জিম্বাবুয়ে ও বতসোয়ানা: আফ্রিকার দুই প্রতিবেশী দেশের বৈপরীত্যের গল্প

ভেঙে পড়া বনাম সুসংগঠিত রাষ্ট্র

ভিক্টোরিয়া ফলস—এক সময় আফ্রিকার অন্যতম প্রধান পর্যটন আকর্ষণ। জলপ্রপাতটির অপার সৌন্দর্য এখনো আছে, কিন্তু তার নিচে যে শহর, তা অনেকটা বিবর্ণ। অর্ধেক দোকান বন্ধ।

ভিক্টোরিয়া ফলস—এক সময় আফ্রিকার অন্যতম প্রধান পর্যটন আকর্ষণ। জলপ্রপাতটির অপার সৌন্দর্য এখনো আছে, কিন্তু তার নিচে যে শহর, তা অনেকটা বিবর্ণ। অর্ধেক দোকান বন্ধ। যেগুলো খোলা, সেখানেও পণ্যের তেমন সমাহার নেই। প্রধান বিপণি কেন্দ্রটি যেন পরিণত হয়েছে গুদামঘরে। বিদেশী পর্যটক নেই আগের মতো। যারা আসেন সাধারণ জিম্বাবুইয়ানরা তাদের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেন না গোয়েন্দাদের ভয়ে। এখনকার জিম্বাবুয়ে এক পুলিশি রাষ্ট্র। বিপরীতে কয়েকশ কিলোমিটার দূরেই প্রতিবেশী বতসোয়ানায় বিপরীত চিত্র। রাজধানী গ্যাবরোনের রাস্তার পাশে দোকানগুলো খোলা, পণ্যভর্তি। শিশুদের হাসি, নারীদের নিরাপদ চলাফেরা, আর পর্যটকদের অবাধ বিচরণ মিলেমিশে এক আরামদায়ক শহরজীবনের প্রতিচ্ছবি। দেশটির চোবে ন্যাশনাল পার্ক এবং ওকাভাঙ্গো ডেল্টা আজ আফ্রিকার ইকো-ট্যুরিজমের রোল মডেল। চোবে নদীর তীরে অবস্থিত পার্কটি আফ্রিকার অন্যতম হাতি অভয়ারণ্য। ওকাভাঙ্গো ডেল্টা ইউনেস্কোর হেরিটেজ সাইট, যা প্রতি বছর লাখো পর্যটককে আকর্ষণ করে। বতসোয়ানায় সরকারি ভবনের সামনেও বিরোধী দলের মিছিল হয়, সংবাদমাধ্যম সরাসরি প্রেসিডেন্টের সমালোচনা প্রচার করে। এ বতসোয়ানা এক সময়ে ছিল আফ্রিকার সবচেয়ে দরিদ্র দেশগুলোর একটি। আজ তা আফ্রিকার সুশাসন ও স্থিতিশীল অর্থনীতির প্রতীক। জিম্বাবুয়ে ও বতসোয়ানার মধ্যে রয়েছে ৮০০ কিলোমিটারেরও বেশি সীমান্ত। স্বাধীনতা অর্জনও প্রায় কাছাকাছি সময়ে। কিন্তু স্বাধীনতা-পরবর্তী বতসোয়ানা দেখেছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ, গণতন্ত্র, সুশাসন ও স্বচ্ছতা। আফ্রিকার ৫৪টি দেশের মধ্যে যে নয়টি দেশ স্বাধীনতার পর কোনো সেনা অভ্যুত্থান দেখেনি তার একটি বতসোয়ানা। গত বছরের অক্টোবরে দেশটিতে ঐতিহাসিক নির্বাচনের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতার পালাবদল ঘটে। স্বাধীনতার পর থেকে টানা ৫৮ বছর দেশ শাসনকারী বতসোয়ানা ডেমোক্রেটিক পার্টি পরাজিত হয় বিরোধী জোট আমব্রেলা ফর ডেমোক্রেটিক চেঞ্জের কাছে। এত বছর ক্ষমতাসীন থাকার পর ক্ষমতা হস্তান্তরে কোনো রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা যায়নি। বিজয়ী ও পরাজিত উভয় পক্ষই নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত মেনে নেয়। অন্যদিকে একনায়কতন্ত্র, দমন-পীড়ন ও দুর্নীতিতে ঘুরপাক খেয়েছে জিম্বাবুয়ে। দুই দেশের মধ্যে পার্থক্য গড়ে দিয়েছে রাষ্ট্র গঠনের দর্শন।

