ভারত উপমহাদেশের প্রাচীন মসজিদগুলোর মধ্যে অন্যতম শাহ সুজা মসজিদ। কুমিল্লা নগরীর পুরনো গোমতী নদীর কোলঘেঁষে মোগলটুলী এলাকায় মোগল স্থাপত্য শিল্পের অপূর্ব নিদর্শন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এ মসজিদ। ১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট শাহজাহানের আমলে শাহ সুজা এটি নির্মাণ করেন। বর্তমানে শাহ সুজা মসজিদের পুরনো স্থাপত্যশৈলী ঠিক রেখে আধুনিক কারুকাজের সমন্বয়ে সামনের অংশ সম্প্রসারণ করা হয়েছে। কুমিল্লার অন্যান্য দর্শনীয় স্থানের মতো দেশী-বিদেশী পর্যটকদের কাছে শাহ সুজা মসজিদও মোগল স্থাপত্যের প্রাচীন কীর্তি।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা গেছে, ভারতীয় উপমহাদেশের শাসক সম্রাট আওরঙ্গজেবের ভাই বাংলার সুবাদার শাহজাদা সুজার নাম অনুসারে এটি ‘সুজা মসজিদ’ নামে পরিচিত। প্রাচীন এ মসজিদ দেখতে ও নামাজ আদায় করতে প্রতিদিনই কুমিল্লা নগরীর মোগলটুলী এলাকায় আসেন দেশ-বিদেশের দর্শনার্থীরা। তবে এর ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সার্বিক অবয়ব আভিজাত্যের প্রতীক বহন করে। মসজিদটি প্রতিষ্ঠার প্রকৃত সাল ও তারিখ সংরক্ষণ না থাকলেও জনশ্রুতি আছে ১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দে এটি নির্মিত হয়েছে। সে হিসেবে এ মসজিদের বর্তমান বয়স প্রায় চারশ বছর।
শাহ সুজা মসজিদের পুরনো স্থাপত্যশৈলী ঠিক রেখে আধুনিক কারুকাজের সমন্বয়ে সামনের অংশ সম্প্রসারণ করা হয়েছে। মসজিদের উত্তর-পূর্ব কোণে একটি সুউচ্চ মিনারও নির্মাণ করা হয়েছে। ফুল, লতাপাতা, জ্যামিতিক ও পদ্ম নকশায় অলংকৃত মসজিদের প্রবেশপথ, কেবলা প্রাচীর ও গম্বুজ। এছাড়া কলসি চূড়া দিয়ে সুশোভিত করা হয়েছে গম্বুজ। আয়তনের দিক দিয়ে খুব বেশি বড় না হলেও কৃষ্টি, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সার্বিক অবয়ব আভিজাত্যের প্রতীক বহন করছে শাহ সুজা মসজিদ। প্রাচীন এ মসজিদে জুমা, শবে বরাত, শবে কদরসহ ধর্মীয় বিশেষ দিনে মুসল্লি ও দর্শনার্থীরা বেশি ভিড় জমান।
মসজিদের খাদেম ও মুসল্লিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৮৭০ বর্গফুটের এ মসজিদে বর্তমানে মুসল্লিদের জন্য স্থান সংকুলান হয় না। যার কারণে বাইরে ত্রিপল দিয়ে মুসল্লিদের নামাজ আদায় করতে হয়। প্রাচীন এ স্থাপত্যের আদিরূপ বহাল রেখে মসজিদটি আরো সম্প্রসারণের দাবি সংশ্লিষ্টদের। মসজিদটির দৈর্ঘ্য ৫৮ ফুট ও প্রস্থ ২২ ফুট। উত্তর-দক্ষিণে লম্বা মসজিদের দেয়ালের পুরুত্ব ৫ ফুট ৮ ইঞ্চি। বারান্দা ২৫ ফুট। মসজিদের মূল গম্বুজ তিনটি। ছোট-বড় মিনার রয়েছে ১৮টি। মসজিদের সামনের সীমানায় দুটি করে বড় মিনার আছে। ২২ ফুট করে দুই কক্ষের ওপর আছে দুটি করে আরো চার মিনার।
ইতিহাসবিদদের মতে, এ মসজিদের উদ্বোধনী খুতবা পড়েছিলেন সম্রাট শাহজাহানের আত্মীয় ও মোগল বংশের লোক কাজী মনসুরুল হক। বেশ কয়েকবার এ মসজিদের সংস্কারকাজ হয়েছে। ১৮৮২ সালে জনৈক ইমাম উদ্দিন এ মসজিদের বারান্দা নির্মাণ করেন। ২০১০ সালের ২৪ জানুয়ারি শাহ সুজা মসজিদ কমিটি দুটি ফলকে এ মসজিদের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও সংক্ষিপ্ত স্থাপত্যিক বর্ণনা তুলে ধরেন। এতে পর্যটক ও মুসল্লিরা মসজিদের ইতিহাস জানতে পারেন।
এ মসজিদে ২৩ বছর ধরে নামাজ পড়ান মসজিদের খতিব মাওলানা মুফতি খিজির আহমদ কাসেমী। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে বহু মুসল্লি এখানে নামাজ পড়তে আসেন। মসজিদের ভেতরে ১৮টি কাতারে হাজারের বেশি মুসল্লির নামাজ পড়ার সুযোগ রয়েছে। জুমার নামাজে মসজিদের ভেতরে-বাইরে দুই হাজারের বেশি মুসল্লি আসেন। মুসল্লিদের জন্য স্থান সংকুলান হয় না। তাই মসজিদটি দোতলা করা দরকার।’