আন্তর্জাতিক ফোরামে আমাদের প্রয়োজন দক্ষ নেগোসিয়েটর

-শরীফ জহীর,

চেয়ারম্যান,

ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক ও অনন্ত গ্রুপ

আমাদের তৈরি পোশাক খাত আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে গৌরবময় অবস্থান তৈরি করেছে। বিশ্বের সবচেয়ে বেশিসংখ্যক প্লাটিনাম সার্টিফায়েড পরিবেশবান্ধব কারখানা এখন বাংলাদেশে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সম্প্রতি ৩ দশমিক ২ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে। আমাদের প্রাথমিক উদ্বেগের বিষয় হলো এ প্রবৃদ্ধি। বাংলাদেশ একটি সম্ভাবনাময় তরুণ জনগোষ্ঠীর দেশ। এ জনমিতিক লভ্যাংশকে যদি আমরা সঠিকভাবে কাজে লাগাতে না পারি, তবে তা দেশের জন্য একসময় বিশাল বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। তাই নীতি নির্ধারণ বা পরিবেশবান্ধব টেকসই উন্নয়নের কথা ভাবার সময় আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং জলবায়ু ও পরিবেশের সুরক্ষার মধ্যে একটি যথাযথ ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।

কপ৩১ সম্মেলনের মতো আন্তর্জাতিক প্লাটফর্মে আমাদের প্রতিনিধি দলকে অত্যন্ত কঠোর ও দক্ষ নেগেসিয়েটর বা দরকষাকষিকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করতে হবে। উন্নত দেশগুলো ২০৫০ সালের মধ্যে প্রতি বছর ৮-৯ বিলিয়ন ডলার হিসেবে মোট ২৩০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতিপূরণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে আমাদের ভূমিকা নগণ্য। সাম্প্রতিক জাতিসংঘ সম্মেলনে নেপালের তরুণ প্রধানমন্ত্রী যেভাবে বিশ্বের দরবারে জলবায়ু ন্যায়বিচারের কথা তুলে ধরেছেন এবং বাংলাদেশের কথা উল্লেখ করেছেন, আমাদেরও একইভাবে নিজেদের প্রস্তুত করে উন্নত ও ধনী দেশগুলোর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণের ন্যায্য হিস্যা আদায়ে জোরালো দরকষাকষি করতে হবে।

আমাদের তৈরি পোশাক খাত আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে গৌরবময় অবস্থান তৈরি করেছে। বিশ্বের সবচেয়ে বেশিসংখ্যক প্লাটিনাম সার্টিফায়েড পরিবেশবান্ধব কারখানা এখন বাংলাদেশে। লিড সনদ অর্জনে অতিরিক্ত বিনিয়োগ করতে হলেও এজন্য ক্রেতারা আমাদের কোনো বাড়তি অর্থ দিচ্ছেন না, তবুও শিল্প খাতের নীতি ও নৈতিকতার অংশ হিসেবে এবং বাংলাদেশী উদ্যোক্তাদের দায়িত্বশীলতার কারণে আমরা এ সাহসী পদক্ষেপ নিতে পেরেছি। ১ শতাংশ কর ছাড়ের সুবিধার কারণে এরই মধ্যে ৫০০টিরও বেশি কারখানা লিড সনদের জন্য আবেদন করেছে এবং ২৯০টিরও বেশি কারখানা সনদ পেয়েছে, যার মধ্যে ১২৫টিই প্লাটিনাম সার্টিফায়েড। ২০১৩ সালের পর অ্যাকর্ড, অ্যালায়েন্স এবং পরবর্তী সময়ে আরএমজি সাসটেইনেবিলিটি কাউন্সিলের (আরএসসি) নীতি মেনে চলার জন্য আমরা কেবল কারখানার অবকাঠামো ও নিরাপত্তার মানোন্নয়নে ৩ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ করেছি।

এখন আমাদের প্রয়োজন এ সাফল্যকে বিশ্বদরবারে ইতিবাচকভাবে ব্র্যান্ডিং করা। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে বাংলাদেশে তৈরি একটি ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের স্যুট পরিহিত অবস্থায় দেখা গেছে। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয়। তবে নাইকি, অ্যাডিডাসের মতো প্রিমিয়াম বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডগুলো এখনো বাংলাদেশে আসার বদলে পাকিস্তান বা ভিয়েতনামে বিনিয়োগ করছে। কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগের পরও কেন আমরা প্রিমিয়াম বা হাই-এন্ড ক্রেতাদের আকর্ষণ করতে পারছি না, সে বিষয়ে কাজ করতে হবে। প্রতিটি বিনিয়োগের বিপরীতে উপযুক্ত অর্থনৈতিক সুফল অর্জন করতে হবে। তাই উদ্যোক্তাদের প্রতি আহ্বান, আমাদের ইতিবাচক ব্র্যান্ডিং বাড়াতে হবে এবং ক্রেতাদের সঙ্গে শক্তভাবে দরকষাকষি করতে হবে।

শিল্পের উৎপাদন ব্যয় কমাতে সৌরবিদ্যুৎ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টায় খরচ ৬ সেন্টেরও কম হতে পারে, যা জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের তুলনায় সাশ্রয়ী। দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন, গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড এবং ব্যাংকিং সহায়তা বাড়ালে শিল্পে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার আরো সম্প্রসারিত হবে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে উপযুক্ত খাসজমি ব্যবহার করে আগামী পাঁচ বছরে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগও রয়েছে।

পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নের পাশাপাশি নগর ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তন প্রয়োজন। অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ, পয়োবর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতি ও বায়ুদূষণ ঢাকা শহরকে বসবাসের অনুপযোগী করে তুলছে। ট্রানজিটভিত্তিক স্যাটেলাইট সিটি ও পরিকল্পিত গেটেড কমিউনিটি গড়ে তোলার পাশাপাশি বর্জ্য শোধন, পানি পুনর্ব্যবহার ও স্বাস্থ্যকর অভ্যন্তরীণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

ব্যাংক খাতও টেকসই অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক ২০৪০ সালের মধ্যে নিট শূন্য কার্বন নিঃসরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে গ্রিন ফাইন্যান্সের সুবিধা সম্প্রসারণে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন ও নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিল্প ও ব্যাংক খাতে বাড়াতে হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং স্মার্ট প্রযুক্তির ব্যবহার।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান অপরিহার্য। একটি পোশাক কারখানার তরুণ কর্মীর আয় তার পুরো পরিবারের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। তাই জমি, গ্যাস ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এদেশের সামনে সম্ভাবনা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে প্রবৃদ্ধি, পরিবেশ ও কর্মসংস্থান নিয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সরকার, উদ্যোক্তা, ব্যাংক, উন্নয়ন সহযোগী ও তরুণ জনগোষ্ঠীর সমন্বিত উদ্যোগেই টেকসই, প্রতিযোগিতামূলক ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।

আরও