োজন বাস্তব নেটওয়ার্কিংও: লিংকডইন একটি হাতিয়ার মাত্র; আসল কাজ হয় সম্পর্ক গড়ার মধ্য দিয়ে। গবেষণা বলছে, প্রায় ৮৫ শতাংশ চাকরি পূরণ হয় ব্যক্তিগত সম্পর্কের মাধ্যমে, আর ৭০ শতাংশ পদ কখনো প্রকাশ্যে বিজ্ঞাপিতই হয় না—রেফারেন্সের মাধ্যমে পূরণ হয়। নেটওয়ার্কিং ইভেন্টে অংশ নেয়া প্রার্থীদের নিয়োগ-ফলাফল প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত উন্নত হতে দেখা গেছে।

নেটওয়ার্কিং মানেই বড় কোনো আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান নয়—শিক্ষক, সহপাঠী, প্রাক্তন শিক্ষার্থী, এমনকি অতিথি বক্তার সঙ্গে সাধারণ কথোপকথনও এর অংশ। ক্যাম্পাসের ক্যারিয়ার সেন্টার, গবেষণাগার ও ছাত্র সংগঠন থেকে শুরু করে জব ফেয়ার, কর্মশালা ও স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম—সবকিছুই নেটওয়ার্কিংয়ের সুযোগ তৈরি করে দেয়।

ধাপে ধাপে এগোনোর একটি সহজ পরিকল্পনা: যারা কোথা থেকে শুরু করবেন বুঝতে পারছেন না, তাদের জন্য একটি ৩০-৬০-৯০ দিনের পরিকল্পনা সহায়ক হতে পারে। প্রথম ৩০ দিনে প্রোফাইল সম্পূর্ণ করা, লক্ষ্য পদ ও প্রতিষ্ঠানের তালিকা তৈরি করা, অন্তত ৩০টি নতুন সংযোগ যোগ করা এবং কয়েকটি ইনফরমেশনাল ইন্টারভিউ করা। পরের ৩০ দিনে একটি প্রজেক্ট নিয়ে পোস্ট প্রকাশ করা, অনলাইন কোর্স সম্পন্ন করা এবং প্রতি সপ্তাহে নতুন সংযোগ যোগ করা। শেষ ৩০ দিনে টার্গেট করা ইন্টার্নশিপ বা চাকরিতে আবেদন করা এবং আগের যোগাযোগগুলোর সঙ্গে নিজের অগ্রগতি শেয়ার করা।

ক্যারিয়ার-যাত্রা শুরু হওয়া উচিত ক্লাসরুম থেকেই বেরিয়ে আসার আগে, ক্যাম্পাসে থাকতেই। একটি গোছানো লিংকডইন প্রোফাইল আর নিয়মিত নেটওয়ার্কিং—এ দুইয়ের সমন্বয়ই শিক্ষার্থীকে এগিয়ে রাখে অসংখ্য প্রতিযোগীর ভিড়ে। প্রথম দিন থেকেই ছোট ছোট পদক্ষেপ নিলে স্নাতক শেষ হওয়ার আগেই তৈরি হয়ে যায় একটি শক্তিশালী প্রফেশনাল ভিত্তি, যা ভবিষ্যতের প্রতিটি সুযোগের দরজা খুলে দিতে পারে।

আরও