এক সপ্তাহ ধরে নৌযান বন্ধ, খাদ্যের মজুদ ফুরিয়ে আসছে সেন্ট মার্টিনে

কক্সবাজারের সেন্ট মার্টিন দ্বীপে চলাচলকারী ট্রলারকে লক্ষ্য করে মিয়ানমার থেকে গুলিবর্ষণ করা হয়েছে।

কক্সবাজারের সেন্ট মার্টিন দ্বীপে চলাচলকারী ট্রলারকে লক্ষ্য করে মিয়ানমার থেকে গুলিবর্ষণ করা হয়েছে। এর পর থেকে টেকনাফ-সেন্ট মার্টিন রুটে কোনো নৌযান ছেড়ে যায়নি। সাতদিন ধরে বন্ধ রয়েছে ট্রলার চলাচল। সরবরাহ বন্ধ থাকায় ফুরিয়ে আসছে চালসহ নিত্যপণ্যের মজুদ। এতে খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছে দ্বীপটির বাসিন্দারা। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে সংকট চরম আকার ধারণ করবে বলেও আশঙ্কা তাদের।

দ্বীপের বাসিন্দারা জানায়, নৌ চলাচল বন্ধ থাকায় সাতদিন ধরে দ্বীপের মানুষ জরুরি প্রয়োজনে টেকনাফ যেতে পারছে না। টেকনাফ থেকেও সেন্ট মার্টিনে পাঠানো যাচ্ছে না চাল, ডাল, ডিম, মুরগি, ভোজ্যতেল, জ্বালানি, শাকসবজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য। ফলে দ্বীপে খাদ্যসহ নিত্যপণ্যের সংকট দেখা দিয়েছে।

গতকাল সেন্ট মার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান জানান, ট্রলার চলাচল বন্ধ রয়েছে। স্পিডবোট চলাচলও বন্ধ। যাতায়াতে সমস্যা হচ্ছে। অনেকেই সেন্ট মার্টিনে আসতে পারছে না। আবার সেন্ট মার্টিন থেকে যেতেও পারছে না। এতে দ্বীপের বাসিন্দারা তীব্র খাদ্য সংকটে পড়েছে। দ্বীপে যে চাল মজুদ আছে তাতে দুই-একদিন চলতে পারে। সবজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আগেই শেষ হয়ে গেছে। দ্রব্যমূল্য বেড়ে গেছে কয়েক গুণ। এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে দ্বীপবাসীর খাদ্য সংকট আরো চরম আকার ধারণ করতে পারে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার টেকনাফ-সেন্ট মার্টিন রুটে চলাচলকারী কয়েকটি ট্রলারকে লক্ষ্য করে মিয়ানমার থেকে গুলি ছোড়া হয়। নাফ নদীর মোহনায় এ ঘটনাগুলো ঘটে। এর পর থেকে সেন্ট মার্টিনের পথে কোনো নৌযান ছেড়ে যায়নি। সর্বশেষ মঙ্গলবার সকালে বাংলাদেশী স্পিডবোট লক্ষ্য করে মিয়ানমার থেকে গুলি ছোড়া হয়েছে। মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি), নাকি বিদ্রোহী আরাকান আর্মি গুলি ছুড়েছে তা কেউ নিশ্চিত করতে পারেনি।

দ্বীপের বাসিন্দারা জানান, টেকনাফ থেকে সেন্ট মার্টিন ফেরার পথে স্পিডবোট লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়। ছোট ডিঙি নৌকায় নদীতে নেমে গুলিবর্ষণ করা হয়। এ সময় স্পিডবোটে থাকা যাত্রীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। যদিও তারা সেন্ট মার্টিনে নিরাপদে পৌঁছেছে।

এর আগে মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী নাইক্ষ্যংদিয়া থেকে সেন্ট মার্টিনগামী পণ্যবাহী ট্রলার এবং বাংলাদেশের নির্বাচনী কর্মকর্তাদের ওপর গুলি ছোড়া হয়েছে। ওই এলাকাটি বর্তমানে আরাকান আর্মির দখলে রয়েছে বলে জানা গেছে। তারাই গুলি ছুড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

দ্বীপের বাসিন্দা অ্যাডভোকেট এম কেফায়েত উল্লাহ জানান, ৫ জুন থেকে সেন্ট মার্টিনের মানুষ শান্তিতে নেই। কোথাও আসা-যাওয়া করতে পারছে না। টেকনাফ থেকে খাদ্যসামগ্রীও আনা-নেয়া করা যাচ্ছে না। একদিকে গুলি আতঙ্ক, অন্যদিকে নিরাপত্তা ও খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে।