বতসোয়ানা ও জিম্বাবুয়ে—কাছাকাছি সময়ে স্বাধীনতা অর্জন করলেও তাদের অর্থনৈতিক যাত্রাপথ হয়েছে একেবারে ভিন্নমুখী। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এ বৈপরীত্য রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতি ও কার্যকারিতার মধ্যে নিহিত। স্বাধীনতার পর ১৯৮০ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত বতসোয়ানার জিডিপি বার্ষিক গড়ে ১০ দশমিক ১ শতাংশ হারে বেড়েছে। শিল্প, কৃষি ও সেবাসহ প্রায় সব খাতেই প্রবৃদ্ধি ছিল সুসংগঠিত ও স্থিতিশীল। এ উন্নয়নের পেছনে ছিল কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে নীতিনির্ধারণ, প্রশাসনিক নিয়োগ, নিরাপত্তা বাহিনী নিয়ন্ত্রণ এবং কাঠামোগত শৃঙ্খলা ছিল রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় শক্তি।

অন্যদিকে জিম্বাবুয়ের অর্থনীতি ছিল বিপরীতমুখী। ১৯৯০ থেকে ১৯৯৬ সালের মধ্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ। এ সময়ে মাথাপিছু আয় কমেছে ৯ শতাংশ। বাজেট ঘাটতি ছিল জিডিপির ১৩ শতাংশের বেশি। কৃষি ও শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় স্থবির। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো একের পর এক বন্ধ হয়ে যায়, রাষ্ট্র ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক অস্থিরতা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তোলে।

বতসোয়ানা যেখানে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সমন্বয়ে একটি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা গড়ে তুলেছে, সেখানে জিম্বাবুয়ে রাষ্ট্রকে ব্যবহার করেছে রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন, দুর্নীতি ও দমন-পীড়নের প্রদর্শন হিসেবে। ফলাফল—এক দেশে ধারাবাহিক উন্নয়ন, অন্যটিতে দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতা ও পতন।

১৯৬৬ সালে বতসোয়ানা স্বাধীনতা লাভ করে। প্রথম প্রেসিডেন্ট স্যার সেরেটসে খামা অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে ফিরে আসেন নেতৃত্ব দিতে। নানা প্রতিকূলতার পরও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গড়ে তোলেন। তার নেতৃত্বে বতসোয়ানার রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে ওঠে ছোট আকারে কিন্তু শক্তিশালী স্বশাসন ও জবাবদিহির ভিত্তিতে। প্রথম দিন থেকেই বতসোয়ানায় ছিল গণশুনানির ঐতিহ্য। ‘কগোতলা’ নামের জনসভার মাধ্যমে নেতা ও জনগণের সরাসরি সংলাপ অনুষ্ঠিত হতো। প্রেসিডেন্ট নিজেও এ সভায় অংশ নিয়ে সাধারণ মানুষের প্রশ্নের উত্তর দিতেন।

অন্যদিকে জিম্বাবুয়ে স্বাধীন হয় ১৯৮০ সালে। নির্বাচনে রবার্ট মুগাবের দল জিম্বাবুয়ে আফ্রিকান ন্যাশনাল ইউনিয়ন সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও দেশটিতে তখনো একটি স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা ও সংবিধান ছিল। অর্থনীতিও আফ্রিকার অন্যতম বৃহত্তম ছিল। দেশটিকে বলা হতো আফ্রিকার রত্ন ও শস্যভাণ্ডার। শ্বেতাঙ্গদের পতনের পর বিপ্লবী নেতা মুগাবে যখন রোডেশিয়ার (জিম্বাবুয়ের আগের নাম) শেষ শ্বেতাঙ্গ প্রধানমন্ত্রী ইয়ান স্মিথকে ডেকে পাঠান, স্মিথ রীতিমতো আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। কারণ মুগাবে আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন সুযোগ পেলে তিনি স্মিথকে প্রকাশ্যে ফাঁসিতে ঝোলাবেন। কিন্তু বাস্তবে স্মিথ পেলেন অন্তর্ভুক্তিমূলক জিম্বাবুয়ের ইঙ্গিত। পরে তিনি বলেছিলেন, ‘যদি সে (মুগাবে) তার কথার সঙ্গে মিল রেখে কাজ করে, তাহলে ভবিষ্যৎ ভালোই হবে।’ কিন্তু কথার সঙ্গে কাজের মিল রাখেননি মুগাবে।

