উপকূলীয় বনাঞ্চল ধ্বংসে অস্তিত্ব সংকটে মিরসরাইয়ের বন্যপ্রাণী

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে উপকূলীয় বনাঞ্চল উজাড়ের ফলে তীব্র খাদ্য ও আবাসস্থল সংকটে পড়েছে বন্যপ্রাণী।

বিশেষ করে বনাঞ্চলের আয়তন সংকুচিত হওয়ায় লোকালয়ে চলে আসা হরিণ প্রতিনিয়ত মানুষের হাতে শিকার হচ্ছে। গত কয়েক বছরে এ অঞ্চলে হরিণের সংখ্যা প্রায় ৮০ শতাংশ কমে গেছে বলে আশঙ্কা করছে বন বিভাগ। সম্প্রতি একটি মায়া হরিণ হত্যার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর এ সংকট নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

মিরসরাই উপকূলীয় বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ‘জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল’ (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগর) প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে উপজেলার সাহেরখালী, ইছাখালী ও মঘাদিয়া ইউনিয়নের উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ২২ হাজার ৩৩৫ একর বনাঞ্চল বেজা কর্তৃপক্ষকে হস্তান্তর করা হয়। একসময়ের নিবিড় এ বনাঞ্চলে কেওড়া, গেওড়া ও বাইন গাছের প্রাচুর্য ছিল। এটি ছিল হরিণ, শিয়াল, মেছোবাঘ, লজ্জাবতী বানর ও বিভিন্ন প্রজাতির সাপের নিরাপদ আবাস। তবে শিল্পনগরের অবকাঠামো নির্মাণের জন্য বনের সিংহভাগ ধ্বংস করায় এসব প্রাণী বিলুপ্তির পথে।

বন কর্মকর্তাদের তথ্য মতে, উপকূলীয় বনটিতে একসময় ১০-১২ হাজার হরিণ ছিল। বর্তমানে এর মাত্র ২০ শতাংশ অবশিষ্ট থাকতে পারে। গত তিন বছরে বন বিভাগ আটটি হরিণ উদ্ধার করেছে, যার মধ্যে চারটি ছিল মৃত। ২০২২ সালের ৪ মার্চ মঘাদিয়া ঘোনা এলাকা থেকে শরীরে আঘাতের চিহ্নসহ দুটি মৃত হরিণ উদ্ধার করা হয়। ধারণা করা হয়, বন হারিয়ে লোকালয়ে আসার সময় সড়ক দুর্ঘটনায় এগুলো প্রাণ হারায়। ২০২৩ সালের ১২ মে শিল্পনগর এলাকা থেকে আরো একটি মৃত হরিণ উদ্ধার করা হয়। সবশেষ গত ১৫ এপ্রিল শিল্পনগরের সিপি মোড় এলাকার একটি পরিত্যক্ত পাইপ থেকে একটি হরিণশাবক জীবিত উদ্ধার করে বনে অবমুক্ত করা হয়েছে।

ইছাখালী ইউনিয়নের উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দা নূর আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌আগে এ বনে অসংখ্য হরিণ ও বন্যপ্রাণী দেখা যেত। শিল্পনগরের কাজ শুরুর পর বনাঞ্চল ধ্বংস হওয়ায় এখন প্রাণীগুলো আর আগের মতো চোখে পড়ে না। আবাসস্থল না থাকায় হরিণগুলো অসহায় হয়ে পড়ছে এবং অনেকে এগুলো শিকার করে নিয়ে যাচ্ছে।

বন বিভাগ জানিয়েছে, বাস্তুসংস্থান রক্ষায় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে নেয়া বনাঞ্চলের মধ্য থেকে ৪ হাজার ১০৪ একর জমি ফেরত দিতে ২০২৪ সালে চিঠি লেখে বন মন্ত্রণালয়। তবে এখন পর্যন্ত ওই জমি ফেরত পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন মিরসরাই উপকূলীয় রেঞ্জ কর্মকর্তা শাহেনশাহ নাওশাদ।

এদিকে বন রক্ষায় ‘সুফল’ প্রকল্পের আওতায় বামনসুন্দর ও মঘাদিয়া বিটে নতুন করে ম্যানগ্রোভ বাগান সৃজনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে ১০০ হেক্টর জমিতে প্রায় সাড়ে চার লাখ চারা রোপণ করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন অর্থবছরে প্রায় ৪১ লাখ চারা রোপণ করা হয়েছে বলে দাবি করেছে উপকূলীয় বন বিভাগ। তবে নবনির্মিত এ বাগানগুলো বন্যপ্রাণীর জন্য পূর্ণাঙ্গ আবাসে পরিণত হতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন।

মিরসরাই উপকূলীয় রেঞ্জ কর্মকর্তা শাহেনশাহ নাওশাদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শিল্পায়নের কারণে বনাঞ্চল ধ্বংস হওয়ায় হরিণসহ বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়েছে। আমাদের ধারণা, গত কয়েক বছরে ৮০ শতাংশ হরিণ কমে গেছে। বনাঞ্চল ফেরত পাওয়ার বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের চিঠির এখনো কোনো অগ্রগতি নেই।’

তিনি আরো জানান, গত ১৪ এপ্রিলের হরিণ হত্যার ঘটনায় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইনে অজ্ঞাতনামা তিন থেকে চারজনকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে এবং বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোসাম্মৎ রাশেদা চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌মানুষের দ্বারা বনাঞ্চল উজাড়ের ফলে বন্যপ্রাণীর আশ্রয়ের জায়গা হারিয়ে যাচ্ছে। তারা কোথায় যাবে? যেকোনো বৃহৎ প্রকল্প নেয়ার আগে পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করা এবং বন্যপ্রাণীর জন্য বিকল্প অভয়ারণ্য নিশ্চিত করা জরুরি। তা না হলে এ ইকো-সিস্টেম পুরোপুরি ভেঙে পড়বে।’

আরও