হাজার কোটি টাকার রক্ষণাবেক্ষণ প্রকল্প

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বিলম্বিত সংস্কারে বেড়েছে ভোগান্তি ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি

প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রকল্পটির মূল অনুমোদিত ব্যয় ছিল ৭৯৩ কোটি ১৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা। প্রথম সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯৮০ কোটি ২৫ লাখ টাকায়।

দেশের প্রধান বাণিজ্যিক করিডোর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণে প্রায় ৯৮০ কোটি টাকার প্রকল্প নিয়েও কমছে না ভোগান্তি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজে ধীরগতি, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণে ঘাটতি ও সংস্কারে দীর্ঘসূত্রতায় মহাসড়কটির বিভিন্ন অংশে তৈরি হয়েছে খানাখন্দ। কমেছে যানবাহনের গতি, বাড়ছে যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি। চট্টগ্রাম বন্দরের আমদানি-রফতানি পণ্য ও শিল্পের কাঁচামাল পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ এ করিডোরে সড়কের বেহাল দশায় বাড়ছে পরিবহন ব্যয়ও। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, চার লেনে উন্নীত করার এক দশক পর ঢাকা-চট্টগ্রাম যাতায়াতে এখন ২ থেকে ৩ ঘণ্টা বেশি সময় লাগছে।

কুমিল্লার দাউদকান্দি থেকে চট্টগ্রাম সিটি গেট পর্যন্ত ১৯২ দশমিক ৩০ কিলোমিটার মহাসড়কটি চার লেনে উন্নীত করার কাজ শেষ হয় ২০১৬ সালের জুনে। শুরুতে দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয় ধরা হলেও শেষ পর্যন্ত তা গিয়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৮১৭ কোটি টাকায়। কয়েক বছরের মধ্যেই সড়কের বিভিন্ন অংশে পেভমেন্টের ক্ষয়, রাটিং ও খানাখন্দ দেখা দিলে নিয়মিত মেরামতের জন্য প্রকল্প নেয় সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর। মূল অনুমোদিত ৭৯৩ কোটি টাকার প্রকল্পের ব্যয় প্রথম সংশোধনীতে বেড়ে ৯৮০ কোটি ২৫ লাখ টাকায় দাঁড়ায়। মেয়াদও বাড়ানো হয়। কিন্তু বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও সড়কের বিভিন্ন অংশে মেরামতজনিত ভোগান্তি অব্যাহত রয়েছে।

সরজমিনে দাউদকান্দি থেকে চট্টগ্রামের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখা গেছে, মহাসড়কের বিভিন্ন লেনে ছোট-বড় গর্ত, উঠে গেছে বিটুমিনাস কার্পেটিং, কোথাও ডেবে গেছে সড়কের ওপরের স্তর। কিছু স্থানে গর্ত ইট ও ইটের খোয়া দিয়ে ভরাট করা হয়েছে। মধ্যবর্তী বিভাজকে আগাছা ও জমে থাকা মাটি পানি নিষ্কাশনে বাধা তৈরি করছে। বর্ষা মৌসুমের শেষার্ধেও অনেক স্থানে সংস্কারকাজের দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। এতে যানবাহনের গতি কমার পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

সড়কটির রক্ষণাবেক্ষণ প্রকল্পে অনিয়ম ও ধীরগতির চিত্র উঠে এসেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনেও। এতে মেরামত করা অংশে ফাটল, পানি নিষ্কাশনের নালা বন্ধ, সড়কের পাশের মাটির অংশ ক্ষয়ে যাওয়া এবং কাজের মান নিয়ন্ত্রণে ঘাটতির কথা বলা হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রকল্পটির মূল অনুমোদিত ব্যয় ছিল ৭৯৩ কোটি ১৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা। প্রথম সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯৮০ কোটি ২৫ লাখ টাকায়। ব্যয় বাড়ে ১৮৭ কোটি ১০ লাখ ৬০ হাজার টাকা বা ২৩ দশমিক ৫৯ শতাংশ। মূল মেয়াদ ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত থাকলেও সংশোধিত মেয়াদ নির্ধারণ করা হয় ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত।