ঘটনা একেবারেই উল্টো দিকে মোড় নেয় মাত্র দুই বছর পর, ১৯৮২ সালে। মুগাবে মুখ ফিরিয়ে নেন তার পুরনো রাজনৈতিক মিত্রদের কাছ থেকে। রাজনৈতিক বিরোধীদের ওপর শুরু হয় দমন-পীড়ন। যদিও বিরোধীদের ওপর দমন-পীড়ন এড়িয়ে যায় পশ্চিমা বিশ্ব। বরং মুগাবেকে পাঠাতে থাকে কোটি কোটি ডলারের বিদেশী সাহায্য। পশ্চিমা গণমাধ্যমও চুপ করে থাকে, কারণ মুগাবে তখনো ছিল তথাকথিত ‘আফ্রিকান মুক্তিযোদ্ধা’র প্রতীক। কিন্তু বাস্তবে মুগাবে গড়ে তুলছিলেন একনায়কতন্ত্র। তিনি কোটি কোটি ডলার খরচ করে সেনাবাহিনীকে কঙ্গোর গৃহযুদ্ধে পাঠান। যেটি আফ্রিকার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সংঘাতে পরিণত হয়। বিনিময়ে জিম্বাবুয়ের সামরিক কর্মকর্তারা কঙ্গোর দক্ষিণাঞ্চলের খনি প্রকল্পে অংশীদারত্ব দেন। এতে জিম্বাবুয়ের জেনারেলরা বিপুল সম্পদ অর্জন করেন। বিলাসী জীবনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন, যা মুগাবের জন্য ভবিষ্যতে কঠিন সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে শ্বেতাঙ্গদের কৃষিজমি কেড়ে নেয়া হয়। সেই জমি যায় মুগাবের ঘনিষ্ঠদের হাতে। গড়ে ওঠে অলিগার্ক অর্থনীতি। কৃষি খাত ধসে পড়ে। তার সঙ্গে ধসে পড়ে রফতানি, কর রাজস্ব, ব্যাংক খাত এমনকি খাদ্য উৎপাদনও। মুদ্রা ছাপাতে শুরু করে রিজার্ভ ব্যাংক। আসে ২১ শতকের প্রথম হাইপারইনফ্লেশন। ২০০৭ সালের নভেম্বরে কালোবাজারে ১ মার্কিন ডলারের বিনিময় ছিল ১৩ লাখ জিম্বাবুইয়ান ডলার। ২০০৮ সালে দেশটিতে মূল্যস্ফীতি পৌঁছে যায় ২০০ মিলিয়ন শতাংশে। এক পাউরুটির দাম হয় ট্রিলিয়ন ডলার। অথচ সরকারিভাবে ১ ডলার সমান ৩০ হাজার জিম্বাবুইয়ান ডলার দেখানো হতো। ২০০৮ সালের ২৯ মার্চ জিম্বাবুয়েতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ব্যাপক কারচুপি হয়। সংবাদপত্র নেই, বাকস্বাধীনতা নেই, বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীরা নির্যাতনের শিকার হন। তবুও মুগাবের দল হেরে যায়। কিন্তু মুগাবে যেতে নারাজ। অর্থনৈতিক ধ্বংস ও দুর্নীতির দায় এড়াতে তিনি বিরোধীদের ওপর নিপীড়ন চালান। যদিও ২০১৭ সালে জনরোষ ও সেনা অভ্যুত্থানের মুখে তিনি পদত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন।

মুগাবে-পরবর্তী চিত্রও সুখকর নয়। ২০১৭ সালের নভেম্বরে মুগাবে উৎখাতের পর প্রেসিডেন্ট ইমারসন নাঙ্গাগয়া ক্ষমতা নেন। কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কারে তার প্রতিশ্রুতি অনেকাংশে ব্যর্থ। ইমারসন সেনাবাহিনীর প্রধানসহ গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারীদের বদল করে একচ্ছত্র ক্ষমতা লাভ করেন। এখন দেশটি একটি পুলিশি রাষ্ট্র হিসেবে রয়ে গেছে। বিরোধীদের আন্দোলন কঠোরভাবে দমন করা হচ্ছে। সংবিধান পরিবর্তনের প্রচেষ্টা ও বিরোধী দলের ওপর চাপ জোরালো হচ্ছে। এখনো রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ক্ষমতা কেন্দ্রীকরণই জিম্বাবুয়ের প্রধান চিত্র।

বতসোয়ানা স্বাধীনতার পর থেকে ধারাবাহিকভাবে শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা ধরে রেখেছে। একদলীয় আধিপত্য থাকলেও নির্বাচনী স্বচ্ছতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা দেশটিকে আফ্রিকার একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণে পরিণত করেছে। সেখানে জিম্বাবুয়ের রাজনৈতিক ইতিহাসজুড়ে আছে দীর্ঘদিনের একনায়কতন্ত্র, দমননীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার, যা দেশটিকে অস্থিতিশীল রাষ্ট্রে পরিণত করে।

