চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল

অবকাঠামো সংকট ও নিরাপত্তাহীনতায় ধুঁকছে চিকিৎসাসেবা

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল বন্দরনগরীর অন্যতম প্রাচীন স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র। তবে হাসপাতালটি অবকাঠামো ও জনবল সংকটে জর্জরিত। ২৫০ শয্যার অনুমোদন থাকলেও এটি চলছে ১৫০ শয্যার জনবল কাঠামোয়।

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল বন্দরনগরীর অন্যতম প্রাচীন স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র। তবে হাসপাতালটি অবকাঠামো ও জনবল সংকটে জর্জরিত। ২৫০ শয্যার অনুমোদন থাকলেও এটি চলছে ১৫০ শয্যার জনবল কাঠামোয়। পুরনো ও জরাজীর্ণ ভবন, সংকীর্ণ জায়গা, পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতির অপ্রতুলতা ও অরক্ষিত পরিবেশে প্রতিদিনই ব্যাহত হচ্ছে সেবা। সংকটময় অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তিন বছর আগে ১০ তলার দুটি ভবন নির্মাণের প্রস্তাব উঠলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। এছাড়া পর্যাপ্ত নিরাপত্তারক্ষীর অভাবে রোগীরা এ হাসপাতালে ভর্তি হতে চায় না।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, জেনারেল হাসপাতালটি এ অঞ্চলের অবহেলিত স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান। এমন পুরনো অবকাঠামো দিয়ে এত রোগীর চাপ সামলানো কঠিন। নতুন ভবন নির্মাণে যে প্রস্তাব ছিল সেটি চট্টগ্রামের মানুষের স্বাস্থ্যসেবার কথা বিবেচনা করে বাস্তবায়ন করা উচিত। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিকল্প হাসপাতাল হিসেবে এ হাসপাতালের আধুনিকায়ন জরুরি।

১৯০১ সালে এ হাসপাতালের সূচনা হয়। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে প্রথমে ৮০ শয্যা এবং পরে আরো ৭০ শয্যা যুক্ত করে ১৫০ শয্যার হাসপাতালটি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের সঙ্গে সংযুক্ত করে পরিচালনা করা হয়। ১৯৮৭ সালে হাসপাতালটিকে আলাদা করে জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়। সে সময়ে ৪২টি পদ ছিল। পরে ২০০৮ সালে হওয়া স্ট্যান্ডার্ড জরিপে ২৫০ শয্যা হাসপাতালে ৫৭ জন লোকবল এবং ২০২৪ সালের জরিপ অনুযায়ী ১৭৭ জন জনবল থাকার কথা। বর্তমানে হাসপাতালটিতে ২৫০ শয্যা থাকলেও চলছে ১৫০ শয্যার জনবল কাঠামো দিয়ে।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী হাসপাতালটিতে চিকিৎসকের ৪২টি পদসহ উপজেলা, ওএসডি ও প্রেষণের মোট ৮১টি পদ আছে। এর মধ্যে চিকিৎসকের পদ খুব বেশি খালি নেই। অন্যদিকে নার্সদের ১৫৫টি পদের মধ্যে ১৪৫ জন কর্মরত আছেন। এছাড়া তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর পদে কর্মরত আছেন মাত্র ৬৮ জন। আউটসোর্সিংয়ে কাজ করছেন ৩৬ জন। সম্প্রতি নতুন করে হাসপাতালটিতে চিকিৎসক পদায়ন করায় ১৮টি আইসিইউ চালু হয়েছে। তবে জনবল সংকটের কারণে এইচডিইউ বিভাগ (ছয়টি বেড) বন্ধ রয়েছে। হাসপাতালটিতে ২৫০টি শয্যা থাকার কথা হলেও ২১৮টি শয্যা চালু আছে। মূলত কভিডের সময়ে আইসিইউ বেড চালু করার জন্য সার্জারি ও অর্থোপেডিক বিভাগের শয্যা ৫০টি থেকে কমিয়ে ১৮টি করা হয়। তবে চাহিদা থাকলেও সেই শয্যা বাড়ানো হয়নি স্থান সংকুলানের কারণে।