তৈয়ব উল্লাহ জানান, জরুরি ভিত্তিতে কক্সবাজার বা ইনানী নেভির জেটিঘাট থেকে সেন্ট মার্টিন রুটে সমুদ্রে চলাচলের উপযোগী জাহাজ চালু করা প্রয়োজন। দ্রুতই বিকল্প ব্যবস্থা না নিলে সেন্ট মার্টিনের মানুষের ক্ষতি হয়ে যাবে।

দ্বীপের আরেক বাসিন্দা আব্দুল মালেক জানান, দ্বীপে এখন চরম খাদ্য সংকট। নিত্যপণ্য একদম নেই। এছাড়া ভোজ্য ও জ্বালানি তেলের সংকটও দেখা দিয়েছে। ঈদের ঠিক আগ মুহূর্তে এ সংকটের কারণে দুশ্চিন্তায় রয়েছে দ্বীপের ১০ হাজার মানুষ।

এদিকে খাদ্য ও পণ্যবাহী বোট চলাচল করতে না পারায় সেন্ট মার্টিনের দোকানগুলোয় মজুদ করা খাদ্যপণ্য শেষ হতে চলেছে। এ সুযোগে কিছু ব্যবসায়ী পণ্যের দাম দ্বিগুণ নিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। দ্রুত সামাধান না হলে দ্বীপবাসীর খাদ্য, চিকিৎসাসহ অন্যান্য সমস্যা আরো বাড়তে পারে বলে ধারণা স্থানীয়দের।

দ্বীপের পূর্ব দিকে জেটিঘাটে কয়েকশ দোকান, হোটেল ও রেস্তোরাঁ নিয়ে সেন্ট মার্টিনের প্রধান বাজার। তবে অধিকাংশ দোকানপাটে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রীর মজুদ নেই। কয়েকটি দোকানে কিছু সবজি, চাল, আটা, ময়দা, ভোজ্যতেল, জ্বালানি থাকলেও তা বিক্রি হচ্ছে অতিরিক্ত দামে। বাজারের উত্তর পাশে একটি দোকানে গতকাল একটি ডিম বিক্রি হয়েছে ২০ টাকায়। এক কেজি আলু ৯০ টাকায়।

দোকানি মো. হোসেন বলেন, ‘ছয়-সাতদিন ধরে নৌযান চলাচল বন্ধ, টেকনাফ থেকে খাদ্যসামগ্রী ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আনা যাচ্ছে না। কোরবানির ঈদ উপলক্ষে ১০ দিন আগে ৩ লাখ টাকার সয়াবিন তেল, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, ডিম ও চাল নিয়ে এসে গুদামে মজুদ করেছিলাম। মানুষের কষ্ট হচ্ছে দেখে মজুদ করা পণ্য বিক্রি করছি। গুলিবর্ষণ বন্ধ না হলে দ্বীপের মানুষ না খেয়ে মরবে।’

সেন্ট মার্টিন বাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক ইউপি সদস্য হাবিবুল্লাহ খান বলেন, ‘টেকনাফের সঙ্গে নৌ-যোগাযোগ বন্ধ থাকার কারণে দ্বীপে খাদ্যসামগ্রী ও নিত্যপণ্যের সংকট দেখা দিয়েছে। বাজারে ৯৬টি দোকান, ১০টি সবজি ও ১০টি চাল বিক্রির দোকান খালি হয়ে পড়েছে।’

সেন্ট মার্টিন স্পিডবোট মালিক সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক খোরশেদ আলম বলেন, ‘বোটে প্রকাশ্যে গুলি করতে দেখে মানুষ ভয়ে আর নৌ-রুটে চলাচল করছে না। তাছাড়া ওই রুট ছাড়া সেন্ট মার্টিনে আসার বিকল্প কোনো ব্যবস্থা বা রুটও নেই। প্রতিদিন সেন্ট মার্টিন-টেকনাফ নৌ-রুটে চারটি ট্রলার ও ছয়টি স্পিডবোটের মাধ্যমে শতাধিক মানুষ আসা-যাওয়া করে। পাশাপাশি খাদ্য ও নিত্যপণ্য বহন করা হয়। এখন তারা মহাসংকটে রয়েছে।

এ ব্যাপারে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আদনান চৌধুরী জানান, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে। সেখানকার পরিস্থিতি খুবই খারাপ। এ অবস্থা চলতে থাকলে দ্বীপে অবস্থানরত মানুষ খাদ্য সংকটে পড়বে। ওই এলাকায় মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনী, নাকি বিদ্রোহীরা গুলি চালাচ্ছে তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ ইয়ামিন হোসেন বলেন, ‘সম্প্রতি মিয়ানমার থেকে ট্রলার ও স্পিডবোট লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হচ্ছে। তাই ওই রুটে নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে। তবে শাহপরীর দ্বীপ অংশ থেকে বিকল্প পদ্ধতিতে বঙ্গোপসাগর হয়ে সেন্ট মার্টিন যাওয়া যায় কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

আরও