বতসোয়ানার মূল্যস্ফীতির হার ২০২৫ সালের মে মাসে মাত্র ১ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা তাদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য (৩-৬ শতাংশ) থেকেও নিচে। বিপরীতে, জিম্বাবুয়ের জুন ২০২৫-এ বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ৯০ শতাংশের আশপাশে, যা হাইপারইনফ্লেশনের সীমায় পৌঁছেছে।

জিম্বাবুয়ে ও বতসোয়ানার মধ্যে বৈপরীত্য শুধু অর্থনীতিতে নয়, শিক্ষায়ও স্পষ্ট। বতসোয়ানায় শহর ও গ্রামে প্রায় সমান মানের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগ আছে। শিক্ষকরা নিয়মিত, পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ আছে, ছাত্রীদের জন্য হোস্টেল ও স্বাস্থ্যসুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। অথচ এক সময় আফ্রিকায় শিক্ষায় শ্রেষ্ঠ দেশগুলোর একটি জিম্বাবুয়েতে এখন গ্রামের স্কুলে নেই শিক্ষক, নেই বই, নেই ভবন। ইউনিসেফের হিসাবে, এক শিক্ষক একসঙ্গে চারটি শ্রেণীতে পড়ান। শহরের কিছু প্রাইভেট স্কুল ধনীদের জন্য টিকে আছে, কিন্তু জনসাধারণের জন্য শিক্ষা ব্যবস্থা ভগ্নপ্রায়।

স্বাস্থ্য ব্যবস্থাও একইভাবে বিপরীত। বতসোয়ানায় এইচআইভি/এইডস পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা গেছে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সরকারি সদিচ্ছার ফলে। বর্তমানে গড় আয়ু ৬৪ বছরের ওপরে। জিম্বাবুয়েতে একসময় যেখানে গড় আয়ু ছিল ৬০ বছরের ওপরে, এখন তা ৫৮-তে নেমে এসেছে। গ্রামে নেই ওষুধ, নেই চিকিৎসক। হাসপাতালের বিছানায় রোগী, কিন্তু চিকিৎসা নেই।

২০২৪ সালে বতসোয়ানার জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৩ শতাংশ। মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮ হাজার মার্কিন ডলার, যা হীরা রফতানি, পর্যটন ও সুশাসনের সুফল। অন্যদিকে জিম্বাবুয়ের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৫ শতাংশ হলেও তা মূল্যস্ফীতি ও দুর্বল মুদ্রানীতিতে ক্ষয়প্রাপ্ত। জিম্বাবুয়ের মাথাপিছু আয় মাত্র ১ হাজার ২০০ ডলারের কাছাকাছি, যা এক সময়ের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির পতন, ব্যাপক বেকারত্ব ও দুর্নীতির ছাপ বহন করে।

২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, বতসোয়ানার বেকারত্বের হার প্রায় ২০ শতাংশের বেশি, যা কিছুটা উচ্চ হলেও সরকার তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান, ভোকেশনাল প্রশিক্ষণ ও বেসরকারি খাত সম্প্রসারণে কাজ করছে। অন্যদিকে জিম্বাবুয়ের প্রকৃত বেকারত্ব ৮০ শতাংশের কাছাকাছি।

পর্যটন খাতেও বৈপরীত্য চোখে পড়ে। বতসোয়ানার চোবে ন্যাশনাল পার্ক, ওকাভাঙ্গো ডেল্টা আজ আফ্রিকার ইকো-ট্যুরিজমের রোল মডেল। লাখো পর্যটক আসেন প্রতি বছর, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান বাড়ছে। জিম্বাবুয়ের ভিক্টোরিয়া ফলস আজও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে অটুট, কিন্তু নিরাপত্তাহীনতা ও অব্যবস্থাপনায় পর্যটক নেই বললেই চলে।

এ দুটি দেশের গল্প বলে দেয়—নেতৃত্বই ভবিষ্যতের পথ তৈরি করে। খামা যেখানে রাষ্ট্রকে দেখেছিলেন জনগণের সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে, মুগাবে রাষ্ট্রকে ব্যবহার করেছিলেন নিজের ক্ষমতা, সম্পদ ও প্রভাব টিকিয়ে রাখার যন্ত্র হিসেবে। আজ ভিক্টোরিয়া ফলসের স্রোতের নিচে দাঁড়িয়ে যদি কেউ বতসোয়ানার দিকে তাকান তাহলে দেখতে পাবেন একটি মুক্ত, নিরাপদ ও সমৃদ্ধিশালী গণতান্ত্রিক দেশ, যেখানে স্বাধীনতা থেকেই উন্নয়নের পথ খোলা হয়েছে। আর তার ঠিক বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে জিম্বাবুয়ে।

