বারবার বালাইনাশক প্রয়োগ করেও প্রতিকার না মেলায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকরা। এরই মধ্যে কয়েক হাজার হেক্টর জমির ধানের শীষ নষ্ট হয়েছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কায় ভুগছেন চাষীরা।
জেলার বিভিন্ন উপজেলা ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ বোরো ধানের জমিতেই মাজরা পোকার ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। দূর থেকে বোঝা না গেলেও কাছাকাছি গেলে দেখা যায়, ধানের ভেতরে ভেতরে শুকিয়ে সাদা শীষ দাঁড়িয়ে আছে। এ পোকার আক্রমণে ধান গাছের কাণ্ড কেটে যাচ্ছে, ফলে শীষ বের হওয়ার আগেই গাছ শুকিয়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আবার অনেক খেতে শীষ বের হলেও ভেতর থেকে কেটে দেয়ায় শীষ সাদা হয়ে ধানে চিটা দেখা দিচ্ছে। অনেক খেতেই জমির উল্লেখযোগ্য অংশ এরই মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব মতে, চলতি মৌসুমে মেহেরপুর জেলায় ১৯ হাজার ৪৩০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় তিন হেক্টর বেশি। তবে মৌসুমের প্রায় শেষ সময়ে এমন পোকার আক্রমণে বড় ধরনের ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
গাংনী উপজেলার কৃষক নূর হোসেন বলেন, ‘আমার দেড় বিঘা জমিতে মাজরা পোকার মারাত্মক আক্রমণ হয়েছে। অনেকবার বিষ দিয়েও কাজ হচ্ছে না। প্রায় চার আনা ধান নষ্ট হয়ে গেছে। আমরা চাষীরা এখন দিশেহারা। সরকারকে আমাদের পাশে দাঁড়াতে হবে।’
আরেক কৃষক ওমর আলী বলেন, ‘আড়াই বিঘা জমির ধান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দোকান থেকে বারবার নতুন নতুন কীটনাশক নিচ্ছি, কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না। বড় বড় শীষ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আগে বিঘাপ্রতি ২০ মণ ধান হওয়ার আশা ছিল, এখন ১০-১২ মণের বেশি হবে না মনে হচ্ছে।’
মেহেরপুর সদর উপজেলার কৃষক জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমার চার বিঘা জমির বড় একটি অংশ মাজরা পোকার আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রতি বিঘায় মেশিন ভাড়া ৪ হাজার টাকা। সার, কীটনাশক, রোপণ ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে ১৩ থেকে ১৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়। বর্গাচাষীদের খরচ আরো বেশি। এভাবে ফসল নষ্ট হলে আমরা কোথায় দাঁড়াব?’
কৃষকরা জানান, কয়েক দফা বালাইনাশক প্রয়োগ করেও পোকার দমন সম্ভব হচ্ছে না। এতে একদিকে উৎপাদন খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে ফলন কমে যাওয়ার শঙ্কায় হতাশ হয়ে পড়ছেন তারা।
এ বিষয়ে গাংনী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মতিয়ার রহমান বলেন, ‘অতিরিক্ত নাইট্রোজেন সার, বিশেষ করে ইউরিয়া ও ডিএপি ব্যবহারের ফলে মাজরা পোকা ও পাতা মরা রোগের আক্রমণ বাড়তে পারে।’ তাই কৃষকদের সুষম সার ব্যবহারের পাশাপাশি সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা অনুসরণের পরামর্শ দেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘অন্যান্য জেলার তুলনায় মেহেরপুরে দেরিতে ধান রোপণ করা হয়। পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে ডিলারদের পরামর্শে নিষিদ্ধ কীটনাশক ব্যবহার এবং রেড মিনিকেটসহ অনিবন্ধিত জাতের ধান চাষের প্রবণতা রয়েছে।’ এসব পরিহার করে উচ্চফলনশীল নিবন্ধিত জাতের ধান চাষে কৃষকদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সনজীব মৃধা বলেন, ‘ধানের ক্ষতির পেছনে আবহাওয়া, তাপমাত্রা ও পরিচর্যার ঘাটতিসহ বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। তবে কৃষি বিভাগ সবসময় কৃষকদের পাশে রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। কৃষকরা যে পরিমাণ ক্ষতির আশঙ্কা করছেন, বাস্তবে ততটা ক্ষতি নাও হতে পারে। কারণ ধান এখন শেষ পর্যায়ে রয়েছে, ফলে ফলন পুরোপুরি কমে যাওয়ার আশঙ্কা কম।’