সাতক্ষীরার দিগন্তজোড়া খেতে ঝুলছে লাল-সবুজ আর ভিন্ন রঙের রসাল তরমুজ। বারোমাসি ফল হলেও বাজারে এর আকর্ষণ রয়েছে বেশ। চাহিদার সঙ্গে মিলিয়ে দামও মিলছে চমৎকার। নতুন এ সম্ভাবনার আশায় উচ্ছ্বসিত প্রান্তিক কৃষকের মুখে এখন লেগে আছে বিজয়ের হাসি।
জানা গেছে, সাতক্ষীরায় বারোমাসি তরমুজ চাষ করে ব্যাপক সাফল্য পাচ্ছেন স্থানীয় কৃষকরা। বাজারে ভালো চাহিদা ও চড়া দাম থাকায় প্রান্তিক চাষীরা এ ফসল উৎপাদনে ঝুঁকছেন। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মতে, এটি একটি স্বল্পমেয়াদি ও লাভজনক ফসল। প্রতি বিঘা জমিতে চাষ করে এক-দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত লাভ করা সম্ভব। ধান বা সবজির তুলনায় এর উৎপাদন খরচ অনেক কম।
কৃষকদের এ সাফল্যের পেছনে কাজ করছে সমন্বিত সহায়তা। পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) ও ‘উন্নয়ন প্রচেষ্টা’ যৌথভাবে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। পাশাপাশি বিনামূল্যে উন্নত জাতের বীজ ও সার সরবরাহ করে বারোমাসি তরমুজ চাষে সহযোগিতা করছে।
তালা উপজেলার ভায়ড়া গ্রামের কৃষক ইকবাল হোসেন জানান, অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি তিন বছর ধরে দেড় বিঘা জমিতে বারোমাসি তরমুজ চাষ করছেন। চলতি বছরও একই পরিমাণ জমিতে ফসলটি চাষ করেছেন। তিনি বলেন, ‘জমি চাষ, বীজ রোপণ, সেচ, সার-কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি দিয়ে প্রতি বিঘায় ২৮-৩০ হাজার টাকা খরচ হয়। সেখানে প্রতি বিঘায় ১০০-১২০ মণ পর্যন্ত তরমুজ উৎপাদন হয়। যার বাজারমূল্য ১ লাখ ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে বিঘায় ১ লাখ ৪০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত লাভ হয়।’ ইকবাল হোসেন আরো জানান, বারো মাসই তিনি ধান, পাট ও সবজিসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদন করেন। কিন্তু বারোমাসি তরমুজ স্বল্প সময়ে খুব লাভজনক ফসল।
এর আগে ২০২৩ সালে পিকেএসএফ ও উন্নয়ন প্রচেষ্টা তাদের গ্রামের কিছু সংখ্যক প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষককে বারোমাসি তরমুজ চাষের ওপর প্রশিক্ষণ দেয়। প্রশিক্ষণ নিয়ে বারোমাসি তরমুজ চাষ শুরু করেন ইকবাল হোসেন।
শুধু ইকবাল হোসেন নন, তালা উপজেলার তেঁতুলিয়া গ্রামের কৃষক আব্দুল হান্নান, শিপন বিশ্বাস ও শিরিনা বেগম। চলতি বছর তারা সবাই এক-দেড় বিঘা জমিতে এ তরমুজ চাষ করেছেন। এক-দেড় সপ্তাহ ধরে তরমুজ বিক্রি করছেন। পাশের খুলনা জেলা থেকে পাইকাররা এসে খেত থেকে তরমুজ কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। এ কৃষকরা জানান, পাইকারি হিসেবে তারা প্রতি মণ তরমুজ ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা দরে বিক্রি করছেন। খেতে এখনো যে পরিমাণ তরমুজ আছে তা বিক্রি হলে প্রত্যেকের উৎপাদন খরচ উঠে ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ হতে পারে।
শহরের পাকাপুলের মোড় এলাকার ফল ব্যবসায়ী সোহেল হোসেন জানান, বারোমাসি তরমুজের চাহিদা খুবই ভালো। ভিন্ন রঙ ও আকারে ছোট হওয়ায় এটি সব ধরনের ক্রেতা পছন্দ করে। বর্তমান খুচরা পর্যায়ে প্রতিটি তরমুজ ৭০-৭৫ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।
সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে জানান, স্বল্প সময়ের জন্য ফসলটি খুব লাভজনক। এটি জেলার কৃষকদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় উঠছে।
তিনি বলেন, ‘২০২২-২৩ মৌসুমে মাত্র আট হেক্টর দিয়ে শুরু হলেও বর্তমানে ১৫০ হেক্টর পেরিয়ে গেছে বারোমাসি তরমুজ চাষ। ভালো ফসল হলে বিঘায় দেড়-দুই লাখ টাকা পর্যন্ত লাভ করা সম্ভব। এরই মধ্যে জেলার প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকের পাশাপাশি কোনো কোনো এলাকার মৎস্যচাষীরাও তাদের ঘেরের বেড়িবাঁধে এটি চাষ করে লাভবান হচ্ছেন।’