বাংলাদেশও স্বাধীনতা অর্জনের পর রাষ্ট্র নির্মাণের যাত্রায় একাধিকবার স্থিতিশীলতা হারিয়েছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আত্মত্যাগের যে ভিত্তি তৈরি হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে তা দুর্বল হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, সামরিক হস্তক্ষেপ, দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ও দলীয়করণ—সব মিলিয়ে একটি আমলাতান্ত্রিক এবং দলনির্ভর রাষ্ট্র কাঠামো গড়ে ওঠে, যা জনগণের কল্যাণের বদলে ক্ষমতা রক্ষায় নিবদ্ধ ছিল।

প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর হয়নি, বরং হয়ে উঠেছে গোষ্ঠীকেন্দ্রিক। স্বজনপ্রীতি, অলিগার্ক শ্রেণীর প্রভাব এবং রাজনৈতিক আনুগত্যই হয়ে উঠেছে নীতিনির্ধারণের ভিত্তি। মানবাধিকার ও মানবসম্পদ উন্নয়ন উপেক্ষিত থেকেছে। বিশেষ করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে কাঙ্ক্ষিত কোনো অগ্রগতি হয়নি। শিক্ষা ব্যবস্থাও বিভক্ত—যে কাঠামোতে একটি অভিন্ন নাগরিক চেতনা গঠনের সুযোগই নষ্ট হয়েছে। দেশের প্রাথমিক শিক্ষায় ১১ রকমের স্কুল, পাঁচ ধরনের কারিকুলাম বিদ্যমান। সমাজের প্রতিটি স্তরে ছিল বৈষম্য। যেখানে অন্তর্ভুক্তির বদলে বঞ্চনা চূড়ান্ত রূপ নিয়েছিল।

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান ছিল এ দীর্ঘকালীন অসমতা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে এক বিস্ফোরণ। ছাত্র-জনতার প্রত্যাশা ছিল—বাংলাদেশ নতুন এক পথে হাঁটবে। যে পথ

হবে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার এবং জবাবদিহির ভিত্তিতে একটি সত্যিকারের জনগণের

রাষ্ট্র গঠনের সূচনা।

কিন্তু অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাস্তবতায় সেই আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন দৃশ্যমান নয়। ভেঙে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হওয়ার বদলে আরো দুর্বল হয়ে পড়েছে, উত্থান ঘটেছে ‘মব কালচার’-এর। শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পরও পুরনো বন্দোবস্তেই ঘুরপাক খাচ্ছে দেশ। প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে ঘুস, দুর্নীতি ও আমলাতন্ত্রের দীর্ঘস্থায়ী উপস্থিতি এখনো বিদ্যমান। শেখ হাসিনা সরকারের রেখে যাওয়া ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটই পুরো সময়জুড়ে বহাল থেকেছে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে। গণ-আন্দোলনের পর গঠিত নতুন সরকার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য যে বাজেট ঘোষণা করেছে, তাতেও নেই কাঙ্ক্ষিত ভিন্নতা। অর্থনৈতিক নীতি পরিচালনায় এখনো আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) প্রভাব বিস্তার করছে। বাজেট প্রণয়ন থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক সংস্কারের নীতিকৌশল নির্ধারণেও তাদের শর্তই প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।

শিক্ষা খাতেও কোনো বড় সংস্কার হয়নি। নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় জনসম্পৃক্ততা ও জবাবদিহি এখনো অনুপস্থিত। অর্থনীতি, জ্বালানি, শিক্ষা ও প্রযুক্তিসহ স্বৈরশাসনের কাঠামোগত অস্তিত্ব একই রকম রয়েছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে নতুন বাংলাদেশের যে অধ্যায় শুরু হওয়ার কথা ছিল, সেই অধ্যায়ের শুরুটা ঠিক দৃশ্যমান হয়ে ওঠেনি। ফলে বাংলাদেশ এখনো সম্ভাবনা এবং বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে। যেখান থেকে একদিকে সম্ভাবনাময় বতসোয়ানার পথ, আর অন্য প্রান্তে জিম্বাবুয়ের ছায়া।

দেওয়ান হানিফ মাহমুদ: সম্পাদক, বণিক বার্তা

[লেখাটি তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন মাহফুজ রাহমান]

আরও