হাসপাতালটির সর্বশেষ তথ্যমতে, গড়ে প্রতিদিন হাসপাতালের ইনডোরে ১৭১ জন, আউটডোরে ১ হাজার ২০০ এবং জরুরি বিভাগে ১৪০ থেকে ১৫০ জন রোগী আসছে চিকিৎসাসেবা নিতে। হাসপাতাল ভবনটি পুরনো হওয়ায় জরুরি বিভাগের সামনে রোগী দাঁড়ানোর মতো জায়গা নেই। অন্যদিকে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী সংকটের কারণে রোগীদের এক ওয়ার্ড থেকে অন্য ওয়ার্ডে হস্তান্তরে সমস্যা হয়। তাছাড়া রোগী অনুযায়ী যে পরিমাণ ডাক্তার হাসপাতালে থাকার কথা সেটিও নেই।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, হাসপাতালটির ইনডোরে এখন যে পরিমাণ রোগীর চাপ তাতে অন্তত ১৫ থেকে ২০ জন মেডিকেল অফিসার থাকার কথা থাকলেও এখন সেখানে মোট সাতজন কাজ করছেন। এর মধ্যে মেডিসিনে দুজন, গাইনিতে দুজন, সার্জারিতে দুজন ও ইএনটিতে (নাক, কান, গলা) একজন। অন্যদিকে হাসপাতালটিতে চর্ম ও যৌন রোগ বিভাগে রোগীদের চাপ সবচেয়ে বেশি হলেও মাত্র ছয়জন ডাক্তার ও মেডিকেল অফিসার দিয়ে বিভাগটি চালাতে হচ্ছে।

এদিকে হাসপাতালে বহির্বিভাগে চিকিৎসক সংকটের কারণে বিকালের পর শিশু ও অন্যান্য বিভাগে রোগী এলে চমেকে বা অন্যান্য হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়া হয়। তবে সবচেয়ে প্রকট সমস্যা হলো হাসপাতালে পর্যাপ্ত নিরাপত্তারক্ষীর অভাব। সন্ধ্যার পর হাসপাতালের আশপাশে অন্ধকার হওয়ায় ও নিরাপত্তা না থাকায় অনেক রোগী হাসপাতালে ভর্তি থাকতে চান না।

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক (ভারপ্রাপ্ত) ডা. মোহাম্মদ একরাম হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ হাসপাতালের ভবন ও নকশা শত বছরের পুরনো হওয়ায় এটি এখন আর রোগীবান্ধব নয়। বিশেষ করে জরুরি বিভাগটি অত্যন্ত ছোট। এটি সম্প্রসারণের কোনো সুযোগ নেই। চমেকে যেমন বড় পরিসরে ক্যাজুয়ালিটি বিভাগ গড়ে তোলা হয়েছে, সে তুলনায় জেনারেল হাসপাতালের আশপাশে জায়গা সীমিত। বক্ষব্যাধি বিভাগের পাশে অব্যবহৃত একটি এলাকা রয়েছে। সেখানে একসময় দুটি নতুন ভবন তোলার প্রস্তাব উঠেছিল। কিন্তু তা আর অগ্রসর হয়নি। হাসপাতালের আরেকটি সমস্যা হলো শিশু ওয়ার্ডের স্ট্রাকচার, যেখানে রোগী পরিবহনের কোনো র‌্যাম্প নেই। ফলে শিশু রোগীদের সিঁড়ি বেয়ে ওঠাতে-নামাতে হচ্ছে। পাশাপাশি পুরনো ভবনগুলোর বাথরুম, দরজা-জানালা নিয়মিত মেরামতের প্রয়োজন।’