জানা গেছে, প্রকল্পটিতে ভৌত অগ্রগতির তুলনায় আর্থিক অগ্রগতি ছিল বেশি। অর্থাৎ কাজ কম করেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থ ছাড় করিয়ে নিয়েছে। প্রকল্পের আওতায় দুটি প্যাকেজে সড়কের রাটিং সংশোধন, পেভমেন্ট মেরামত, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং ট্রাফিক সাইন স্থাপনের কাজ দেয়া হয়। তবে মেরামতের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে আইএমইডি। সরকারি পরীক্ষায় কোর কাটিংয়ের মাধ্যমে সড়কের ওয়্যারিং কোর্সের পুরুত্ব ৫০ মিলিমিটার পাওয়া গেলেও মেরামত করা বিভিন্ন অংশে হেয়ারলাইন ক্র্যাক বা সূক্ষ্ম ফাটল দেখা যায়। নির্ধারিত সময়ে এসব ফাটল মেরামতের সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি। প্রতিবেদনে ১৯২ দশমিক ৬০০ কিলোমিটার এবং ৭৩ দশমিক ৭০০ থেকে ৭৩ দশমিক ৮৫০ কিলোমিটার চেইনেজের নির্দিষ্ট অংশে ফাটলের উল্লেখ রয়েছে।

এছাড়া বিভাজকে আগাছা ও ইঁদুরের গর্ত থেকে বের হওয়া মাটি জমে পানি নিষ্কাশনের নালা বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি আইএমইডির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এতে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হয়ে পেভমেন্টের স্থায়িত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। সড়কের পাশের মাটির অংশ বা সফট শোল্ডারের ক্ষয় এবং নিয়মিত মেরামতের ঘাটতিও চিহ্নিত করেছেন পরিদর্শনকারী কর্মকর্তারা।

সড়কের দুরবস্থার প্রভাব পড়ছে পণ্য পরিবহনেও। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে আমদানি করা পণ্য, শিল্পের কাঁচামাল ও রফতানিপণ্য পরিবহনে বিলম্ব হওয়ায় ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের ট্রিপ সম্পন্ন করতে বেশি সময় লাগছে। এতে পরিবহন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।

জানতে চাইলে সওজ অধিদপ্তরের কুমিল্লা জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সাদেকুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্ষা মৌসুমের মাঝামাঝি ও শেষার্ধে মেরামতকাজ করতে কিছুটা বেগ পেতে হয়। আবার যানবাহনের চাপ বেশি থাকায় মেরামতের পরও দ্রুত সড়কের কিছু অংশ পুনরায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে বর্তমানে তদারকি বাড়ানো হয়েছে।’ দ্রুত সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে মেরামত করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

জানতে চাইলে সওজ অধিদপ্তরের কুমিল্লা জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সাদেকুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রকল্পের অধীনে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত মেরামত কাজ করে। তবে বর্ষা মৌসুমের মাঝামাঝি ও শেষার্ধে মেরামত কাজ করতে কিছুটা বেগ পেতে হয়। আবার মেরামতের পরও দ্রুত সময়ের মধ্যে পুনরায় মেরামতযোগ্য হয়ে যায়। যানবাহনের চাপ বেশি হওয়ায় কিছুটা যানজট ও যানবাহনের গতিবেগ কমলেও বর্তমানে সওজ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে তদারকি বাড়ানো হয়েছে। আশা করি দ্রুত সময়ের মধ্যে পুরো সড়কটির সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে মেরামত করা সম্ভব হবে।’

সওজ-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুরুতে প্রকল্পের মেয়াদ চার বছরের ছিল। কিন্তু লক্ষ্যমাত্রা অর্জন না হওয়ায় ব্যয় বাড়িয়ে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়েছে। বিদ্যমান ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো অবশ্য শর্ত অনুযায়ী নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ কাজ করতে পারেনি। সরকারি মেরামতকাজ বিলম্বিত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে হাজার কোটি টাকার চুক্তিতে নিয়োগ করা হয়েছে। এখন তারাও যদি মেরামতকাজ সম্পন্ন করতে দীর্ঘসূত্রতা দেখায় তবে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মতো সড়ক ব্যবস্থাপনায় সরকারের বিকল্প চিন্তা করা ছাড়া উপায় থাকবে না বলে মনে করছেন তারা।

এ বিষয়ে সওজের চট্টগ্রাম জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল হালিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সম্প্রসারণ কাজের সময় প্রাক্কলন করা যানবাহনের দ্বিগুণ চলাচল করছে বর্তমানে। ফলে মেরামত করা হলেও দ্রুত খানাখন্দসহ নানান জটিলতা তৈরি হচ্ছে সড়কে। আবার প্রকল্পের অধীনে ঠিকাদার নিয়োগ পেলেও তারা পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি ও জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে গাফিলতি দেখায়। তবে চট্টগ্রাম অংশের সড়কটির কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সওজ নিয়মিত মনিটরিং কার্যক্রম বজায় রেখেছে। আগামী ফেব্রুয়ারিতে প্রকল্পের এ অংশের মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে।’ এরই মধ্যে নতুন করে একটি প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

আরও