তিনি আরো বলেন, ‘হাসপাতালে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীর সংখ্যা অনেক কম। নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা হাসপাতালের অন্যতম বড় সমস্যা। সন্ধ্যার পর হাসপাতাল এলাকায় নীরবতা নেমে আসে, আশপাশে নিরাপদ রেস্টুরেন্ট বা হোটেল না থাকায় রোগী ও তাদের স্বজনরা অনেক সময় চট্টগ্রাম মেডিকেলে চলে যান। এ সমস্যা নিরসনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ৩০ জন আনসার সদস্য নিয়োগের অনুমোদন পেয়েছে। বাজেট বরাদ্দ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। সব মিলিয়ে অবকাঠামোগত দুর্বলতা, জনবল ঘাটতি, নিরাপত্তা ও যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ—এ চারটি বড় চ্যালেঞ্জের মধ্যেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ উন্নয়ন ও পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।’

হাসপাতালে রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতি বেশির ভাগই নষ্ট, না হয় সংস্কারকাজ চলছে। সম্প্রতি বেশকিছু যন্ত্রপাতির জন্য সরকারকে চাহিদাপত্র দেয়া হয়েছে। সেখানে বেশ কয়েকটি ভারী যন্ত্রপাতির জন্য আবেদন করা হয়।

এদিকে জেনারেল হাসপাতালে নতুন ভবন নির্মাণের জন্য ২০২০ সালে উদ্যোগ নেয়া হয়। সে সময় ভবন নির্মাণের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা হয়। বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে একটি প্রস্তাব তৈরি করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠানো হয়। পরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে সেই প্রস্তাবের ভিত্তিতে একটি নকশা বা ড্রয়িং পাঠানো হয়। এ নকশার ভিত্তিতে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে পিডব্লিউডি ‘অপারেশনাল কপি’ প্রকল্পের আওতায় প্রস্তাবটি প্রেরণ করে। প্রাথমিক পরিকল্পনায় হাসপাতালের জন্য ১০ তলা বিশিষ্ট দুটি ভবন নির্মাণের বিষয়টি উল্লেখ ছিল। হাসপাতালটিতে রোগীর পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন করার পরিকল্পনা ছিল। দুটি ভবনই পাশাপাশি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। পরে প্রস্তাবিত এ ভবন নির্মাণ প্রকল্প আর বাস্তবায়ন হয়নি। বর্তমানে প্রস্তাবটি স্থগিত অবস্থায় রয়েছে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন করে যদি প্রকল্পটি আবারো চালু করতে হয়, তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে নতুনভাবে ডিপিপি তৈরি করে অনুমোদনের জন্য পাঠাতে হবে। সব মিলিয়ে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগটি পরিকল্পনা পর্যায়েই থেমে গেছে।

এ প্রসঙ্গে গণপূর্ত-১-এর উপসহকারী প্রকৌশলী মনোজ দে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে দুটি ১০ তলা ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা গত সরকারের আমলে নেয়া হয়েছিল। এখন সেটি স্থগিত। এখন নতুন করে ভবন করতে হলে আবারো প্রস্তাব পাঠাতে হবে। নতুন ডিপিপি তৈরি করে অনুমোদন নিলে তবেই সম্ভব।’

সার্বিক প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের বহুতল ভবন নির্মাণের আগের প্রস্তাব স্থগিত অবস্থায় রয়েছে। নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত নতুন প্রকল্পের অনুমোদন বা বাস্তবায়নের সম্ভাবনা নেই। বর্তমানে হাসপাতালে শুধু রক্ষণাবেক্ষণকাজ চলছে। হাসপাতালটি এখনো ১৫০ শয্যার জনবল কাঠামোয় ২৫০ শয্যার কার্যক্রম চালাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষ বিবেচনায় সংযুক্তি থেকে কিছু চিকিৎসক হাসপাতালটিতে পদায়ন করা হয়েছে।’

আরও